ইসরায়েলে জুলাইয়ের শুরু থেকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক বা স্টেট কম্পট্রোলার পদটি কার্যত শূন্য। রাষ্ট্রের নীতি, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার দায়িত্ব যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের, সেটিই এখন নেতৃত্বহীন। বিষয়টি নিছক একটি প্রশাসনিক শূন্যতা নয়। বিশেষ করে যখন দেশটি দলীয় প্রার্থী বাছাই এবং সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, তখন এই পরিস্থিতি সরাসরি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ন্যায্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এই শূন্যতার পেছনে রয়েছে এমন একটি ঘটনা, যা আরও গুরুতর। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক নির্বাচনের জন্য নেসেটকে পুনরায় ভোট আয়োজন করতে বলা হয়েছিল। আগের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের পর আদালত এই নির্দেশ দেয়। কিন্তু নেসেটের স্পিকার আমির ওহানার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় সেই প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
অর্থাৎ, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ কার্যকর না করেই রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তদারকি প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্বহীন রাখা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এর প্রভাব শুধু একটি পদে নিয়োগ আটকে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত পড়ে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর।
নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের গুরুত্ব
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব সাধারণ সরকারি হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রচারণার ব্যয় এবং নির্বাচনী আইন মেনে চলার বিষয়েও এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও অর্থব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। কোনো দল আইন লঙ্ঘন করলে জরিমানাও আরোপ করা যায়। নির্বাচনী সময়েই দলগুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া, নিয়মিত বিষয়ে পরামর্শ প্রদান, কোনো অনুদান আইনবিরোধী কি না তা নির্ধারণ এবং দলীয় কাঠামোর বাইরে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান নির্ধারণেও এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা রয়েছে।
কিন্তু এবারের নির্বাচনী চক্রে সমস্যাটি আরও গভীর। ইসরায়েলের ২৬তম নেসেট নির্বাচনের আগে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রার্থী বাছাই বা প্রাইমারি ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা অর্থ সংগ্রহ করছেন, রাজনৈতিক পরামর্শক ও প্রচার ব্যবস্থাপক নিয়োগ করছেন এবং দলের সদস্যদের সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন বৈঠক ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
এই প্রতিযোগিতার মাঝেই নেই সেই প্রতিষ্ঠান, যার অন্যতম দায়িত্ব ছিল প্রার্থীদের নির্বাচনী অর্থায়ন আইন মেনে চলা নিশ্চিত করা।
প্রাইমারিতে অর্থের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ
দলীয় প্রার্থী বাছাইকে অনেক সময় সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এখানেও অর্থ ও প্রচারণার শক্তি প্রার্থীদের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সে কারণেই প্রার্থীদের অনুদান সংগ্রহের পরিমাণ, প্রচার ব্যয়ের সীমা এবং আর্থিক হিসাব প্রকাশের বিষয়ে আইন নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ তৈরি করেছে।
এই বিধানের উদ্দেশ্য একেবারেই পরিষ্কার—অর্থের প্রভাব যেন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে একচেটিয়া করে না ফেলে, প্রার্থীদের জন্য তুলনামূলক সমান সুযোগ বজায় থাকে এবং ভোটার ও দলীয় সদস্যদের কাছে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন থাকে।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় বছরের পর বছর প্রাইমারি নির্বাচনের পর প্রার্থীদের আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করেছে। কোথায় নিয়ম ভাঙা হয়েছে, কোথায় ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করা হয়েছে, কোথায় নিষিদ্ধ অনুদান গ্রহণ করা হয়েছে কিংবা কোথায় প্রয়োজনীয় হিসাব জমা দেওয়া হয়নি—এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
অনিয়মের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের জরিমানাও আরোপ করা হয়েছে। ফলে প্রার্থীরা জানতেন, তাদের নির্বাচনী অর্থায়ন পরবর্তীতে কঠোরভাবে যাচাই হতে পারে। এই সম্ভাব্য নজরদারিই অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলার বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
এবার সেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত থেমে গেছে।
আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের নিশ্চয়তা নেই
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যে প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচনী অর্থায়ন তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার অনুপস্থিতিতে আইনগুলো কাগজে বহাল থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এতে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একজন প্রার্থী যদি কঠোরভাবে সব নিয়ম মেনে প্রচারণা চালান, কিন্তু অন্য একজন ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করেন বা অনুমোদনহীন অর্থ গ্রহণ করেন, তাহলে দুজন একই প্রতিযোগিতায় থাকবেন না। বিশেষ করে যদি নিয়ম ভঙ্গের পর শাস্তির ঝুঁকি আগের তুলনায় কম বলে মনে হয়, তাহলে আইন মেনে চলা প্রার্থীই তুলনামূলক অসুবিধায় পড়তে পারেন।
এখানেই নির্বাচনী তদারকির মূল যুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন কার্যকর নিয়ন্ত্রক শুধু অনিয়ম শনাক্ত করেন না; তার উপস্থিতিই সম্ভাব্য অনিয়মকারীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।
তাই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের অনুপস্থিতি কোনো কাগজপত্রের জটিলতা নয়। এটি নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
নজরদারি বন্ধ হলে ক্ষতি আরও বিস্তৃত
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের পদ শূন্য থাকার প্রভাব শুধু দলীয় প্রাইমারি বা সাধারণ নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়। এই প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কাজের আরও অনেক অংশ বর্তমানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নতুন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক না থাকায় নতুন কোনো বিষয় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে পরীক্ষা বা তদন্ত শুরু করা যাচ্ছে না। এমনকি যেসব প্রতিবেদন ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে, সেগুলোও প্রকাশ করা যাচ্ছে না। ফলে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর যে স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি থাকার কথা, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্থবির হয়ে পড়েছে।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগের। আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক একই সঙ্গে ওমবাডসম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। এর অর্থ, সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারী হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক না থাকায় এমন সরকারি কর্মকর্তা, যারা দুর্নীতি বা অনিয়মের তথ্য সামনে আনতে চান, তারা প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। চাকরি হারানো, প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ কিংবা পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কা তখন আরও বাস্তব হয়ে ওঠে।
গণতন্ত্রের জন্য প্রশ্নটি তাই আরও বড়
এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য নতুন কোনো আইন প্রয়োজন নেই। নতুন কমিটি গঠনেরও প্রয়োজন নেই। বিকল্প কোনো তদারকি কাঠামো তৈরির প্রয়োজনও নেই।
প্রয়োজন শুধু বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক নির্বাচনের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে প্রতিষ্ঠানটিকে আবার পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে সরাসরি সমাধান।
বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে, তখন নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান তদারকি প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর অবস্থায় রাখা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার দিয়ে টিকে থাকে না। নির্বাচনী প্রতিযোগিতার নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হওয়া, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের কর্মকাণ্ডের ওপর স্বাধীন নজরদারি থাকা এবং আইন ভাঙলে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত।
আর সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে কাজ করতে না পারে, তাহলে সংকটটি কেবল একটি নিয়োগ নিয়ে থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি নিজেদের নির্ধারিত সীমার মধ্যে কাজ করছে, নাকি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কাছে ধীরে ধীরে তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে?
নির্বাচনের আগে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনের ফলাফল শুধু ব্যালটের ওপর নির্ভর করে না; নির্বাচনের আগে যে পরিবেশ তৈরি হয়, অর্থের যে প্রবাহ ঘটে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য যে নিয়ম নির্ধারিত থাকে—সব মিলিয়েই একটি নির্বাচন কতটা অবাধ, ন্যায্য ও বিশ্বাসযোগ্য হবে তা নির্ধারিত হয়।
ইসরায়েলের গণতন্ত্রের জন্য তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা, আদালতের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের চেয়ার খালি রেখে নির্বাচনমুখী হওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামোর জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
ওফের কেনিগ ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির গবেষক এবং আশকেলন একাডেমিক কলেজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক। আসাফ শাপিরা ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির প্রধান।
ওফের কেনিগ ও আসাফ শাপিরা 


















