ক্রিস্টোফার নোলানের বহুল প্রতীক্ষিত ‘দ্য অডিসি’ মুক্তির পর বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন কৌতূহল। হোমারের মহাকাব্যিক কাহিনিকে পর্দায় রূপ দিতে গিয়ে নোলান শুধু প্রাচীন গ্রিসের এক বীরের দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের গল্প বলেননি; বরং যুদ্ধ, অপরাধবোধ, নৈতিকতার পতন, মানুষের নিষ্ঠুরতা এবং ধ্বংসের পর সভ্যতার পুনর্জন্মকে গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
ছবিটির মুক্তির আগে নোলান বরাবরের মতোই শেষ পরিণতি নিয়ে রহস্য বজায় রেখেছিলেন। কারণ তার সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দর্শককে সব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু ছবিটি মুক্তির পর তিনি এর শেষ অধ্যায় এবং হোমারের মূল কাহিনি থেকে নিজের করা পরিবর্তনগুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।
ওডিসিউসের সবচেয়ে বড় শত্রু তার নিজের অপরাধবোধ
নোলানের ‘দ্য অডিসি’তে ওডিসিউসকে নিখুঁত বীর হিসেবে দেখানো হয়নি। তিনি একজন অসাধারণ বুদ্ধিমান নেতা, কিন্তু একই সঙ্গে ভুলে ভরা একজন মানুষ। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি এবং সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর ভার তাকে মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত করে।
বিশেষ করে ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাঠের ঘোড়ার পরিকল্পনাকে নোলান ওডিসিউসের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বুদ্ধিমত্তাই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। ফলে গল্পের শুরু থেকেই ওডিসিউসের চরিত্রের মধ্যে এক ধরনের করুণ ত্রুটি তৈরি হয়।
নোলানের মতে, এই জায়গাতেই তার আগের ছবি ‘ওপেনহাইমার’-এর সঙ্গে ‘দ্য অডিসি’র গভীর মিল তৈরি হয়েছে। দুই গল্পেই এমন দুই অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষকে দেখা যায়, যারা নিজেদের মেধা দিয়ে এমন কিছু তৈরি করেন, যার ধ্বংসাত্মক পরিণতি পরে তাদের তাড়া করে বেড়ায়।
‘শুধু পারি বলেই করা উচিত নয়’
নোলানের কাছে ওডিসিউসের গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—কোনো কিছু করার ক্ষমতা থাকলেই সেটি করা উচিত নয়।
ওডিসিউসের বুদ্ধি তাকে বারবার বিপদ থেকে বের করে আনে, কিন্তু একই বুদ্ধি আবার নতুন বিপদের জন্ম দেয়। তার বন্ধু ইউমায়োস শুরুতেই সতর্ক করে দেয়, তার অতিরিক্ত বুদ্ধিমত্তাই একদিন তার জন্য বিপদ ডেকে আনবে।
নোলান মনে করেন, এই ধারণাটিই ‘ওপেনহাইমার’-এর সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। জ্ঞান ও ক্ষমতা মানুষের হাতে অসাধারণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতার নৈতিক সীমা অতিক্রম করলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
দেবতারা কি সত্যিই আছেন?
ছবিতে জেন্ডায়ার রহস্যময় চরিত্র নিয়েও দর্শকদের মধ্যে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। তিনি কি সত্যিই দেবী, নাকি ওডিসিউসের অপরাধবোধের এক মানসিক প্রতিরূপ—এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে চাননি নোলান।
তার মতে, দর্শকের অভিজ্ঞতাকে নিজের ব্যাখ্যা দিয়ে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। তিনি বরং চেয়েছেন প্রাচীন মানুষের চোখ দিয়ে দেবতাদের উপস্থিতি দেখাতে।
সেই সময়ে মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দেবতাদের অস্তিত্ব খুঁজে নিত। মানুষের আচরণেও তারা দেবতার প্রভাব দেখতে পেত। ফলে দেবতা বাস্তবে আছেন কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষ কীভাবে দেবতাদের অস্তিত্ব অনুভব করে।
ওডিসিউস যখন তার ছেলে টেলেমাকাসকে বলে, মানুষের মধ্যে দেবতাকে খুঁজে হতাশ হয়ো না, তখন নোলানের কাছে সেই বক্তব্যের মধ্যেও ওডিসিউসের নিজের অস্বীকার করার প্রবণতা ধরা পড়ে।


ট্রয়ের ধ্বংসে ভেঙে যায় ‘জিউসের আইন’
নোলানের ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘জিউসের আইন’। এর পেছনে রয়েছে প্রাচীন গ্রিক সমাজের অতিথি ও আতিথেয়তার নৈতিক বিধান।
হাজার হাজার বছর আগে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হওয়া একজন মানুষ সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের ওপর নির্ভর করত। কোথাও পৌঁছালে তাকে খাবার ও পানি দেওয়া হবে—এই বিশ্বাসই ছিল সামাজিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
অতিথিকে সম্মান করা এবং অপরিচিত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার এই নীতি ছিল অনেকটা মানবিকতার সর্বজনীন নিয়মের মতো। এমনকি একজন অপরিচিত মানুষ ছদ্মবেশী দেবতাও হতে পারেন—এই বিশ্বাসও সেই সামাজিক নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
নোলানের গল্পে ট্রয়ের লুণ্ঠন সেই নৈতিক ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দেয়। যুদ্ধ শুধু একটি শহর ধ্বংস করে না; মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিকেও ভেঙে দেয়।
যুদ্ধ মানুষকে কখন পশুতে পরিণত করে
‘দ্য অডিসি’তে মানুষের নিষ্ঠুরতা নোলানের অন্যতম প্রধান বিষয়। যুদ্ধের সুযোগ পেলে মানুষ কত সহজে নির্মম হয়ে উঠতে পারে, ছবিতে তার একাধিক উদাহরণ রয়েছে।
ট্রয়ের মন্দিরে পুরোহিতাকে হত্যা করা থেকে শুরু করে শহর লুণ্ঠনের ভয়াবহতা—সবকিছুই দেখায়, সভ্যতার আবরণ কতটা পাতলা হতে পারে।
সার্সিও ওডিসিউসের সৈন্যদের ‘শূকর’ বলে অভিহিত করে। তার অভিযোগ, সুযোগ পেলে ওই মানুষগুলো তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করত। পরবর্তী সময়ে ট্রয়ে গ্রিক সৈন্যদের আচরণ দর্শকের সামনে সেই অভিযোগের ভয়াবহ সত্যতাই তুলে ধরে।
নোলান জানান, হোমারের মহাকাব্যের শেষ অংশে নারীর প্রতি যে ভয়াবহ ও পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার বর্ণনা রয়েছে, তার কিছু অংশ তিনি বাদ দিয়েছেন। তবে পুরুষের যুদ্ধপ্রবণতা এবং যুদ্ধ কীভাবে মানুষকে নিষ্ঠুর করে তোলে—এই প্রশ্ন তিনি ছবির বাইরে রাখেননি।
হেলেনের মুখের ক্ষত কেন?
হেলেনের মুখে ক্ষতচিহ্ন দেওয়ার সিদ্ধান্তও নোলানের নিজস্ব সৃজনশীল সংযোজন।
হোমারের কাহিনিতে হেলেনকে ঘিরে সৌন্দর্য, আকর্ষণ ও যুদ্ধের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নোলানের কাছে প্রশ্ন ছিল—দীর্ঘ যুদ্ধের পর মেনেলাউস যখন হেলেনকে ফিরিয়ে নেয়, তখন তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক কেমন হতে পারে?
যে নারীকে ঘিরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যে যুদ্ধ পুরো বিশ্বকে বদলে দিয়েছে, তাকে কি যুদ্ধ শেষে আবার আগের মতো গ্রহণ করা সম্ভব?
এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে হেলেনের মুখের ক্ষতকে ব্যবহার করেছেন নোলান। এটি শুধু ব্যক্তিগত সহিংসতার চিহ্ন নয়; বরং যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের প্রতীক।
হেলেন শুধু একজন নারী নন, যুদ্ধের স্মৃতিও
হেলেনের মুখ একসময় সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল। কিন্তু নোলানের ছবিতে সেই মুখের ক্ষত যুদ্ধের ভয়াবহতার স্মারক হয়ে ওঠে।
মেনেলাউস তাকে কেন আঘাত করেছে—সে হেলেনকে যুদ্ধের জন্য দায়ী মনে করেছিল, নাকি আবার কেউ তাকে নিয়ে যাবে এই ভয় থেকে—এই ব্যাখ্যাও ছবিতে পুরোপুরি একমাত্রিক নয়।
নোলান বরং খুব অল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী সম্পর্কের বিষাক্ত বাস্তবতাকে বোঝাতে চেয়েছেন।

কেন ওডিসিউস ও পেনেলোপিকে সুখী পরিণতি দেওয়া হলো?
হোমারের মহাকাব্যের তুলনায় নোলানের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ওডিসিউস ও পেনেলোপির সম্পর্কের পরিণতি।
তিনি তাদের এমন একটি সমাপ্তি দিয়েছেন, যেখানে ধ্বংসের মধ্যেও পুনর্মিলন ও আশার জায়গা রয়েছে।
কারণ নোলানের কাছে ‘দ্য অডিসি’ শুধু পতনের গল্প নয়। এটি সভ্যতার ধ্বংস ও পুনর্গঠনের গল্পও।
তিনি দেখাতে চেয়েছেন, ইতিহাস বারবার একই ধরনের চক্রের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। এক অর্থে এটি হতাশাজনক—মানুষ একই ভুল বারবার করতে পারে। কিন্তু একই চক্রের মধ্যে আশার সম্ভাবনাও থাকে।
পেনেলোপির বিশ্বাস, সভ্যতা আবারও উঠে দাঁড়াবে। ধ্বংসের পর নতুন জীবন জন্ম নেবে। গাছ আবার বেড়ে উঠবে, সমাজ আবার গড়ে উঠবে, মানুষ আবার নতুন করে শুরু করবে।
ধ্বংসের মধ্যেও পুনর্জন্মের আশা
নোলানের ‘দ্য অডিসি’ তাই শুধু একটি প্রাচীন মহাকাব্যের চলচ্চিত্ররূপ নয়। এটি মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও অহংকার, যুদ্ধের নৃশংসতা, অপরাধবোধ, নৈতিকতার পতন এবং পুনরুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে একটি আধুনিক চিন্তাও।
ওডিসিউসের ভুলের সঙ্গে ‘ওপেনহাইমার’-এর অপরাধবোধের মিল, ট্রয়ের ধ্বংসের সঙ্গে নৈতিক বিধির পতন, হেলেনের মুখের ক্ষতের সঙ্গে যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি এবং শেষ পর্যন্ত পেনেলোপির মুখে পুনর্জন্মের আশাবাদ—সব মিলিয়ে নোলান পুরোনো মহাকাব্যকে নতুন এক মানবিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছেন।
তার গল্পে বীর মানেই নিখুঁত মানুষ নয়। বরং বীরও ভুল করে, অপরাধবোধে ভোগে, নিজের সিদ্ধান্তের মূল্য দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও নতুন শুরুর সম্ভাবনা খোঁজে।
সেই কারণেই নোলানের ‘দ্য অডিসি’ সম্ভবত শুধু ওডিসিউসের ঘরে ফেরার গল্প নয়—এটি মানুষের নিজের তৈরি ধ্বংসের পর আবার ঘরে ফেরার, আবার সভ্যতা গড়ে তোলার এবং নিজের ভুল থেকে নতুন ভবিষ্যৎ তৈরি করার গল্প।
মানুষ যতবার ধ্বংসের দিকে এগিয়েছে, ততবারই তার ভেতরে পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষাও জেগেছে—নোলানের ‘দ্য অডিসি’ সেই দ্বন্দ্বকেই সবচেয়ে বড় করে সামনে আনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















