ইতালির ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিএপিইআর ব্যাংকা (BPER Banca)। ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক একসময় মূলত আঞ্চলিক সঞ্চয় ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু প্রায় ১৬০ বছরের ইতিহাস পেরিয়ে এখন প্রতিষ্ঠানটি ইতালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ব্যাংকিং শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
মোদেনা শহরকে সাধারণত ফেরারির যান্ত্রিক উৎকর্ষ এবং বিখ্যাত বালসামিক ভিনেগারের ঐতিহ্যের জন্য চেনা হয়। সেই শহরেই গড়ে ওঠা বিএপিইআর এখন ইতালির অর্থনীতি ও ব্যবসার বৃহত্তর পরিসরে নিজের প্রভাব বিস্তার করছে। ২০২৭ সালে ১৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় ব্যাংকটির এই রূপান্তরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়ান্নি ফ্রাঙ্কো পাপা।
২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিন বছর বিএপিইআরের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন পাপা। আইন বিষয়ে পড়াশোনা দিয়ে শুরু করলেও পরে অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। তাঁর প্রায় ৪০ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের বড় অংশ কেটেছে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে। ইউনিক্রেডিটে দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ব্যাংকিং ও আর্থিক বাজারের জটিলতা কাছ থেকে দেখেছেন।
পাপার ভাষায়, তাঁর কর্মজীবনের ২৬ বছরই কেটেছে দেশের বাইরে। এশিয়ায় দীর্ঘ সময় কাজের পর তিনি নিউইয়র্কে এবং পরে ভিয়েনায় দায়িত্ব পালন করেন। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং আর্থিক বাজারের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা বিএপিইআরের বর্তমান কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। বাণিজ্যনীতি, শুল্ক, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতৃত্ব বিএপিইআরকে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সুবিধা দিচ্ছে।
আঞ্চলিক ব্যাংক থেকে জাতীয় শক্তি
পাপার নেতৃত্বে বিএপিইআরের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো এর ভৌগোলিক বিস্তার। একসময়কার ‘ব্যানকা পপোলারে দেল্লেমিলিয়া-রোমানিয়া’ এখন প্রায় ১১ শতাংশ জাতীয় বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে ইতালির গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান।
বড় ধরনের অধিগ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকটির সম্প্রসারণ আরও দ্রুত হয়েছে। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিগ্রহণ চূড়ান্ত হওয়ার পর বিএপিইআরের কর্মীসংখ্যা বেড়ে প্রায় ২৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখে পৌঁছেছে।
দেশের অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ব্যাংকটির উপস্থিতিও শক্তিশালী। লোম্বার্দিয়ায় শাখাভিত্তিক বাজার অংশীদারত্ব প্রায় ১৮ শতাংশ এবং লিগুরিয়ায় তা প্রায় ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ স্থানীয় শিকড় ধরে রেখেই জাতীয় পর্যায়ে ব্যাংকটির প্রভাব বাড়ছে।
এই রূপান্তরকে পাপা দুটি ধারার কৌশলের ফল হিসেবে দেখছেন—নিজস্ব ব্যবসার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অধিগ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত সম্প্রসারণ। তাঁর মতে, বিএপিইআরকে একটি স্থানীয় প্রাদেশিক ব্যাংক থেকে জাতীয় পর্যায়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়েছে।
পুরোনো ব্যাংক, নতুন প্রযুক্তি
প্রায় ১৬০ বছরের ইতিহাস বিএপিইআরকে ঐতিহ্য দিয়েছে, কিন্তু প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে পড়েনি প্রতিষ্ঠানটি। গত পাঁচ বছরে ব্যাংকটি আধুনিকায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে।
সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটির ডিজিটাল অবকাঠামো নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফল হিসেবে বিএপিইআরের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ইউরোপের অন্যতম উন্নত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে পাপার দৃষ্টিতে ব্যাংকিং শুধু প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা নয়। মানুষের আস্থা এখনও এর কেন্দ্রবিন্দু।
এই কারণে বিএপিইআর একটি সমন্বিত বা ‘অমনিচ্যানেল’ ব্যাংকিং মডেল অনুসরণ করছে। গ্রাহক চাইলে সরাসরি শাখায় গিয়ে সেবা নিতে পারেন, ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন অথবা অনলাইন শাখার মাধ্যমে মানব পরামর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। এই ‘ব্রাঞ্চ অনলাইন’ ব্যবস্থায় প্রায় ৬০০ মানব পরামর্শক কাজ করছেন।
পাপার যুক্তি, ব্যাংকের শক্তি হলো মূলধন ও আস্থা, আর ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের শক্তি প্রযুক্তি। তাই প্রতিযোগিতার বদলে দুই পক্ষের অংশীদারত্বের সুযোগ রয়েছে। গ্রাহকের সামনে একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের নিওব্যাংক এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকের বিকল্প তৈরি হয়েছে।

অনিশ্চিত অর্থনীতিতে সতর্ক কৌশল
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএপিইআর আগ্রাসী ঝুঁকি নেওয়ার বদলে শক্তিশালী সুরক্ষা কাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে। শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ব্যাংকিং খাতে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে বিএপিইআর ‘সেরার আশা, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি’ নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যাংকটির নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ১ শতাংশ। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত সঞ্চিতি ও শক্তিশালী মূলধন অনুপাত রাখা হয়েছে, যাতে হঠাৎ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া যায়।
এই সতর্কতা শুধু ঝুঁকি কমানোর জন্য নয়; বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের কাছে পূর্বানুমেয়তা তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। অনিশ্চিত পরিবেশে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক ঋণে বিস্তার
বিএপিইআরের প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যাংকিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ব্যাংক বিমা বা ‘ব্যাংকঅ্যাস্যুরেন্স’ ব্যবসাতেও প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়দের একটি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
করপোরেট ব্যাংকিংয়েও বিএপিইআর ইতালির তুলনামূলক স্থবির বাজারের চেয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে। করপোরেট ব্যবসায় বছরে প্রায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে ব্যাংকটি।
ইতালির ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিএপিইআরকে একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ঋণের পাশাপাশি লিজিং, ফ্যাক্টরিংসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবা একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। ফলে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন আর্থিক সেবা এক জায়গা থেকেই পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
সবুজ অর্থায়নে ৭ বিলিয়ন ইউরো
পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নও বিএপিইআরের ব্যবসায়িক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ব্যাংকটি সবুজ ঋণ ও টেকসই প্রকল্পে ৭ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া ব্যাংকটির নীতির অংশ। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিএপিইআর ট্রিপল ই প্লাস পর্যায়ের ইএসজি মূল্যায়নও পেয়েছে।
বিশেষ করে তরুণ গ্রাহকদের মধ্যে অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং সেই অর্থের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব কী—এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতের ব্যাংকিং ব্যবসায় শুধু সুদের হার বা সেবার মান নয়, ব্যাংকের সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থানও গ্রাহকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে বিএপিইআর।
ইতালি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসর
ব্যাংকটির মূল বাজার ইতালি হলেও এর আন্তর্জাতিক কার্যক্রমও বিস্তৃত হচ্ছে। লুক্সেমবার্গ, সুইজারল্যান্ড এবং মনাকোতে বিশেষায়িত কার্যালয়ের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলাচলকারী গ্রাহকদের আর্থিক সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ইতালি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএপিইআর নিজেকে ইতালীয় ব্যবসা ও বিনিয়োগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পুঁজির সংযোগকারী একটি আর্থিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
এখানেই ব্যাংকটির ‘মেড ইন ইতালি’ পরিচয়ের নতুন অর্থ তৈরি হচ্ছে। এটি শুধু ইতালিতে জন্ম নেওয়া একটি ব্যাংক নয়; বরং ইতালির শিল্প, ব্যবসা ও বিনিয়োগকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে।
সামনে আরও বড় প্রতিযোগিতা
দুই বছরে বিএপিইআরের বাজারমূল্য প্রায় চার গুণ বেড়েছে। পাপা এই সাফল্যকে ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখার বদলে পুরো দলের পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে এই দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। বড় অধিগ্রহণের পর একটি ব্যাংকের জন্য প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট সংস্কৃতির সমন্বয় করা সহজ নয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, সুদের হার, বাণিজ্যনীতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবর্তনও ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তারপরও বিএপিইআরের বর্তমান কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিষয়—শক্তিশালী মূলধন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং দীর্ঘদিনের গ্রাহক আস্থা।
প্রায় ১৬০ বছরের পুরোনো একটি ব্যাংক কীভাবে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ের আর্থিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে, বিএপিইআর তারই একটি উদাহরণ তৈরি করছে। পাপার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য শুধু আকারে বড় হওয়া নয়; বরং ইতালির অর্থনীতি, ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত একটি নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া।
আধুনিক প্রযুক্তি, সতর্ক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সবুজ অর্থায়ন এবং মানবিক ব্যাংকিং—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে বিএপিইআর এখন ইতালির ব্যাংকিং মানচিত্র নতুন করে আঁকছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















