কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতে এর বাস্তব প্রভাব তার চেয়েও অনেক বড় হতে পারে বলে মনে করছেন কোয়ালকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রিস্টিয়ানো আমন। তাঁর মতে, অতীতে ইন্টারনেটের সম্ভাবনাকেও মানুষ যে মাত্রায় কল্পনা করেছিল, বাস্তবে তার বিস্তার হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
যোগাযোগ প্রযুক্তির অন্যতম বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কোয়ালকমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমন। এ প্রতিষ্ঠানটির তৈরি চিপ স্মার্টফোন থেকে শুরু করে গাড়ি ও নানা ধরনের ভোক্তা প্রযুক্তিপণ্যে ব্যবহৃত হয়। প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ বছর পূর্ণ করার সময়ে তিনি এমন এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যখন এআই ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি একসঙ্গে প্রযুক্তি বিশ্বের ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে।
সম্প্রতি টাইমের নতুন সাক্ষাৎকারভিত্তিক ধারাবাহিক ‘দ্য সিইও মোমেন্ট’-এ আমন এআইয়ের ভবিষ্যৎ, ব্যক্তিগত এআই ডিভাইস এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সেমিকন্ডাক্টর বাণিজ্য নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
‘আমরা গ্ল্যাডিয়েটরের ব্যবসায় আছি’

নিজের দলের সদস্যদের উদ্দেশে আমন প্রায়ই বলেন, ‘আমরা গ্ল্যাডিয়েটরের ব্যবসায় আছি।’ কেন এমন তুলনা করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একজন গ্ল্যাডিয়েটর যখন কলোসিয়ামে প্রবেশ করেন, তখন মূলত তিনটি সম্ভাবনা থাকে—জয়, পরাজয় অথবা দুপক্ষেরই ক্ষতি।
অর্থাৎ প্রতিযোগিতার ময়দানে প্রবেশের সময় সাফল্যের সম্ভাবনা খুব সীমিত। তাঁর ভাষায়, শুরুতেই সাফল্যের সম্ভাবনা যেন মাত্র ৩৩ শতাংশ। আর কেউ জিতলেও তার অর্জন কেবল পরবর্তী লড়াইয়ে আবার প্রবেশ করার সুযোগ পাওয়া।
এই উদাহরণের মাধ্যমে আমন বোঝাতে চান, প্রযুক্তি খাতে প্রতিযোগিতা কতটা কঠিন এবং প্রতিনিয়ত নতুন করে টিকে থাকার লড়াই করতে হয়।
এআই নিয়ে মানুষ এখনো কম প্রত্যাশা করছে?
এআই সম্পর্কে মানুষ যতটা বড় পরিবর্তনের কথা ভাবছে, বাস্তবে সেটি আরও বড় হতে পারে—এমন মন্তব্যের কারণ জানতে চাইলে আমন ইন্টারনেটের ইতিহাসের উদাহরণ দেন।
তাঁর মতে, ২০০০-এর দশকে যখন ইন্টারনেট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তখন অনেকেই বলেছিলেন এটি বড় কিছু হতে যাচ্ছে। কিন্তু ২৬ বছর পর পেছনে তাকালে দেখা যায়, ইন্টারনেটের বিস্তার মানুষের প্রাথমিক ধারণার চেয়েও অনেক বেশি হয়েছে।
আমনের ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদে ইন্টারনেটকে বরং কম গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল। তাঁর বিশ্বাস, এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। মানুষ এখন এআইয়ের সম্ভাবনাকে যতটা বড় বলে মনে করছে, সময়ের সঙ্গে এর প্রভাব ও ব্যবহার তার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত হতে পারে।

স্মার্টফোনের পর কোথায় যাবে এআই?
ভবিষ্যতে মানুষের তথ্যের সঙ্গে যোগাযোগ কেবল স্মার্টফোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এমন একটি পৃথিবীর কথা ভাবছেন আমন। তবে স্মার্টফোনের পর নতুন ধরনের ব্যক্তিগত প্রযুক্তিপণ্য জনপ্রিয় করার চেষ্টা এর আগেও হয়েছে, যার অনেকগুলো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
এবারও বাজারে ব্যক্তিগত এআই ডিভাইস নিয়ে নানা ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। আমনের দাবি, বর্তমানে তিনি প্রায় ৪০ ধরনের নকশা বা ধারণার কথা জানেন, যেখানে মানুষকে ব্যক্তিগত এআইয়ের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস তৈরি করা হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে স্মার্ট চশমা, অলংকার, গলার লকেট বা পেনডেন্ট, কলম, ব্রেসলেট ও ঘড়ি। তবে এসবের সবগুলো শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তিনি।
কিন্তু একটি বিষয়ে তিনি তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসী—চশমা।
এআইয়ের ভবিষ্যতে চশমার ওপর কেন এত আস্থা?
আমনের মতে, মানুষের চোখ, কান ও মুখের খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় চশমা ব্যক্তিগত এআই ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হতে পারে।
চোখের সামনে থাকা একটি ডিভাইস একই সঙ্গে দেখার, শোনার এবং কথা বলার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে এআইয়ের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ আরও স্বাভাবিক ও সরাসরি হয়ে উঠতে পারে।
তিনি মনে করেন, ব্যক্তিগত এআই ডিভাইসের বাজারে অনেক ধরনের ধারণা পরীক্ষা করা হলেও চশমার ক্ষেত্রে সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
ট্রাম্প-শি বৈঠক থেকে কী দেখলেন আমন?
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে আমনও ছিলেন। ওই সফর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী হয়েছেন বলে জানান।
চীনা কোম্পানিগুলোকে মার্কিন প্রযুক্তিনির্ভর সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহের ক্ষেত্রে মূল্য রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, চীনের বাজারে মার্কিন প্রযুক্তির উপস্থিতি উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে উন্নত প্রযুক্তির চিপ চীনা কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বা প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নও ওঠে।

‘চিপ এখন সবকিছুর মধ্যেই আছে’
এই প্রশ্নের জবাবে আমন চিপের ব্যাপক ব্যবহারকে সামনে আনেন। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে চিপ কেবল কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে সীমাবদ্ধ নেই। প্রায় প্রতিটি ভোক্তা ইলেকট্রনিক পণ্য, গাড়ি, গৃহস্থালি যন্ত্রসহ অসংখ্য প্রযুক্তিপণ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে সেমিকন্ডাক্টর।
তিনি বিষয়টিকে একটি সরল প্রশ্নের মাধ্যমে দেখতে চান—মানুষ কি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মার্কিন প্রযুক্তি চায়, নাকি পুরো বিশ্বের জন্য মার্কিন প্রযুক্তি দেখতে চায়?
তবে তিনি স্বীকার করেন, বিষয়টি এতটা সরল নয় এবং এ অবস্থানের সঙ্গে অনেকেই একমত নাও হতে পারেন।
আমনের যুক্তি, শেষ পর্যন্ত বিষয়টি অনেকটাই হিসাব-নিকাশের। তাঁর মতে, বিশ্বের প্রতিটি শীর্ষস্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিরই চীনে কোনো না কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ বা উপস্থিতি রয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে, এটিকে নেতিবাচকভাবে দেখার পরিবর্তে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবসার বাস্তবতা হিসেবেই দেখা উচিত।
এআইয়ের পরবর্তী লড়াই
আমনের বক্তব্যে স্পষ্ট, এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু সফটওয়্যার বা বড় তথ্যকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্মার্টফোনের পর ব্যক্তিগত এআই ডিভাইসের নতুন এক যুগ তৈরি হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের শরীর ও দৈনন্দিন জীবনের আরও কাছাকাছি চলে আসবে।
চশমা, ঘড়ি, গয়না বা অন্য কোনো পরিধানযোগ্য যন্ত্রের মাধ্যমে এআই যদি মানুষের চারপাশের পরিবেশ বুঝতে, তথ্য সরবরাহ করতে এবং স্বাভাবিক কথোপকথনে অংশ নিতে পারে, তাহলে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও বদলে যেতে পারে।
সেই পরিবর্তনের জন্যই সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চিপ সরবরাহব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও এআইয়ের ভবিষ্যতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
আমনের বিশ্বাস, ইন্টারনেটের মতো এআইয়ের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ মানুষের বর্তমান কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই আজকের প্রযুক্তি বাজারে যে লড়াই চলছে, সেটি শুধু একটি নতুন প্রযুক্তিপণ্যের বাজার দখলের লড়াই নয়; বরং আগামী দিনের মানুষ ও প্রযুক্তির সম্পর্ক কেমন হবে, তারও ভিত্তি তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















