যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩ বছরের কিশোর কায়লান হিপসলের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। মদ্যপ ও মাদক গ্রহণের পর গাড়ি চালিয়ে কায়লানকে চাপা দেওয়া চালক হার্লি হোয়াইটম্যানের কারাদণ্ড কমিয়ে দেওয়ার খবর পেয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে কিশোরটির পরিবার। তাদের আশঙ্কা, সাজা কমে যাওয়ায় হত্যার মতো গুরুতর ঘটনার দায়ে দণ্ডিত ওই ব্যক্তি মাত্র দুই বছরের মধ্যেই কারাগার থেকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেতে পারেন।
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ওয়েলসের হিরওয়ানে বন্ধুদের সঙ্গে একটি যুবকেন্দ্রের দিকে হাঁটছিল কায়লান। ব্রেকন রোডে হোয়াইটম্যানের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাথে উঠে তাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত কায়লান তিন দিন পর মারা যায়।
ঘটনার সময় হোয়াইটম্যান মদ পান করেছিলেন এবং কোকেনও গ্রহণ করেছিলেন বলে আদালতে উঠে আসে। দুর্ঘটনার পর তিনি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পরে ফিরে এসে আহত কায়লানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা লোকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
প্রথম সাজা নিয়ে আপত্তি, পরে বাড়ানো হয়েছিল দণ্ড
হোয়াইটম্যানকে প্রথমে ছয় বছর নয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে আট বছর চার মাসের জন্য গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
কায়লানের পরিবার ওই সাজাকে যথেষ্ট কঠোর নয় বলে আপত্তি জানায়। পরে উচ্চ আদালত আগের সাজাকে ‘অতিরিক্তভাবে লঘু’ বলে উল্লেখ করে এবং কারাদণ্ড বাড়িয়ে নয় বছর করে।
পরিবারের কাছে মনে হয়েছিল, অবশেষে কায়লানের মৃত্যুর জন্য যথাযথ বিচার পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু নতুন করে সাজা কমানোর খবর তাদের সেই স্বস্তিকে গভীর হতাশায় পরিণত করেছে।
‘এটা যেন মুখের ওপর চপেটাঘাত’
কায়লানের চাচাতো বোন জুলি ক্রেগ বলেন, পরিবারটি দুই সপ্তাহ আগে ভুক্তভোগী সহায়তা দলের কাছ থেকে জানতে পারে যে হোয়াইটম্যানের কারাবাসের শর্ত পরিবর্তন করা হচ্ছে।
কারা কর্তৃপক্ষের চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সাজা আইনের আওতায় তার সাজা পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় তার সাজা কমিয়ে চার বছর করা হয়েছে এবং এর অন্তত অর্ধেক সময় তাকে কারাগারে থাকতে হবে। ফলে শরৎকালেই তাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হতে পারে।
ক্রেগ বলেন, মাত্র দুই বছর পর একজন মানুষের আবার সমাজে ফিরে আসার সুযোগ পাওয়া পরিবারের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, কায়লানের দাদি ছিলেন তার আইনগত অভিভাবক। নাতিকে হারানোর পর তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে তাদের একসঙ্গে থাকা বাড়িতেও আর ফিরতে পারছেন না।
পরিবারের কাছে পুরো ঘটনাটি যেন নতুন করে আঘাত করার মতো। কায়লানের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর, অথচ তার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি অল্প সময়ের মধ্যেই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন—এই বিষয়টিই তাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
‘কারাগার পূর্ণ হওয়ার দায় ভুক্তভোগীদের নয়’
ক্রেগ বলেন, কারাগারে অতিরিক্ত বন্দি থাকলে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে—এটি তিনি বুঝতে পারেন। কিন্তু সেই সমস্যার দায় কোনোভাবেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষের পরিবারের ওপর চাপানো উচিত নয়।
তার ভাষায়, হোয়াইটম্যান মুক্তি পাওয়ার পর বাকি জীবন কাটানোর সুযোগ পাবেন। কিন্তু কায়লান সেই সুযোগ আর কখনোই পাবে না।
পরিবার তাই সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। তারা হোয়াইটম্যানের আগাম মুক্তি ঠেকাতে একটি আবেদনও শুরু করেছে।
ক্রেগ বলেন, কায়লানের পরিবার তাকে ন্যায়বিচার এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যেতে চায়।
সরকারের ব্যাখ্যা

যুক্তরাজ্যের বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরও বেশি অপরাধীকে সাজা শেষ হওয়ার আগেই মুক্তি পাওয়া থেকে বিরত রাখতে সরকার চায়। তবে কারাগারের ধারণক্ষমতা সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ব্যবস্থা না নিলে কারাগার ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, এমন পরিস্থিতি হলে পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে সমস্যায় পড়তে পারে, আদালত অভিযুক্তদের হেফাজতে পাঠাতে না-ও পারে এবং সমাজে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সরকার জানিয়েছে, কারাগারে নতুন জায়গা তৈরির পাশাপাশি অপরাধীদের ওপর নজরদারি আরও কঠোর করা এবং ভুক্তভোগীদের মতামতকে মুক্তির শর্ত নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে কায়লানের পরিবারের কাছে এসব ব্যাখ্যার চেয়ে একটি প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে—মাত্র ১৩ বছর বয়সে যে শিশুটির জীবন থেমে গেল, তার জন্য ন্যায়বিচারের অর্থ কি এত দ্রুত সাজা শেষ হয়ে যাওয়া?
পরিবারের দাবি, কারাগারের সংকটের সমাধান হতে পারে, কিন্তু একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া জীবন আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
কায়লানের পরিবারকে ঘিরে মূল প্রশ্ন: একজন মদ্যপ ও মাদকগ্রহণকারী চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনায় ১৩ বছরের একটি শিশুর মৃত্যু হলে, কারাগারের ধারণক্ষমতার সংকট কি তার শাস্তি কমানোর যথেষ্ট কারণ হতে পারে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















