বিশ্ব অর্থনীতিতে কখনো কখনো সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় তখনই, যখন সবাই ধরে নেয়—কিছুই ঘটবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ যেন এখন ঠিক এমনই এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর কৌশল হলো, ভবিষ্যতে সুদের হার নিয়ে ফেড কী করবে সে বিষয়ে খুব বেশি কিছু না বলা। ধারণাটি হলো, বাজার নিজেই অর্থনীতির গতিপথ বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু অর্থনীতিতে যখন একসঙ্গে একাধিক ঝুঁকি জমতে থাকে, তখন নীরবতা বাজারকে স্থির করার বদলে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি ফেডের নীতিনির্ধারণী বৈঠকের পর ওয়ার্শের সংবাদ সম্মেলন ছিল অত্যন্ত সংযত। সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের পরও তাঁর বক্তব্য বাজারকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার দ্রুত বেড়ে যায়। দশ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার একপর্যায়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। শেয়ারবাজারেও বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারে অস্থিরতা দেখা দেয়।
ওয়ার্শের কৌশলের মূল ধারণাটি সহজ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি আগেভাগে সুদের হার নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সংকেত না দেয়, তাহলে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এতে বাজারের ওপর কিছুটা দায়িত্ব চলে যাবে এবং ফেডকে প্রতিটি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে না।
কিন্তু এই কৌশল তখনই কাজ করতে পারে, যখন অর্থনীতিতে বড় কোনো ধাক্কা না আসে।
একসঙ্গে জমছে একাধিক ঝুঁকি
বর্তমান পরিস্থিতিতে সমস্যাটি হলো—একটি নয়, একাধিক ঝুঁকি একই সময়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে আলোচিত ঝুঁকিগুলোর একটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের সম্ভাব্য বড় পতন।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। অনেক কোম্পানির মূল্যায়ন অত্যন্ত দ্রুত বেড়েছে। এখন যদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়ে যায় এবং এই বাজারে বড় ধরনের বিক্রি শুরু হয়, তার প্রভাব শুধু শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ঋণবাজার এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তব অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
ইতিমধ্যে কিছু বড় বিনিয়োগে বিপর্যয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বড় অঙ্কের অর্থ পরিচালনাকারী একটি তহবিল সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং দ্রুত সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে বাজারে প্রশ্ন উঠেছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তৈরি বিপুল প্রত্যাশার কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে।
অবশ্য এখনই পরিস্থিতিকে ২০০০ সালের প্রযুক্তি-বুদ্বুদের মতো বলা যায় না। প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক এখনো বছরের শুরু থেকে ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু শেয়ারের আকর্ষণ কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শেয়ারবাজারের সঙ্গে ডলারের সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আরেকটি দুর্বল জায়গা হলো ডলার। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে মার্কিন সম্পদ নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু এই নিরাপত্তার ধারণার পেছনে শুধু সরকারি বন্ড নয়, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের আকর্ষণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে মার্কিন শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন, তাহলে ডলারের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকায় ট্রেজারি বন্ডের আকর্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এর আগে শুল্ক নিয়ে বড় ঘোষণা আসার পর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মার্কিন সম্পদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিন্তু একই ধরনের ঘটনা যদি এবার দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে তেলের ধাক্কা
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। বিশ্ববাজারের গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে উঠেছে, যেখানে জুলাইয়ের শুরুতে তা ছিল প্রায় ৭০ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে চলে গেছে। সংঘাত শুরুর আগে তা ছিল প্রায় ৩ ডলারের কাছাকাছি।
এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে পারে এবং ভোক্তাদের আস্থায় চাপ পড়ে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ফলে ফেডের জন্য তৈরি হয় কঠিন সমীকরণ। অর্থনীতি দুর্বল হলে সুদের হার কমানো দরকার হতে পারে। কিন্তু তেলের দাম ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি আরও চাপ তৈরি করছে
এই সংকটের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ফেডের কাজকে আরও কঠিন করে তুলছে।
আগের শুল্ক আরোপের জন্য ব্যবহৃত একটি অস্থায়ী আইনি কাঠামোর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও হোয়াইট হাউস নতুন ও বিস্তৃত বাণিজ্য বাধা তৈরি করেছে। কানাডা ও ব্রাজিলসহ কয়েকটি দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণাও এসেছে।
সমস্যা হলো, আগের শুল্কের পুরো প্রভাব এখনো ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো বাড়তি আমদানি ব্যয় সম্পূর্ণভাবে পণ্যের দামে যোগ করেনি। ফলে সামনে আরও মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ তেলের দাম বাড়ছে, শুল্কের প্রভাব বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতিও আবার মাথাচাড়া দিতে পারে। একই সময়ে শেয়ারবাজারে বড় পতন হলে ফেডকে একেবারে বিপরীতমুখী দুই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
সুদের হার বাড়ালে রাজনৈতিক ঝুঁকি
যদি মূল্যস্ফীতি আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে ফেডের সামনে সুদের হার বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। কিন্তু নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে সুদের হার বাড়ানো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ফেডের নীতির সমালোচনা করেছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ওয়ার্শ যদি সুদের হার বাড়ান, তাহলে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে।
এ কারণেই ওয়ার্শ হয়তো অন্য একটি পথ বেছে নিতে চাইছেন। তিনি মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রার প্রতি ফেডের প্রতিশ্রুতি বারবার জোর দিয়ে বলবেন, কিন্তু সরাসরি সুদের হার বাড়ানোর ঘোষণা দেবেন না। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়তে পারে। অর্থাৎ বাজার নিজেই ঋণের খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং ফেডকে সরাসরি সুদের হার বাড়াতে হবে না।
কিন্তু এখানেই বিপদ।
বন্ডের সুদের হার যদি অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থার কারণে বাড়ে, তাহলে সেটি এক ধরনের স্বাভাবিক বাজার সংকেত। কিন্তু যদি ফেডের নীতির প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার কারণে সুদের হার বাড়ে, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা বহন করবে।
নীরবতা কখন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য যোগাযোগ শুধু সংবাদ সম্মেলনের বিষয় নয়। বাজারে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ নীতি সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি করেন, সেটিও আর্থিক স্থিতিশীলতার অংশ।
স্বাভাবিক সময়ে ফেড যদি কিছুটা অস্পষ্ট থাকে, বাজার হয়তো সেই অনিশ্চয়তা সামলে নিতে পারে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে বিনিয়োগকারীরা জানতে চান—কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী করবে, কখন করবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তার অবস্থান বদলাবে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে বাজারের অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যেতে পারে। বন্ডের সুদের হার বাড়তে পারে, শেয়ারবাজারে বিক্রি বাড়তে পারে এবং ডলারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তখন ফেড যে অস্থিরতা কমাতে চায়, তার নীরবতাই উল্টো অস্থিরতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
আসল পরীক্ষা সংকটের দিনেই
“কিছুই ঘটবে না”—এই ধারণা অর্থনীতিতে কিছু সময়ের জন্য কার্যকর হতে পারে। যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শেয়ারবাজারে বড় ধস না নামে, তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়, নতুন শুল্ক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে না দেয় এবং ডলারের প্রতি আস্থা অটুট থাকে, তাহলে ওয়ার্শের নীরব কৌশল হয়তো সফলও হতে পারে।
কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের প্রকৃত দক্ষতার পরীক্ষা হয় তখনই, যখন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে।
আজকের বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শেয়ারবাজার, জ্বালানি, বাণিজ্যনীতি, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ এবং রাজনৈতিক চাপ—সবকিছু একসঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
ফলে ফেডের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন সুদের হার কত হবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—হঠাৎ করে যদি কয়েকটি ঝুঁকি একসঙ্গে বাস্তবে পরিণত হয়, তখন কেভিন ওয়ার্শ কতটা দ্রুত, স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন।
কারণ শান্ত সময়ে নীরব থাকা সহজ। কিন্তু ঝড়ের মধ্যে বাজারকে পথ দেখানোই একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকারের আসল পরীক্ষা।
কিছুই না ঘটার ওপর বাজি ধরা যায়। কিন্তু অর্থনীতির ইতিহাস বলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনাম তৈরি হয় ঠিক তখনই—যখন শেষ পর্যন্ত কিছু একটা ঘটে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















