০৫:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জানুয়ারিতে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, পরীক্ষার সময় এড়িয়ে ইসির প্রস্তুতি ইতালির ব্যাংকিং খাতে নতুন শক্তি, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান থেকে জাতীয় জায়ান্ট বিএপিইআর শিল্পের পুরোনো শক্তিতে নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া, ইতালিতে শুরু ‘শিল্প পুনর্জাগরণ’ এআইকে মানুষ যতটা ভাবছে, বাস্তবে তার প্রভাব হতে পারে আরও বড় ব্যক্তিত্বের গড়নে জিনের প্রভাব কতটা? ১০ লাখের বেশি মানুষের তথ্য থেকে মিলল নতুন উত্তর ঘুম আসছে না? বিছানায় পড়ে না থেকে উঠে পড়ুন, বলছেন ঘুম বিশেষজ্ঞরা মিয়ানমারে ১০০ দিনের বেশি কারাভোগের পর মুক্ত অস্ট্রেলীয় ব্যবসায়ী বাবাকে হারিয়ে বদলে যাওয়ার লড়াই, অভিবাসী পরিবারের কণ্ঠ হয়ে উঠছেন সালগাদো ভাইয়েরা ঢাকা মেডিকেলে দুই হাজতির মৃত্যু চট্টগ্রামে পিকআপ থামিয়ে ৫০ লাখ টাকার সিগারেট লুটের অভিযোগ

ব্যক্তিত্বের গড়নে জিনের প্রভাব কতটা? ১০ লাখের বেশি মানুষের তথ্য থেকে মিলল নতুন উত্তর

মানুষের ব্যক্তিত্ব কি জন্মগত, নাকি জীবনের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের প্রভাবে গড়ে ওঠে—এই প্রশ্ন নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। নতুন এক বড় গবেষণা সেই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য যোগ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এক হাজারেরও বেশি জিনগত পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ব্যক্তিত্বের বড় অংশই যে শুধু জিনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ। এতে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য এবং জিনগত তথ্য—দুই ধরনের তথ্য থাকা ১০ লাখেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানে ব্যক্তিত্ব বোঝার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত একটি কাঠামো হলো ‘বিগ ফাইভ’। এর মধ্যে রয়েছে স্নায়ুচাপ বা উদ্বেগপ্রবণতার প্রবণতা, বহির্মুখিতা, নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি উন্মুক্ততা, সহমর্মিতা বা সহযোগিতাপ্রবণতা এবং দায়িত্বশীলতা। মানুষের স্বভাব ও আচরণের পার্থক্য বোঝাতে এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্যকে তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গবেষকদের মতে, এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে জিনের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে একেবারে নতুন ধারণা নয়। তবে অতীতের গবেষণাগুলোতে এই সম্পর্ক স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা কঠিন ছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা কম থাকা এবং প্রতিটি জিনগত পরিবর্তনের প্রভাব খুবই সামান্য হওয়া।

Autism Researchers Explore Role of Environmental Influences on Autism as  Part of Multi-Million Dollar NIH Effort

ক্রোয়েশিয়ার জাগরেব বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডেনিস ব্রাতকো বলেন, ব্যক্তিত্বের কিছু দিক যে জিনগতভাবে প্রভাবিত হতে পারে, তা বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই ধারণা করে আসছেন। কিন্তু আগের গবেষণাগুলো অনেক সময় এমন একটি বা কয়েকটি জিন খুঁজেছে, যেগুলোর প্রভাব খুব বড় হবে। বাস্তবে ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়।

নতুন গবেষণায় এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এমন তথ্যভান্ডার একত্র করা হয়, যেখানে একই মানুষের জিনগত তথ্য এবং ব্যক্তিত্ববিষয়ক প্রশ্নপত্রের ফলাফল—দুই ধরনের তথ্যই রয়েছে।

গবেষণার সহলেখক এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের জিনগত মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক মিশেল নিভার্ড বলেন, স্বাস্থ্য বোঝার ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগ ফাইভের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক লক্ষ্য করা হয়েছে। বিশেষ করে স্নায়ুচাপ বা উদ্বেগপ্রবণতার সঙ্গে উদ্বেগজনিত সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।

ব্যক্তিত্ব ও স্বাস্থ্য

গবেষণায় এক হাজারেরও বেশি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হয়েছে। বড় আকারের তথ্যভান্ডার ব্যবহারের কারণে গবেষকেরা ব্যক্তিত্ব, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং মানুষের জীবনের অন্যান্য বিভিন্ন তথ্যের মধ্যেও সম্পর্ক খুঁজে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, বহির্মুখিতার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য বেশি থাকা মানুষ কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনার দিক থেকে কিছুটা আলাদা ছিলেন। তবে এ ধরনের সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সংক্রমণের সম্পর্কের পেছনে আচরণ, সামাজিক যোগাযোগ, জীবনযাপন ও পরিবেশসহ একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে।

গবেষণায় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানুষের বসবাসের জায়গারও কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংকের বাসস্থানের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পান, নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি বেশি উন্মুক্ততার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকা মানুষদের মধ্যে বড় ও বৈচিত্র্যময় শহরে বসবাসের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি ছিল। অন্যদিকে, স্নায়ুচাপ বা উদ্বেগপ্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য বেশি থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তুলনামূলক সমৃদ্ধ শহরতলিতে বসবাসের প্রবণতা দেখা গেছে।

তবে এসব পর্যবেক্ষণকে ব্যক্তিত্বের সরাসরি ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। মানুষ কোথায় বসবাস করবে, কী ধরনের জীবন বেছে নেবে বা তার সামাজিক পরিবেশ কেমন হবে—এসবের ওপর অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, পরিবার, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক পরিস্থিতির মতো অসংখ্য বিষয় প্রভাব ফেলে।

How much of our personalities are determined at birth?

ব্যক্তিত্ব কি তাহলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া?

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলগুলোর একটি হলো, ব্যক্তিত্বের সর্বোচ্চ প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত জিনগত তথ্যের মাধ্যমে পূর্বানুমান করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তিত্বে জিনের ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু সেটি মোট ব্যক্তিত্বের একটি সীমিত অংশ।

এতে আরও শক্তিশালী হয়েছে সেই ধারণা যে মানুষের ব্যক্তিত্ব জিনগত বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশ—দুইয়ের জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফল। একজন মানুষের মধ্যে কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জিনগত প্রবণতা থাকলেই যে তার সন্তান একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে, এমনটাও নয়।

উদাহরণ হিসেবে গবেষকেরা বলছেন, একজন ব্যক্তি বহির্মুখী হলেই তার সন্তান অবশ্যই বহির্মুখী হবে—এমন কোনো সরল নিয়ম নেই। ব্যক্তিত্বের গঠন অনেক বেশি জটিল এবং এর সঙ্গে জিনের পাশাপাশি পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও জীবনের নানা ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষকদের আশা, ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা গেলে মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে এবং ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জৈবিক ভিত্তি কী—তা বোঝার ক্ষেত্রে নতুন পথ খুলবে।

নিভার্ডের মতে, মানুষকে ঘিরে একটি দীর্ঘদিনের প্রশ্ন হলো—আমাদের শরীর ও জীবনের অভিজ্ঞতা কি আমাদের ব্যক্তিত্ব তৈরি করে, নাকি আমাদের ব্যক্তিত্বই আমাদের অভিজ্ঞতা ও জীবনযাপনের ধরনকে প্রভাবিত করে? নতুন গবেষণার ফল সেই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয়নি; বরং বিষয়টি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে।

নিজের ব্যক্তিত্ব জানতে জিন পরীক্ষা নয়

নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য গবেষকদের পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিত্ব জানার ক্ষেত্রে জিনগত পরীক্ষা করার চেয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইকৃত ‘বিগ ফাইভ’ ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা এখনো বেশি কার্যকর।

নিভার্ড বলেন, নিজের ব্যক্তিত্ব জানার জন্য ব্যক্তিত্ব পরীক্ষার চেয়ে ভালো কোনো পদ্ধতি এখনো নেই। এসব পরীক্ষা নিখুঁত নয়, কিন্তু ব্যক্তিত্ব বোঝার ক্ষেত্রে জিনগত তথ্যের ওপর নির্ভর করার চেয়ে এগুলো অনেক বেশি কার্যকর।

অর্থাৎ নতুন গবেষণা ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে জিনের ভূমিকা নিশ্চিত করলেও মানুষের স্বভাবকে কেবল ‘জিনের ফল’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে জিনগত প্রবণতা, পরিবেশ ও জীবনের অভিজ্ঞতার জটিল সমন্বয়ে। আর সেই জটিলতাই হয়তো মানুষকে একে অন্যের চেয়ে আলাদা করে তোলে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

জানুয়ারিতে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, পরীক্ষার সময় এড়িয়ে ইসির প্রস্তুতি

ব্যক্তিত্বের গড়নে জিনের প্রভাব কতটা? ১০ লাখের বেশি মানুষের তথ্য থেকে মিলল নতুন উত্তর

০৪:০০:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানুষের ব্যক্তিত্ব কি জন্মগত, নাকি জীবনের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের প্রভাবে গড়ে ওঠে—এই প্রশ্ন নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। নতুন এক বড় গবেষণা সেই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য যোগ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এক হাজারেরও বেশি জিনগত পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ব্যক্তিত্বের বড় অংশই যে শুধু জিনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ। এতে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য এবং জিনগত তথ্য—দুই ধরনের তথ্য থাকা ১০ লাখেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানে ব্যক্তিত্ব বোঝার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত একটি কাঠামো হলো ‘বিগ ফাইভ’। এর মধ্যে রয়েছে স্নায়ুচাপ বা উদ্বেগপ্রবণতার প্রবণতা, বহির্মুখিতা, নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি উন্মুক্ততা, সহমর্মিতা বা সহযোগিতাপ্রবণতা এবং দায়িত্বশীলতা। মানুষের স্বভাব ও আচরণের পার্থক্য বোঝাতে এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্যকে তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গবেষকদের মতে, এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে জিনের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে একেবারে নতুন ধারণা নয়। তবে অতীতের গবেষণাগুলোতে এই সম্পর্ক স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা কঠিন ছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা কম থাকা এবং প্রতিটি জিনগত পরিবর্তনের প্রভাব খুবই সামান্য হওয়া।

Autism Researchers Explore Role of Environmental Influences on Autism as  Part of Multi-Million Dollar NIH Effort

ক্রোয়েশিয়ার জাগরেব বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডেনিস ব্রাতকো বলেন, ব্যক্তিত্বের কিছু দিক যে জিনগতভাবে প্রভাবিত হতে পারে, তা বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই ধারণা করে আসছেন। কিন্তু আগের গবেষণাগুলো অনেক সময় এমন একটি বা কয়েকটি জিন খুঁজেছে, যেগুলোর প্রভাব খুব বড় হবে। বাস্তবে ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়।

নতুন গবেষণায় এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এমন তথ্যভান্ডার একত্র করা হয়, যেখানে একই মানুষের জিনগত তথ্য এবং ব্যক্তিত্ববিষয়ক প্রশ্নপত্রের ফলাফল—দুই ধরনের তথ্যই রয়েছে।

গবেষণার সহলেখক এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের জিনগত মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক মিশেল নিভার্ড বলেন, স্বাস্থ্য বোঝার ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগ ফাইভের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক লক্ষ্য করা হয়েছে। বিশেষ করে স্নায়ুচাপ বা উদ্বেগপ্রবণতার সঙ্গে উদ্বেগজনিত সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।

ব্যক্তিত্ব ও স্বাস্থ্য

গবেষণায় এক হাজারেরও বেশি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হয়েছে। বড় আকারের তথ্যভান্ডার ব্যবহারের কারণে গবেষকেরা ব্যক্তিত্ব, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং মানুষের জীবনের অন্যান্য বিভিন্ন তথ্যের মধ্যেও সম্পর্ক খুঁজে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, বহির্মুখিতার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য বেশি থাকা মানুষ কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনার দিক থেকে কিছুটা আলাদা ছিলেন। তবে এ ধরনের সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সংক্রমণের সম্পর্কের পেছনে আচরণ, সামাজিক যোগাযোগ, জীবনযাপন ও পরিবেশসহ একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে।

গবেষণায় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানুষের বসবাসের জায়গারও কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংকের বাসস্থানের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পান, নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি বেশি উন্মুক্ততার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকা মানুষদের মধ্যে বড় ও বৈচিত্র্যময় শহরে বসবাসের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি ছিল। অন্যদিকে, স্নায়ুচাপ বা উদ্বেগপ্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য বেশি থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তুলনামূলক সমৃদ্ধ শহরতলিতে বসবাসের প্রবণতা দেখা গেছে।

তবে এসব পর্যবেক্ষণকে ব্যক্তিত্বের সরাসরি ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। মানুষ কোথায় বসবাস করবে, কী ধরনের জীবন বেছে নেবে বা তার সামাজিক পরিবেশ কেমন হবে—এসবের ওপর অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, পরিবার, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক পরিস্থিতির মতো অসংখ্য বিষয় প্রভাব ফেলে।

How much of our personalities are determined at birth?

ব্যক্তিত্ব কি তাহলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া?

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলগুলোর একটি হলো, ব্যক্তিত্বের সর্বোচ্চ প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত জিনগত তথ্যের মাধ্যমে পূর্বানুমান করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তিত্বে জিনের ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু সেটি মোট ব্যক্তিত্বের একটি সীমিত অংশ।

এতে আরও শক্তিশালী হয়েছে সেই ধারণা যে মানুষের ব্যক্তিত্ব জিনগত বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশ—দুইয়ের জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফল। একজন মানুষের মধ্যে কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জিনগত প্রবণতা থাকলেই যে তার সন্তান একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে, এমনটাও নয়।

উদাহরণ হিসেবে গবেষকেরা বলছেন, একজন ব্যক্তি বহির্মুখী হলেই তার সন্তান অবশ্যই বহির্মুখী হবে—এমন কোনো সরল নিয়ম নেই। ব্যক্তিত্বের গঠন অনেক বেশি জটিল এবং এর সঙ্গে জিনের পাশাপাশি পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও জীবনের নানা ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষকদের আশা, ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা গেলে মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে এবং ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জৈবিক ভিত্তি কী—তা বোঝার ক্ষেত্রে নতুন পথ খুলবে।

নিভার্ডের মতে, মানুষকে ঘিরে একটি দীর্ঘদিনের প্রশ্ন হলো—আমাদের শরীর ও জীবনের অভিজ্ঞতা কি আমাদের ব্যক্তিত্ব তৈরি করে, নাকি আমাদের ব্যক্তিত্বই আমাদের অভিজ্ঞতা ও জীবনযাপনের ধরনকে প্রভাবিত করে? নতুন গবেষণার ফল সেই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয়নি; বরং বিষয়টি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে।

নিজের ব্যক্তিত্ব জানতে জিন পরীক্ষা নয়

নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য গবেষকদের পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিত্ব জানার ক্ষেত্রে জিনগত পরীক্ষা করার চেয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইকৃত ‘বিগ ফাইভ’ ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা এখনো বেশি কার্যকর।

নিভার্ড বলেন, নিজের ব্যক্তিত্ব জানার জন্য ব্যক্তিত্ব পরীক্ষার চেয়ে ভালো কোনো পদ্ধতি এখনো নেই। এসব পরীক্ষা নিখুঁত নয়, কিন্তু ব্যক্তিত্ব বোঝার ক্ষেত্রে জিনগত তথ্যের ওপর নির্ভর করার চেয়ে এগুলো অনেক বেশি কার্যকর।

অর্থাৎ নতুন গবেষণা ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে জিনের ভূমিকা নিশ্চিত করলেও মানুষের স্বভাবকে কেবল ‘জিনের ফল’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে জিনগত প্রবণতা, পরিবেশ ও জীবনের অভিজ্ঞতার জটিল সমন্বয়ে। আর সেই জটিলতাই হয়তো মানুষকে একে অন্যের চেয়ে আলাদা করে তোলে।