১২:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুদ্ধে মৃত রাজপুত্র ও সাধুদের দেহাবশেষ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, কেন? ক্যালিফোর্নিয়ায় সাগরের দাপট, বিলীন হচ্ছে সৈকত-ঘরবাড়ি; সামনে আরও ভয়ংকর শীত? হোয়াইট হাউসের মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা: আদালতের আদেশে আপাতত ফিরল সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাও ওবামাকেয়ার ছাড়ছেন লাখো মার্কিন, স্বাস্থ্যবিমায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা ট্রাম্পের কূটনৈতিক সপ্তাহে ফুটে উঠল ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো ছাড় নয়, শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজও বন্ধ ইরানের শান্তি প্রস্তাবে ট্রাম্পের না, হরমুজ ঘিরে যুদ্ধের নতুন শঙ্কা পারিবারিক বিরোধে রংপুরে বাবাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ছেলের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্যবাদ: বাজারের স্বাধীনতার জায়গায় রাষ্ট্রের বাড়তি নিয়ন্ত্রণ গ্লোরিয়া স্টেইনেম: নারীদের একত্র করার যে শক্তি বদলে দিয়েছিল সমাজ

গ্লোরিয়া স্টেইনেম: নারীদের একত্র করার যে শক্তি বদলে দিয়েছিল সমাজ

নারীর অধিকার, সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনে গ্লোরিয়া স্টেইনেম ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। তবে তাকে শুধু একজন নারীবাদী নেত্রী বা লেখক হিসেবে দেখলে তার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল থেকে যায়। তার জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল মানুষকে এক জায়গায় আনা, তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা।

গ্লোরিয়া স্টেইনেম ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কের নিজ বাড়িতে ৯২ বছর বয়সে মারা যান। তার দীর্ঘ জীবনের কাজ ছড়িয়ে ছিল সাংবাদিকতা, লেখালেখি, বক্তৃতা, সংগঠন গড়ে তোলা এবং নারীর অধিকার নিয়ে জনমত তৈরির মতো নানা ক্ষেত্রে।

১৯৬৩ সালে তরুণ সাংবাদিক হিসেবে স্টেইনেম ছদ্মবেশে প্লেবয় ক্লাবে ‘বানি’ হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন তাকে ব্যাপক পরিচিতি দেয়। তবে পরবর্তী জীবনের দিকে তাকালে ঘটনাটি ছিল তার দীর্ঘ নারীবাদী কর্মকাণ্ডের কেবল শুরুর একটি ইঙ্গিত। নারীর প্রতি বৈষম্য, অবমূল্যায়ন ও অসম ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে তার সক্রিয় ভূমিকা আরও গভীর হয়ে ওঠে কয়েক বছর পর।

১৯৬৯ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের সাংবাদিক হিসেবে একটি গির্জার বেসমেন্টে আয়োজিত গর্ভপাতবিষয়ক অভিজ্ঞতা-বিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া স্টেইনেমের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। সেখানে নারীরা নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে তুলে ধরছিলেন। অন্য নারীদের কথা শুনতে শুনতে তিনি উপলব্ধি করেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিজের অভিজ্ঞতাও তিনি পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে আনেন।

US feminist icon Gloria Steinem dies at 92

২০১৫ সালে প্রকাশিত তার বই My Life on the Road-এর উৎসর্গপত্রে তিনি নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা স্মরণ করেন। সেখানে তিনি ডা. জন শার্পের কথা উল্লেখ করেন। ১৯৫৭ সালে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাগত কারণে ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে গর্ভপাত আইনত অনুমোদিত হওয়ার আগের সময়ে শার্প ঝুঁকি নিয়ে ২২ বছর বয়সী এক মার্কিন তরুণীকে গর্ভপাতের জন্য চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। স্টেইনেম পরে লিখেছিলেন, ওই চিকিৎসক তাকে বলেছিলেন—আইন অন্যায় হলেও নিজের জীবনের ব্যাপারে তিনি যেন নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেন।

স্টেইনেমের কাছে সেই কথার গুরুত্ব ছিল গভীর। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন নারীর নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার স্বাধীনতার মৌলিক অংশ।

১৯৭১ সালে তিনি Ms. ম্যাগাজিনের সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন হন। একই সময়ে আরও অনেক নারীবাদীর সঙ্গে তিনি ন্যাশনাল উইমেনস পলিটিক্যাল ককাস প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হন। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ইক্যুয়াল রাইটস অ্যামেন্ডমেন্টের পক্ষেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

তবে স্টেইনেমের প্রভাব কেবল সংগঠন বা রাজনৈতিক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করার এক বিশেষ ক্ষমতার জন্যও পরিচিত ছিলেন। তার নিউইয়র্কের বাড়িতে নিয়মিত ‘টকিং সার্কেল’ বা আলাপের আসর বসত। বিভিন্ন পেশা, পরিচয় ও অভিজ্ঞতার নারীরা সেখানে এসে নিজেদের কথা বলতেন, একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতেন এবং নতুন সম্পর্ক তৈরি করতেন।

লেখিকা মেগ ওয়োলিটজার এমনই একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতি তুলে ধরেছেন। ২০০৯ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা জেন ক্যাম্পিয়নকে ঘিরে স্টেইনেমের বাড়িতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের নারীরা উপস্থিত ছিলেন। স্টেইনেম সেখানে অতিথিদের একজন একজন করে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের কাজের কথা সংক্ষেপে তুলে ধরেন। বাইরে থেকে সেটিকে হয়তো সাধারণ যোগাযোগ তৈরির অনুষ্ঠান বলা যেত, কিন্তু ওয়োলিটজারের কাছে সেটি ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি—একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ নারীদের মধ্যে স্বাভাবিক ও গভীর কথোপকথনের একটি সুযোগ।

Feminist icon Gloria Steinem dies aged 92 | News | Al Jazeera

স্টেইনেমের মানুষের সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করার এই প্রবণতা তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেও তৈরি হয়েছিল।

১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ ওহাইওর টোলিডোতে তার জন্ম। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর তিনি মা রুথের সঙ্গে বড় হন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি মায়ের দেখাশোনার বড় দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন। রুথ মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতেন এবং স্থায়ীভাবে কাজ ধরে রাখাও তার জন্য কঠিন ছিল। ক্ষমতাবান মানুষের কাছ থেকে নিজের মায়ের প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষা দেখার অভিজ্ঞতা স্টেইনেমের সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তার পরিবারেও একেবারে অচেনা ছিল না। তার বাবার মা নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং টোলিডোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথম নারী নির্বাচিত সদস্য হয়েছিলেন।

স্টেইনেম পরে ম্যাসাচুসেটসের স্মিথ কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি সরকার ও রাজনীতি বিষয়ে পড়েন। ১৯৫০-এর দশকে নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও বিয়ের পর নারীর পরিচয় স্বামীর পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সামাজিক ধারণা তখন প্রবল ছিল। স্টেইনেম এমন জীবন চাননি। নিজের ভাষায়, তিনি ইতিমধ্যে মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং আরেকজনের জীবনকে কেন্দ্র করে নিজের জীবন পরিচালনা করতে চাননি।

তবে জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি বিয়ে করেছিলেন। ষাটের দশকের শেষভাগে নয়, বরং ষাটের কোঠায় পৌঁছানোর পর তিনি বিয়ে করেন।

শিক্ষাজীবনের পর স্টেইনেমের জীবন ছিল ভ্রমণ, সাংবাদিকতা ও অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। তিনি ফেলোশিপ নিয়ে ভারত ভ্রমণ করেন। পরে সাংবাদিক, লেখক, পরামর্শদাতা ও বক্তা হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন। তার ব্যক্তিগত জীবনও জনআলোচনার বাইরে ছিল না। ক্ষমতাবান পুরুষদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে তার নিজস্ব পোশাক-পরিচ্ছদ, অ্যাভিয়েটর চশমা ও স্বতন্ত্র চেহারা নারীবাদীদের নিয়ে প্রচলিত কিছু পুরোনো ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছিল।

Pioneering feminist icon Gloria Steinem dies at 92

দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদী আন্দোলনের ‘মুখ’ হিসেবে স্টেইনেমের পরিচিতি তৈরি হলেও তিনি নিজেই নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখতেন। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের অবদান সম্পর্কে তিনি প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ২০১৫ সালে তিনি বলেছিলেন, তার ধারণা ছিল কৃষ্ণাঙ্গ নারীরাই নারীবাদী আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণার পথ দেখিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছিলেন, বাস্তবতার কারণে শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত নারীদের আন্দোলনের ইতিহাসই বেশি প্রচার পেয়েছে।

এই উপলব্ধি তার কাজের আরেকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে—নারীর অধিকারকে তিনি একক কোনো শ্রেণি বা গোষ্ঠীর বিষয় হিসেবে দেখেননি। সমাজের যেসব মানুষের কথা প্রান্তে পড়ে থাকে, তাদের অভিজ্ঞতা সামনে আনার বিষয়েও তিনি সচেতন ছিলেন।

স্টেইনেম একবার বলেছিলেন, জীবনের শেষ বয়সে তিনি একটি ছোট ডাইনার বা খাবারের দোকান চালাতে চান। তার কল্পনায় সেখানে নীল-সাদা চেক নকশার পর্দা থাকবে, রাস্তার পাশে দোকানটি থাকবে এবং সেখানে ট্রাকচালক থেকে শুরু করে পাড়ার মানুষ কিংবা অনুষ্ঠানের পর স্যুট-পরিহিত অতিথি—সবাই আসবে। পেছনের একটি ঘরে মাঝেমধ্যে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে ‘বিপ্লবী’ বৈঠকও হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত তিনি সেই ডাইনার খোলেননি। কিন্তু তার জীবনের কর্মকাণ্ডকে রূপক অর্থে সেই ডাইনারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কারণ তিনি এমন একটি সামাজিক পরিসর তৈরিতে জীবন কাটিয়েছেন, যেখানে ভিন্ন ধরনের মানুষ একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারে।

২০১৮ সালে এর একটি মানবিক উদাহরণ দেখা যায়। লেখিকা জে. কোর্টনি সুলিভান ‘ইমিগ্র্যান্ট ফ্যামিলিজ টুগেদার’ নামে স্বেচ্ছাসেবী একটি সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অভিবাসী মা ও সন্তানদের পুনর্মিলনে সংগঠনটি কাজ করছিল। একসময় অভিবাসী নারী ও তাদের সন্তানদের থাকার জায়গা খুঁজতে সুলিভান প্রায় ৫০টি ই-মেইল পাঠান। সাড়া আসে মাত্র একটি।

সেই উত্তরটি দিয়েছিলেন স্টেইনেম।

The feminist icon who led the women's movement

তিনি জানিয়ে দেন, ওই মায়েদের এবং তাদের সন্তানদের প্রয়োজন হলে তার নিজের বাড়িতে থাকতে দেওয়া হবে—যতদিন প্রয়োজন।

এই ঘটনাটি স্টেইনেমের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরের আরেকটি দিক সামনে আনে। তিনি শুধু সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলতেন না; নিজের ব্যক্তিগত পরিসরও কখনো কখনো সেই মূল্যবোধের কাজে ব্যবহার করতেন।

২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম প্রদান করেন। কয়েক দশক ধরে নারীর সমঅধিকার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, লেখালেখি, বক্তৃতা ও সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যান।

গ্লোরিয়া স্টেইনেমের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হয়তো তার চারপাশে মানুষ জড়ো করার ক্ষমতা। তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন, লিখেছেন, আন্দোলন সংগঠিত করেছেন, কিন্তু একই সঙ্গে অন্যদের কথা শুনেছেন। নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্য নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আর সেই ব্যক্তিগত গল্পগুলোকে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের আলোচনায় নিয়ে এসেছেন।

তার জীবনের গল্প তাই শুধু একজন নারীবাদী নেত্রীর গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি বিশ্বাস করতেন—পরিবর্তন অনেক সময় শুরু হয় মানুষ যখন একে অপরের কথা শোনে, নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে এবং একসঙ্গে নতুন সম্ভাবনার কথা ভাবতে শেখে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধে মৃত রাজপুত্র ও সাধুদের দেহাবশেষ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, কেন?

গ্লোরিয়া স্টেইনেম: নারীদের একত্র করার যে শক্তি বদলে দিয়েছিল সমাজ

১০:৫৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারীর অধিকার, সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনে গ্লোরিয়া স্টেইনেম ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। তবে তাকে শুধু একজন নারীবাদী নেত্রী বা লেখক হিসেবে দেখলে তার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল থেকে যায়। তার জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল মানুষকে এক জায়গায় আনা, তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা।

গ্লোরিয়া স্টেইনেম ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কের নিজ বাড়িতে ৯২ বছর বয়সে মারা যান। তার দীর্ঘ জীবনের কাজ ছড়িয়ে ছিল সাংবাদিকতা, লেখালেখি, বক্তৃতা, সংগঠন গড়ে তোলা এবং নারীর অধিকার নিয়ে জনমত তৈরির মতো নানা ক্ষেত্রে।

১৯৬৩ সালে তরুণ সাংবাদিক হিসেবে স্টেইনেম ছদ্মবেশে প্লেবয় ক্লাবে ‘বানি’ হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন তাকে ব্যাপক পরিচিতি দেয়। তবে পরবর্তী জীবনের দিকে তাকালে ঘটনাটি ছিল তার দীর্ঘ নারীবাদী কর্মকাণ্ডের কেবল শুরুর একটি ইঙ্গিত। নারীর প্রতি বৈষম্য, অবমূল্যায়ন ও অসম ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে তার সক্রিয় ভূমিকা আরও গভীর হয়ে ওঠে কয়েক বছর পর।

১৯৬৯ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের সাংবাদিক হিসেবে একটি গির্জার বেসমেন্টে আয়োজিত গর্ভপাতবিষয়ক অভিজ্ঞতা-বিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া স্টেইনেমের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। সেখানে নারীরা নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে তুলে ধরছিলেন। অন্য নারীদের কথা শুনতে শুনতে তিনি উপলব্ধি করেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিজের অভিজ্ঞতাও তিনি পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে আনেন।

US feminist icon Gloria Steinem dies at 92

২০১৫ সালে প্রকাশিত তার বই My Life on the Road-এর উৎসর্গপত্রে তিনি নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা স্মরণ করেন। সেখানে তিনি ডা. জন শার্পের কথা উল্লেখ করেন। ১৯৫৭ সালে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাগত কারণে ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে গর্ভপাত আইনত অনুমোদিত হওয়ার আগের সময়ে শার্প ঝুঁকি নিয়ে ২২ বছর বয়সী এক মার্কিন তরুণীকে গর্ভপাতের জন্য চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। স্টেইনেম পরে লিখেছিলেন, ওই চিকিৎসক তাকে বলেছিলেন—আইন অন্যায় হলেও নিজের জীবনের ব্যাপারে তিনি যেন নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেন।

স্টেইনেমের কাছে সেই কথার গুরুত্ব ছিল গভীর। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন নারীর নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার স্বাধীনতার মৌলিক অংশ।

১৯৭১ সালে তিনি Ms. ম্যাগাজিনের সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন হন। একই সময়ে আরও অনেক নারীবাদীর সঙ্গে তিনি ন্যাশনাল উইমেনস পলিটিক্যাল ককাস প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হন। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ইক্যুয়াল রাইটস অ্যামেন্ডমেন্টের পক্ষেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

তবে স্টেইনেমের প্রভাব কেবল সংগঠন বা রাজনৈতিক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করার এক বিশেষ ক্ষমতার জন্যও পরিচিত ছিলেন। তার নিউইয়র্কের বাড়িতে নিয়মিত ‘টকিং সার্কেল’ বা আলাপের আসর বসত। বিভিন্ন পেশা, পরিচয় ও অভিজ্ঞতার নারীরা সেখানে এসে নিজেদের কথা বলতেন, একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতেন এবং নতুন সম্পর্ক তৈরি করতেন।

লেখিকা মেগ ওয়োলিটজার এমনই একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতি তুলে ধরেছেন। ২০০৯ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা জেন ক্যাম্পিয়নকে ঘিরে স্টেইনেমের বাড়িতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের নারীরা উপস্থিত ছিলেন। স্টেইনেম সেখানে অতিথিদের একজন একজন করে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের কাজের কথা সংক্ষেপে তুলে ধরেন। বাইরে থেকে সেটিকে হয়তো সাধারণ যোগাযোগ তৈরির অনুষ্ঠান বলা যেত, কিন্তু ওয়োলিটজারের কাছে সেটি ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি—একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ নারীদের মধ্যে স্বাভাবিক ও গভীর কথোপকথনের একটি সুযোগ।

Feminist icon Gloria Steinem dies aged 92 | News | Al Jazeera

স্টেইনেমের মানুষের সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করার এই প্রবণতা তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেও তৈরি হয়েছিল।

১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ ওহাইওর টোলিডোতে তার জন্ম। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর তিনি মা রুথের সঙ্গে বড় হন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি মায়ের দেখাশোনার বড় দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন। রুথ মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতেন এবং স্থায়ীভাবে কাজ ধরে রাখাও তার জন্য কঠিন ছিল। ক্ষমতাবান মানুষের কাছ থেকে নিজের মায়ের প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষা দেখার অভিজ্ঞতা স্টেইনেমের সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তার পরিবারেও একেবারে অচেনা ছিল না। তার বাবার মা নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং টোলিডোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথম নারী নির্বাচিত সদস্য হয়েছিলেন।

স্টেইনেম পরে ম্যাসাচুসেটসের স্মিথ কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি সরকার ও রাজনীতি বিষয়ে পড়েন। ১৯৫০-এর দশকে নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও বিয়ের পর নারীর পরিচয় স্বামীর পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সামাজিক ধারণা তখন প্রবল ছিল। স্টেইনেম এমন জীবন চাননি। নিজের ভাষায়, তিনি ইতিমধ্যে মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং আরেকজনের জীবনকে কেন্দ্র করে নিজের জীবন পরিচালনা করতে চাননি।

তবে জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি বিয়ে করেছিলেন। ষাটের দশকের শেষভাগে নয়, বরং ষাটের কোঠায় পৌঁছানোর পর তিনি বিয়ে করেন।

শিক্ষাজীবনের পর স্টেইনেমের জীবন ছিল ভ্রমণ, সাংবাদিকতা ও অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। তিনি ফেলোশিপ নিয়ে ভারত ভ্রমণ করেন। পরে সাংবাদিক, লেখক, পরামর্শদাতা ও বক্তা হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন। তার ব্যক্তিগত জীবনও জনআলোচনার বাইরে ছিল না। ক্ষমতাবান পুরুষদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে তার নিজস্ব পোশাক-পরিচ্ছদ, অ্যাভিয়েটর চশমা ও স্বতন্ত্র চেহারা নারীবাদীদের নিয়ে প্রচলিত কিছু পুরোনো ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছিল।

Pioneering feminist icon Gloria Steinem dies at 92

দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদী আন্দোলনের ‘মুখ’ হিসেবে স্টেইনেমের পরিচিতি তৈরি হলেও তিনি নিজেই নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখতেন। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের অবদান সম্পর্কে তিনি প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ২০১৫ সালে তিনি বলেছিলেন, তার ধারণা ছিল কৃষ্ণাঙ্গ নারীরাই নারীবাদী আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণার পথ দেখিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছিলেন, বাস্তবতার কারণে শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত নারীদের আন্দোলনের ইতিহাসই বেশি প্রচার পেয়েছে।

এই উপলব্ধি তার কাজের আরেকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে—নারীর অধিকারকে তিনি একক কোনো শ্রেণি বা গোষ্ঠীর বিষয় হিসেবে দেখেননি। সমাজের যেসব মানুষের কথা প্রান্তে পড়ে থাকে, তাদের অভিজ্ঞতা সামনে আনার বিষয়েও তিনি সচেতন ছিলেন।

স্টেইনেম একবার বলেছিলেন, জীবনের শেষ বয়সে তিনি একটি ছোট ডাইনার বা খাবারের দোকান চালাতে চান। তার কল্পনায় সেখানে নীল-সাদা চেক নকশার পর্দা থাকবে, রাস্তার পাশে দোকানটি থাকবে এবং সেখানে ট্রাকচালক থেকে শুরু করে পাড়ার মানুষ কিংবা অনুষ্ঠানের পর স্যুট-পরিহিত অতিথি—সবাই আসবে। পেছনের একটি ঘরে মাঝেমধ্যে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে ‘বিপ্লবী’ বৈঠকও হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত তিনি সেই ডাইনার খোলেননি। কিন্তু তার জীবনের কর্মকাণ্ডকে রূপক অর্থে সেই ডাইনারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কারণ তিনি এমন একটি সামাজিক পরিসর তৈরিতে জীবন কাটিয়েছেন, যেখানে ভিন্ন ধরনের মানুষ একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারে।

২০১৮ সালে এর একটি মানবিক উদাহরণ দেখা যায়। লেখিকা জে. কোর্টনি সুলিভান ‘ইমিগ্র্যান্ট ফ্যামিলিজ টুগেদার’ নামে স্বেচ্ছাসেবী একটি সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অভিবাসী মা ও সন্তানদের পুনর্মিলনে সংগঠনটি কাজ করছিল। একসময় অভিবাসী নারী ও তাদের সন্তানদের থাকার জায়গা খুঁজতে সুলিভান প্রায় ৫০টি ই-মেইল পাঠান। সাড়া আসে মাত্র একটি।

সেই উত্তরটি দিয়েছিলেন স্টেইনেম।

The feminist icon who led the women's movement

তিনি জানিয়ে দেন, ওই মায়েদের এবং তাদের সন্তানদের প্রয়োজন হলে তার নিজের বাড়িতে থাকতে দেওয়া হবে—যতদিন প্রয়োজন।

এই ঘটনাটি স্টেইনেমের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরের আরেকটি দিক সামনে আনে। তিনি শুধু সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলতেন না; নিজের ব্যক্তিগত পরিসরও কখনো কখনো সেই মূল্যবোধের কাজে ব্যবহার করতেন।

২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম প্রদান করেন। কয়েক দশক ধরে নারীর সমঅধিকার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, লেখালেখি, বক্তৃতা ও সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যান।

গ্লোরিয়া স্টেইনেমের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হয়তো তার চারপাশে মানুষ জড়ো করার ক্ষমতা। তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন, লিখেছেন, আন্দোলন সংগঠিত করেছেন, কিন্তু একই সঙ্গে অন্যদের কথা শুনেছেন। নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্য নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আর সেই ব্যক্তিগত গল্পগুলোকে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের আলোচনায় নিয়ে এসেছেন।

তার জীবনের গল্প তাই শুধু একজন নারীবাদী নেত্রীর গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি বিশ্বাস করতেন—পরিবর্তন অনেক সময় শুরু হয় মানুষ যখন একে অপরের কথা শোনে, নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে এবং একসঙ্গে নতুন সম্ভাবনার কথা ভাবতে শেখে।