১২:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুদ্ধে মৃত রাজপুত্র ও সাধুদের দেহাবশেষ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, কেন? ক্যালিফোর্নিয়ায় সাগরের দাপট, বিলীন হচ্ছে সৈকত-ঘরবাড়ি; সামনে আরও ভয়ংকর শীত? হোয়াইট হাউসের মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা: আদালতের আদেশে আপাতত ফিরল সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাও ওবামাকেয়ার ছাড়ছেন লাখো মার্কিন, স্বাস্থ্যবিমায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা ট্রাম্পের কূটনৈতিক সপ্তাহে ফুটে উঠল ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো ছাড় নয়, শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজও বন্ধ ইরানের শান্তি প্রস্তাবে ট্রাম্পের না, হরমুজ ঘিরে যুদ্ধের নতুন শঙ্কা পারিবারিক বিরোধে রংপুরে বাবাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ছেলের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্যবাদ: বাজারের স্বাধীনতার জায়গায় রাষ্ট্রের বাড়তি নিয়ন্ত্রণ গ্লোরিয়া স্টেইনেম: নারীদের একত্র করার যে শক্তি বদলে দিয়েছিল সমাজ

ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্যবাদ: বাজারের স্বাধীনতার জায়গায় রাষ্ট্রের বাড়তি নিয়ন্ত্রণ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা কেবল শুল্ক বাড়ানো বা বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ বাড়ানোর একটি প্রবণতা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারের মালিকানা, করপোরেট সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর প্রকাশ্য চাপ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অর্থনৈতিক পথে এগোচ্ছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল বেসরকারি প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। কিন্তু বর্তমান নীতিতে সেই কাঠামোর বদলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট শিল্প ও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ইতিহাসের বিচারে এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। একসময় বাণিজ্যবাদই ছিল প্রচলিত অর্থনৈতিক দর্শন। একটি দেশের সম্পদকে উৎপাদন ও মানুষের কল্যাণের বদলে রাষ্ট্রের হাতে সঞ্চিত সম্পদ ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করা হতো।

অ্যাডাম স্মিথের অর্থনৈতিক চিন্তা সেই ধারণাকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। তিনি দেখিয়েছিলেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যক্তিগত স্বার্থের পারস্পরিক ক্রিয়া এমন উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, যার সুফল বৃহত্তর সমাজ পায়। একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি তার কাছে ছিল মানুষ কী পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও ব্যবহার করতে পারে, তার মধ্যে—শুধু রাষ্ট্রের হাতে সোনা বা বৈদেশিক সম্পদ কত আছে, তার মধ্যে নয়।

এই চিন্তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যুক্তিও শক্তিশালী হয়। সবকিছু নিজ দেশে উৎপাদন করার চেষ্টা কোনো দেশের জন্যই কার্যকর নয়। বাণিজ্য দেশগুলোকে এমন পণ্য ও সেবা ব্যবহারের সুযোগ দেয়, যা তারা একা নিজেদের অর্থনীতির মধ্যে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন করতে পারত না।

বাজার, প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই সমন্বয়ই পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির অভূতপূর্ব সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উন্নত দেশগুলো সাধারণত বেসরকারি খাতকে উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রেখেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল প্রতিযোগিতার নিয়ম তৈরি করা, চুক্তি ও ব্যবসায়িক আচরণ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছিল। শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি এবং পরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে দেশগুলো বৈষম্যহীন বাণিজ্য, নীতির স্বচ্ছতা, নির্ধারিত শুল্কের সীমা এবং আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য বাধা কমানোর কাঠামো তৈরি করে। উন্মুক্ত বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সমন্বয় বিশ্ব উৎপাদন ও বাণিজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

Trump-First Foreign Policy and the Liberal International Order That Never  Was illiberalism.org |

শুল্কের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ

গত এক দশকে সেই ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় আগের নেতৃত্বের ভূমিকা থেকে সরে আসতে শুরু করে। দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রবণতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। কানাডাসহ বহু দেশের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ তারই প্রকাশ।

শুল্ক দিয়ে দেশীয় উৎপাদককে সুরক্ষা দেওয়া রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে, কারণ এতে সরাসরি সরকারি ব্যয় ছাড়াই কিছু শিল্পকে সুবিধা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এর বিপরীত দিকও আছে। আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল উৎপাদকদের খরচ বাড়ে, রপ্তানিকারকেরা পাল্টা বাণিজ্য বাধার মুখে পড়ে এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

সমস্যাটি শুধু শুল্কের হার নয়। নীতির দ্রুত পরিবর্তনের আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ায়। কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবে কি না, তা নির্ভর করে ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য ধারণার ওপর। রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সেই পূর্বানুমানযোগ্যতা কমে যায়।

রাষ্ট্র যখন ব্যবসার মালিক

আরও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি কোম্পানিতে সরকারের সরাসরি অংশীদারিত্বে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৩০টির বেশি মার্কিন প্রতিষ্ঠানে অংশীদারিত্ব নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিপ্পন স্টিলের ইউএস স্টিল অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও মার্কিন সরকারকে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, সরকারি সহায়তা পাওয়ার পর ইন্টেল সরকারের কাছে কোম্পানির ১০ শতাংশ মালিকানা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

US trade deficit declined in 2025, but gap for goods hits a record despite  Trump tariffs - ABC Columbia

ইন্টেলের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার পর কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে। তবে সরকারি প্রভাব এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের সম্পর্ক এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। কোনো কোম্পানির পণ্য কেনা বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়া যদি সরকারি চাপের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়, তাহলে সেটিকে আর পুরোপুরি বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ফল বলা কঠিন।

তেল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো কৌশলগত খাতেও সরকারের ভূমিকা বাড়ছে। ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কোম্পানিতে বিনিয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানে সম্ভাব্য সরকারি ঋণ—রাষ্ট্র এখন এমন সব ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, যেসব ক্ষেত্রে এতদিন বেসরকারি পুঁজিই প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।

জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি

জাতীয় নিরাপত্তা অবশ্যই ব্যতিক্রম তৈরি করতে পারে। প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, জ্বালানি বা কৌশলগত খনিজের মতো কিছু খাতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বাস্তব কারণ থাকতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তার যুক্তি কত দূর পর্যন্ত সরকারি মালিকানা ও বাজার নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিতে পারে, সেটিই মূল প্রশ্ন।

The Real Enemy for Trump Is Mercantilism, Not Globalism - WSJ

রাষ্ট্র যদি সাময়িকভাবে একটি কৌশলগত শিল্পকে সহায়তা করে, তার লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই খাতকে প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করে তোলা। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর কোনো প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন নির্ভরশীল করে রাখা হলে উল্টো বাজারের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অর্থনীতিতে সরকারের কাজ বাজারের বিকল্প হয়ে ওঠা নয়; বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে প্রতিযোগিতা কার্যকর থাকে, চুক্তি ও সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বার্থ রক্ষা করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বেসরকারি খাতই দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা সেই সক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করবে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, সমৃদ্ধির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক মালিকানা নয়; বরং প্রতিযোগিতামূলক বাজার, উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং পূর্বানুমানযোগ্য নিয়মকানুন।

অ্যান ও ক্রুগার জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জ্যেষ্ঠ গবেষণা অধ্যাপক। তিনি বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রথম উপব্যবস্থাপনা পরিচালক।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধে মৃত রাজপুত্র ও সাধুদের দেহাবশেষ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, কেন?

ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্যবাদ: বাজারের স্বাধীনতার জায়গায় রাষ্ট্রের বাড়তি নিয়ন্ত্রণ

১১:০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা কেবল শুল্ক বাড়ানো বা বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ বাড়ানোর একটি প্রবণতা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারের মালিকানা, করপোরেট সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর প্রকাশ্য চাপ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অর্থনৈতিক পথে এগোচ্ছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল বেসরকারি প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। কিন্তু বর্তমান নীতিতে সেই কাঠামোর বদলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট শিল্প ও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ইতিহাসের বিচারে এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। একসময় বাণিজ্যবাদই ছিল প্রচলিত অর্থনৈতিক দর্শন। একটি দেশের সম্পদকে উৎপাদন ও মানুষের কল্যাণের বদলে রাষ্ট্রের হাতে সঞ্চিত সম্পদ ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করা হতো।

অ্যাডাম স্মিথের অর্থনৈতিক চিন্তা সেই ধারণাকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। তিনি দেখিয়েছিলেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যক্তিগত স্বার্থের পারস্পরিক ক্রিয়া এমন উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, যার সুফল বৃহত্তর সমাজ পায়। একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি তার কাছে ছিল মানুষ কী পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও ব্যবহার করতে পারে, তার মধ্যে—শুধু রাষ্ট্রের হাতে সোনা বা বৈদেশিক সম্পদ কত আছে, তার মধ্যে নয়।

এই চিন্তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যুক্তিও শক্তিশালী হয়। সবকিছু নিজ দেশে উৎপাদন করার চেষ্টা কোনো দেশের জন্যই কার্যকর নয়। বাণিজ্য দেশগুলোকে এমন পণ্য ও সেবা ব্যবহারের সুযোগ দেয়, যা তারা একা নিজেদের অর্থনীতির মধ্যে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন করতে পারত না।

বাজার, প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই সমন্বয়ই পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির অভূতপূর্ব সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উন্নত দেশগুলো সাধারণত বেসরকারি খাতকে উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রেখেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল প্রতিযোগিতার নিয়ম তৈরি করা, চুক্তি ও ব্যবসায়িক আচরণ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছিল। শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি এবং পরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে দেশগুলো বৈষম্যহীন বাণিজ্য, নীতির স্বচ্ছতা, নির্ধারিত শুল্কের সীমা এবং আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য বাধা কমানোর কাঠামো তৈরি করে। উন্মুক্ত বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সমন্বয় বিশ্ব উৎপাদন ও বাণিজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

Trump-First Foreign Policy and the Liberal International Order That Never  Was illiberalism.org |

শুল্কের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ

গত এক দশকে সেই ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় আগের নেতৃত্বের ভূমিকা থেকে সরে আসতে শুরু করে। দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রবণতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। কানাডাসহ বহু দেশের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ তারই প্রকাশ।

শুল্ক দিয়ে দেশীয় উৎপাদককে সুরক্ষা দেওয়া রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে, কারণ এতে সরাসরি সরকারি ব্যয় ছাড়াই কিছু শিল্পকে সুবিধা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এর বিপরীত দিকও আছে। আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল উৎপাদকদের খরচ বাড়ে, রপ্তানিকারকেরা পাল্টা বাণিজ্য বাধার মুখে পড়ে এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

সমস্যাটি শুধু শুল্কের হার নয়। নীতির দ্রুত পরিবর্তনের আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ায়। কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবে কি না, তা নির্ভর করে ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য ধারণার ওপর। রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সেই পূর্বানুমানযোগ্যতা কমে যায়।

রাষ্ট্র যখন ব্যবসার মালিক

আরও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি কোম্পানিতে সরকারের সরাসরি অংশীদারিত্বে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৩০টির বেশি মার্কিন প্রতিষ্ঠানে অংশীদারিত্ব নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিপ্পন স্টিলের ইউএস স্টিল অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও মার্কিন সরকারকে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, সরকারি সহায়তা পাওয়ার পর ইন্টেল সরকারের কাছে কোম্পানির ১০ শতাংশ মালিকানা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

US trade deficit declined in 2025, but gap for goods hits a record despite  Trump tariffs - ABC Columbia

ইন্টেলের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার পর কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে। তবে সরকারি প্রভাব এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের সম্পর্ক এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। কোনো কোম্পানির পণ্য কেনা বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়া যদি সরকারি চাপের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়, তাহলে সেটিকে আর পুরোপুরি বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ফল বলা কঠিন।

তেল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো কৌশলগত খাতেও সরকারের ভূমিকা বাড়ছে। ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কোম্পানিতে বিনিয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানে সম্ভাব্য সরকারি ঋণ—রাষ্ট্র এখন এমন সব ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, যেসব ক্ষেত্রে এতদিন বেসরকারি পুঁজিই প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।

জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি

জাতীয় নিরাপত্তা অবশ্যই ব্যতিক্রম তৈরি করতে পারে। প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, জ্বালানি বা কৌশলগত খনিজের মতো কিছু খাতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বাস্তব কারণ থাকতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তার যুক্তি কত দূর পর্যন্ত সরকারি মালিকানা ও বাজার নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিতে পারে, সেটিই মূল প্রশ্ন।

The Real Enemy for Trump Is Mercantilism, Not Globalism - WSJ

রাষ্ট্র যদি সাময়িকভাবে একটি কৌশলগত শিল্পকে সহায়তা করে, তার লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই খাতকে প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করে তোলা। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর কোনো প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন নির্ভরশীল করে রাখা হলে উল্টো বাজারের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অর্থনীতিতে সরকারের কাজ বাজারের বিকল্প হয়ে ওঠা নয়; বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে প্রতিযোগিতা কার্যকর থাকে, চুক্তি ও সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বার্থ রক্ষা করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বেসরকারি খাতই দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা সেই সক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করবে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, সমৃদ্ধির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক মালিকানা নয়; বরং প্রতিযোগিতামূলক বাজার, উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং পূর্বানুমানযোগ্য নিয়মকানুন।

অ্যান ও ক্রুগার জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জ্যেষ্ঠ গবেষণা অধ্যাপক। তিনি বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রথম উপব্যবস্থাপনা পরিচালক।