পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজতে গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন একটি গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন, যেখানে প্রাণ টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। গ্রহটির নাম এলএইচএস ১১৪০বি। নতুন পর্যবেক্ষণ থেকে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, গ্রহটির চারপাশে হিলিয়ামসমৃদ্ধ একটি বায়ুমণ্ডল রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এখনো এই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তরল পানি, পাথুরে গঠন এবং বায়ুমণ্ডলের মতো প্রাণধারণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সেখানে থাকার সম্ভাবনা নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে।
প্রাণের জন্য উপযোগী তিন বৈশিষ্ট্য
পৃথিবীর মতো প্রাণের অস্তিত্বের জন্য সাধারণত কয়েকটি মৌলিক শর্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পাথুরে হওয়া, এমন তাপমাত্রায় থাকা যাতে তরল পানি থাকতে পারে এবং একটি বায়ুমণ্ডল থাকা—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এলএইচএস ১১৪০বি গ্রহটির ক্ষেত্রে এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই থাকার প্রমাণ বা শক্তিশালী ইঙ্গিত মিলেছে। গ্রহটি আমাদের সৌরজগৎ থেকে কয়েক ডজন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে।
গ্রহটির অবস্থান এমন একটি অঞ্চলে, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে বাসযোগ্য অঞ্চল বলা হয়। এই অঞ্চলে কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের কাছ থেকে এমন পরিমাণ তাপ পেতে পারে, যাতে তার পৃষ্ঠে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
পৃথিবীর চেয়ে ঠান্ডা, তবে আকারে বড়
এলএইচএস ১১৪০বি পৃথিবীর তুলনায় কিছুটা ঠান্ডা। একই সঙ্গে এর আকার ও ভরও পৃথিবীর চেয়ে বেশি। অর্থাৎ গ্রহটি পৃথিবীর হুবহু যমজ নয়, তবে প্রাণধারণের উপযোগী পরিবেশের সন্ধানে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রার্থী হয়ে উঠেছে।
গ্রহটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর সম্ভাব্য বায়ুমণ্ডল। নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সেখানে হিলিয়ামসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে।
বায়ুমণ্ডল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা বিচার করার ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি গ্রহের পৃষ্ঠে পানি ধরে রাখতে সহায়তা করে, তাপমাত্রার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে এবং মহাকাশ থেকে আসা ক্ষতিকর বিকিরণের বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
তাই কোনো সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহে বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাণের প্রমাণ এখনো মেলেনি
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক। এলএইচএস ১১৪০বিতে প্রাণ আছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। গ্রহটির পরিবেশ প্রাণের জন্য উপযোগী হতে পারে, কিন্তু উপযোগী পরিবেশ আর বাস্তবে প্রাণের অস্তিত্ব এক বিষয় নয়।
গ্রহবিজ্ঞানী কলিন চেরুবিমের মতে, এই মুহূর্তে সেখানে প্রাণের কোনো প্রমাণ নেই। তবে প্রাণ টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো সেখানে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষণাটি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের আশা, এলএইচএস ১১৪০বি নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল, পানি এবং পরিবেশ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দেবে।
একটি গ্রহের সন্ধান, নাকি নতুন এক জগতের শুরু?
জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারা সিগারের মতে, মহাবিশ্বে যদি এমন একটি গ্রহ পাওয়া যায়, তাহলে একই ধরনের আরও গ্রহ থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে এলএইচএস ১১৪০বি শুধু একটি সম্ভাবনাময় গ্রহের সন্ধান নয়; এটি মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো পরিবেশসম্পন্ন আরও বহু জগত থাকার সম্ভাবনার দিকেও ইঙ্গিত করতে পারে।
মানুষের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক প্রশ্নগুলোর একটি—মহাবিশ্বে আমরা কি একা? এলএইচএস ১১৪০বি এখনো সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। কিন্তু দূর মহাকাশের এই পাথুরে গ্রহটি অন্তত এটুকু আশা জাগিয়েছে যে, পৃথিবীর মতো প্রাণবান্ধব পরিবেশ হয়তো শুধু আমাদের গ্রহেই সীমাবদ্ধ নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















