যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যবিমার খরচ দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় লাখ লাখ মানুষ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে চালু হওয়া অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট (এসিএ), যা সাধারণভাবে ‘ওবামাকেয়ার’ নামে পরিচিত, থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে অনেকেই তুলনামূলক সস্তা কিন্তু কম সুবিধার স্বল্পমেয়াদি স্বাস্থ্যবিমা, হেলথ-শেয়ারিং কর্মসূচি কিংবা কোনো বিমা ছাড়াই চিকিৎসা চালানোর পথ বেছে নিচ্ছেন।
২০২৬ সালের শুরুতে প্রিমিয়াম ও ডিডাক্টিবল—অর্থাৎ বিমা কার্যকর হওয়ার আগে রোগীকে নিজ পকেট থেকে যে অর্থ দিতে হয়—দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ এসিএ মার্কেটপ্লেসের বিমা ছেড়ে দিয়েছেন। সরকারিভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসিএ মার্কেটপ্লেসে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ বিমার আওতায় ছিলেন।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় চালু হওয়া অতিরিক্ত প্রিমিয়াম ট্যাক্স ক্রেডিটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াও চলতি বছরে স্বাস্থ্যবিমার খরচ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ফলে অনেক স্বনিয়োজিত ব্যক্তি ও ছোট ব্যবসায়ীকে এখন স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
উটাহ অঙ্গরাজ্যের কানাব শহরের ৪৯ বছর বয়সী স্বনিয়োজিত আলোকচিত্রী স্টেসি কক্স তাদেরই একজন। চলতি বছর তিনি ওবামাকেয়ারের বিমা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন একটি সাধারণ ম্যামোগ্রামের জন্যই তাকে প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার খরচের কথা ভাবতে হচ্ছে।
কক্সের পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে। পাশাপাশি তিনি একটি অটোইমিউন রোগে ভুগছেন, যার জন্য নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন। তবু চিকিৎসার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোও তার কাছে এখন বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার পরিস্থিতি শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়। আরও অনেক আমেরিকান স্বাস্থ্যবিমার বাড়তি খরচ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাদ দিচ্ছেন কিংবা জরুরি প্রয়োজন না হলে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন না।
কম খরচের বিমার দিকে ঝুঁকছেন অনেকে

ওবামাকেয়ার ছেড়ে যাওয়া প্রায় এক ডজন মানুষের সঙ্গে কথা বলে রয়টার্স জানতে পেরেছে, তাদের অনেকে স্বল্পমেয়াদি স্বাস্থ্যবিমা নিয়েছেন। এসব বিমার মাসিক খরচ তুলনামূলক কম হলেও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিমার মতো ব্যাপক সুরক্ষা দেয় না।
অন্যরা যুক্ত হয়েছেন ‘হেলথ-শেয়ারিং’ কর্মসূচিতে। এসব ব্যবস্থায় সদস্যরা মাসিক অর্থ জমা দেন এবং সেই অর্থ থেকে সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ ভাগাভাগি করে পরিশোধ করা হয়। তবে এগুলো প্রচলিত স্বাস্থ্যবিমার মতো একই ধরনের ভোক্তা সুরক্ষা দেয় না।
আরেকটি বড় অংশ কোনো বিমাই রাখছেন না।
হাসপাতালগুলোও এর প্রভাব টের পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বিমাহীন রোগীর চিকিৎসা বাড়ায় তাদের খরচও বাড়ছে। পেনসিলভানিয়াভিত্তিক হাসপাতাল ব্যবস্থা ইউনিভার্সাল হেলথ সার্ভিসেসের প্রধান নির্বাহী জুলাইয়ে বলেছিলেন, এসিএ বিমা ছেড়ে দেওয়া অনেক রোগী শেষ পর্যন্ত বিমাহীনই থেকে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে।
ব্যবসা নাকি স্বাস্থ্যবিমা—কোনটি রাখবেন?
মেরিল্যান্ডের ফ্রেডেরিকের ৫৬ বছর বয়সী আলোকচিত্রী রায়ান শাপিরোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম। তার ওবামাকেয়ার বিমার মাসিক প্রিমিয়াম দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ১ হাজার ডলারের ওপরে যাওয়ার কথা ছিল।
তাই তিনি ২০২৬ সালের জন্য সেই বিমা বাদ দিয়ে প্রায় ৬০০ ডলারের একটি স্বল্পমেয়াদি বিমা নিয়েছেন। এতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং গুরুতর অসুস্থতার মতো কিছু ব্যয় কাভার হয়।
শাপিরো বছরের শেষ নাগাদ নিজের আলোকচিত্রের ব্যবসা গুটিয়ে স্ত্রীকে তার ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ব্যবসায় সহযোগিতা করার পরিকল্পনা করছেন। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়ার বিষয়টিও সেই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।

তার ভাষায়, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিমার তুলনায় স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার খরচ প্রায় অর্ধেক। গুরুতর কোনো স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিলে অন্তত কিছুটা আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার জন্য এটিকে তিনি খরচ কমানোর একটি উপায় হিসেবে দেখছেন।
বর্তমান কেন্দ্রীয় নিয়ম অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি বিমা সাধারণত তিন মাস পর্যন্ত চলে এবং আরও এক মাস নবায়নের সুযোগ থাকে। তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেস বা সিএমএস ওই সীমা কার্যকর করা বন্ধ করার কথা জানানোর পর কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে দীর্ঘ মেয়াদের স্বল্পমেয়াদি বিমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসা বাদ দিচ্ছেন অনেকেই
স্বাস্থ্যবিমার খরচের চাপের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তে। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন বা বাদ দিয়েছেন।
কেউ কেউ বিমার বদলে প্রয়োজনের সময় সরাসরি অর্থ দিয়ে জরুরি চিকিৎসা নিচ্ছেন।
উচ্চ ডিডাক্টিবলও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমা কোম্পানি চিকিৎসা ব্যয়ের অংশ দেওয়া শুরু করার আগেই রোগীকে হাজার হাজার ডলার নিজে বহন করতে হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু বিমায় চিকিৎসক ও হাসপাতাল বেছে নেওয়ার সুযোগও সীমিত।
কক্স নিয়মিত ক্যানসার স্ক্রিনিং পর্যন্ত বাদ দিয়েছেন। তার ভয়, গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে চিকিৎসার ব্যয় সামলানোর মতো সামর্থ্য তার থাকবে না।
এই পরিস্থিতিই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার বড় একটি বৈপরীত্য সামনে এনেছে। যে আইনটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল মানুষকে বিমার আওতায় এনে চিকিৎসা ব্যয়ের ঝুঁকি কমানো, সেই ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান খরচই এখন কিছু মানুষকে আবার বিমার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।
হেলথ-শেয়ারিং ব্যবস্থাও পুরো সমাধান নয়
আটলান্টার ৫৩ বছর বয়সী জনসংযোগ পরামর্শক ক্রিস্টিন কনেলি ২০২৫ সালে ওবামাকেয়ার ছেড়ে জিয়ন হেলথশেয়ারে যোগ দেন। নিজের ও তরুণ বয়সী সন্তানদের জন্য তিনি মাসে প্রায় ৪৮০ ডলার দেন।

এই ব্যবস্থায় পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য বছরে একটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, বছরে একটি ম্যামোগ্রাম এবং দুই বছরে একটি কোলনোস্কোপির মতো কিছু সেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রথম ৫ হাজার ডলার তাকে নিজেকেই বহন করতে হয়। জিয়ন এটিকে প্রচলিত ডিডাক্টিবলের পরিবর্তে ‘ইনিশিয়াল আনশেয়ারেবল অ্যামাউন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে।
৭৮ হাজারের বেশি সক্রিয় সদস্য থাকা জিয়ন হেলথশেয়ারে ধর্মীয় সদস্যপদের বাধ্যবাধকতা নেই। কনেলি বলছেন, প্রচলিত বিমায় দাবি পরিশোধ নিয়ে নানা জটিলতা থাকলেও এখন পর্যন্ত হেলথ-শেয়ার ব্যবস্থায় নিজের খরচে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ব্যয় পেয়েছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে তিনি এই ব্যবস্থায় থাকতে চান না।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করছেন, এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক অঙ্গরাজ্যে আগ্রাসী বা বিভ্রান্তিকর বিপণন যথেষ্ট কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। ফলে গ্রাহকরা এমন পণ্য কিনতে পারেন, যেগুলোকে তারা প্রচলিত স্বাস্থ্যবিমার সমতুল্য মনে করলেও বাস্তবে তা নয়।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন হেলথ ইনস্যুরেন্স রিফর্মসের গবেষণা অধ্যাপক সাবরিনা করলেটের মতে, এই বিকল্প স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের বাজার অনেকটাই ‘ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’-এর মতো। কিছু ব্যবস্থা বৈধ ও কার্যকর হলেও কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহককে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়।
২০২৭ সালেও বাড়তে পারে খরচ
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিমা সংকট যে শিগগিরই কমছে না, তার ইঙ্গিত মিলছে ২০২৭ সালের প্রিমিয়াম প্রস্তাবেও। স্বাস্থ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেএফএফের তথ্য অনুযায়ী, এসিএ মার্কেটপ্লেসে বিমা কোম্পানিগুলো ২০২৭ সালের জন্য গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রিমিয়াম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। এটি টানা দ্বিতীয় বছর দুই অঙ্কের প্রিমিয়াম বৃদ্ধির ইঙ্গিত।
আগামী ১ নভেম্বর থেকে ওবামাকেয়ার পরিকল্পনায় নতুন করে নিবন্ধন শুরু হবে এবং চলবে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত।
ইউনাইটেডহেলথ, এলিভ্যান্স, সেন্টিন ও মলিনা হেলথকেয়ারের মতো বড় প্রতিষ্ঠান এসিএ মার্কেটপ্লেসে বিমা দেয়। ইউনাইটেডহেলথের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি বিমাও বিক্রি করে।
তবে প্রিমিয়াম বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আরও কত মানুষ পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিমা থেকে বেরিয়ে গিয়ে কম সুবিধার বিকল্প বা সম্পূর্ণ বিমাহীন অবস্থায় চলে যাবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যবিমার এই পরিবর্তন শুধু বিমা কোম্পানি বা হাসপাতালের হিসাবের বিষয় নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তে। মাসিক প্রিমিয়াম বাঁচাতে গিয়ে মানুষ যদি ক্যানসার স্ক্রিনিং, নিয়মিত পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বাদ দিতে শুরু করেন, তাহলে স্বল্পমেয়াদে খরচ কমলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি ও পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর এর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















