০৯:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
চট্টগ্রামে আগুন নেভাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বিএনপির সাবেক নেতা নিহত ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্টে বড় পরিবর্তন, একসঙ্গে ১৫ দিনের স্লট রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত, ২০ আগস্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি পৃথিবীর বাইরে জীবনের খোঁজে নতুন আশার আলো, বায়ুমণ্ডলসহ সম্ভাবনাময় গ্রহের সন্ধান ইউক্রেনের যুদ্ধের মানবিক চিত্র বদলে দিচ্ছে মার্কিন ধর্মপ্রচারকদের মনোভাব পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী কিছুই ঘটবে না—এই বাজি কি ফেডের জন্য বিপজ্জনক? ৪৩ বছর বয়সেও ‘চিরকিশোর’ রাজনীতিক! জ্যাক পোলানস্কিকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক হরমুজ ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়তেই বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে বিনিয়োগের হিড়িক চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা

চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা

চাঁদে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন ইলন মাস্ক। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই স্বপ্নের একটি অদ্ভুত সংস্করণ যেন সত্যিই ঘটল—তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী নয়। ৫ আগস্ট স্পেসএক্সের একটি রকেটের ওপরের অংশ চাঁদের আইনস্টাইন গহ্বরের কাছে ঘণ্টায় প্রায় ৯ হাজার কিলোমিটার গতিতে আছড়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মহাকাশে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো ওই রকেটের অংশটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেখানে ভাসছিল।

ঘটনাটি ঘটে স্পেসএক্সের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশের ঠিক একদিন পর। আর সেই ফলাফল মহাকাশের চেয়ে পৃথিবীর ব্যবসা-বাণিজ্যেই বেশি আলোড়ন তুলেছে।

আয় বাড়ছে, কিন্তু খরচও ছুটছে আকাশের দিকে

স্পেসএক্সের আয় দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির আয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে শুধু রকেট উৎক্ষেপণ ও উপগ্রহভিত্তিক ব্যবসা নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবসাও বড় ভূমিকা রাখছে।

সমস্যা হলো, এত দ্রুত আয় বাড়লেও স্পেসএক্স এখনো লাভের মুখ দেখছে না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য বিপুল কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

শুধু দ্বিতীয় প্রান্তিকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এই অঙ্ক ওই সময়ে স্পেসএক্সের মোট আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। সামনে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এখানেই বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।

বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন—এত টাকা কোথায় যাবে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বিপুল অর্থ ঢালছে, তখন স্পেসএক্সও সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন প্রশ্ন তুলছেন—অতিরিক্ত বিনিয়োগ কি ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত আয় এনে দিতে পারবে?

এই প্রশ্ন শুধু স্পেসএক্সের জন্য নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।

এর প্রভাব পড়েছে স্পেসএক্সের বাজারমূল্যে। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি কমে গিয়েছিল। আর্থিক ফল প্রকাশের পর সেটি আরও নেমেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও একটি চাপ। তালিকাভুক্তির পর প্রাথমিক বিনিয়োগকারী, কর্মকর্তা ও কর্মীদের শেয়ার বিক্রির ওপর যে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ছিল, সেটি ৬ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা ছিল। ফলে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বাজারে আসতে পারে—এমন আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মাস্কের বড় প্রতিশ্রুতি, বড় লক্ষ্য

এই পরিস্থিতিতে ইলন মাস্ক বিনিয়োগকারীদের সামনে আরও বড় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।

মাস্কের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর স্পেসএক্সের তথ্যকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা প্রায় দুই গিগাওয়াট হতে পারে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সেই সক্ষমতা পাঁচ গিগাওয়াটের চেয়ে ১০ গিগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

আরও বড় দাবি এসেছে আয় নিয়ে। মাস্কের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে স্পেসএক্সের আয় এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো। অর্থাৎ চলতি বছরের সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় তা হবে ২০ গুণেরও বেশি।

শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, স্পেসএক্সের উপগ্রহভিত্তিক স্টারলিংক ব্যবসা নিয়েও মাস্কের বড় প্রত্যাশা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি গ্রাহক আকর্ষণ করছে।

এক বক্তব্যে চিপ কোম্পানির লাভ, অন্যদের ক্ষতি

মাস্কের বক্তব্যের প্রভাব যে কত দ্রুত শেয়ারবাজারে ছড়িয়ে পড়ে, তার উদাহরণও দেখা গেছে।

তিনি জানিয়েছেন, স্পেসএক্সের তথ্যকেন্দ্রগুলো উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে এনভিডিয়ার প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে। এর পরদিন এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম বেড়ে যায়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে দেখা যায় বিপরীত চিত্র।

স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট গুয়েন শটওয়েল জানিয়েছেন, আগামী বছর উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত নতুন মোবাইল উপগ্রহ এবং ইকোস্টার থেকে পাওয়া বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে স্পেসএক্স টেলিযোগাযোগ বাজারের বেশ কিছু গ্রাহক নিজেদের দিকে টানতে পারে।

এই বক্তব্যের পর এটিঅ্যান্ডটি, ভেরাইজন ও টি-মোবাইলের মতো বড় মার্কিন টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ওপর চাপ পড়ে।

অর্থাৎ মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণ করা একটি প্রতিষ্ঠান এখন পৃথিবীর চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেলিযোগাযোগ খাতের শেয়ারবাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

Musk Slammed After SpaceX Rocket To Hit Moon At 5k MPH - Comic Sands

টেসলাকে ঘিরে নতুন জল্পনা

ইলন মাস্কের আরেক বড় প্রতিষ্ঠান টেসলা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্পেসএক্স ও বৈদ্যুতিক গাড়ি ও রোবট নির্মাতা টেসলার মধ্যে ভবিষ্যতে একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও আর্থিক আলোচনায় টেসলা খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি।

তবে মাস্কের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় টেসলার মানবসদৃশ রোবটের একটি মহাকাশভিত্তিক ভূমিকার ইঙ্গিত রয়েছে।

তিনি এমন এক ভবিষ্যতের কথা বলেছেন, যেখানে চাঁদের মাটিতে রোবট কারখানা পরিচালনা করবে। সেখানে সৌর প্যানেল ও স্পেসএক্সের উপগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি হতে পারে।

শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো হলেও মাস্কের পরিকল্পনার পরিধি এখন পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

২০২৮ সালেই চাঁদে মানুষের পা?

স্পেসএক্সের পরিকল্পনা শুধু রোবট পাঠানোতে সীমাবদ্ধ নয়। গুয়েন শটওয়েল জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যেই চাঁদের মাটিতে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

এটি সফল হলে স্পেসএক্সের জন্য সেটি হবে এক ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু সেই অর্জনের পথে অর্থ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জ।

একদিকে প্রতিষ্ঠানটি মহাকাশযাত্রা, উপগ্রহ যোগাযোগ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো—তিনটি বিশাল খাতে একসঙ্গে বিস্তার ঘটাতে চাইছে। অন্যদিকে সেই বিস্তারের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিপুল বিনিয়োগ।

মহাকাশের স্বপ্ন বনাম বিনিয়োগকারীদের বাস্তবতা

ইলন মাস্কের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাঁর ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতা। তিনি এমন সব লক্ষ্য সামনে আনেন, যা একসময় অসম্ভব বলে মনে হলেও পরে প্রযুক্তিগত বাস্তবতার অংশ হয়ে যায়।

কিন্তু বিনিয়োগকারীদের কাছে শুধু স্বপ্ন যথেষ্ট নয়। তাদের জানতে হয়—সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কত টাকা লাগবে, কত সময় লাগবে এবং শেষ পর্যন্ত কতটা আয় হবে।

স্পেসএক্স এখন ঠিক সেই পরীক্ষার মুখোমুখি।

চাঁদের দিকে ছুটে যাওয়া রকেটের টুকরো হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে মাস্কের মহাকাশ স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু পৃথিবীতে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন আরও কঠিন—স্পেসএক্স কি মহাকাশের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল ব্যয় সামলে লাভজনক সাম্রাজ্যে পরিণত হতে পারবে?

মাস্কের পরিকল্পনা যদি সফল হয়, তাহলে স্পেসএক্স শুধু একটি রকেট কোম্পানি থাকবে না; বরং মহাকাশ, উপগ্রহ যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা এক বিশাল প্রযুক্তি সাম্রাজ্যে পরিণত হতে পারে।

কিন্তু সেই ভবিষ্যতের পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন প্রযুক্তি নয়—বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন।

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে আগুন নেভাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বিএনপির সাবেক নেতা নিহত

চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা

০৭:৪২:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

চাঁদে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন ইলন মাস্ক। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই স্বপ্নের একটি অদ্ভুত সংস্করণ যেন সত্যিই ঘটল—তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী নয়। ৫ আগস্ট স্পেসএক্সের একটি রকেটের ওপরের অংশ চাঁদের আইনস্টাইন গহ্বরের কাছে ঘণ্টায় প্রায় ৯ হাজার কিলোমিটার গতিতে আছড়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মহাকাশে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো ওই রকেটের অংশটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেখানে ভাসছিল।

ঘটনাটি ঘটে স্পেসএক্সের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশের ঠিক একদিন পর। আর সেই ফলাফল মহাকাশের চেয়ে পৃথিবীর ব্যবসা-বাণিজ্যেই বেশি আলোড়ন তুলেছে।

আয় বাড়ছে, কিন্তু খরচও ছুটছে আকাশের দিকে

স্পেসএক্সের আয় দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির আয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে শুধু রকেট উৎক্ষেপণ ও উপগ্রহভিত্তিক ব্যবসা নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবসাও বড় ভূমিকা রাখছে।

সমস্যা হলো, এত দ্রুত আয় বাড়লেও স্পেসএক্স এখনো লাভের মুখ দেখছে না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য বিপুল কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

শুধু দ্বিতীয় প্রান্তিকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এই অঙ্ক ওই সময়ে স্পেসএক্সের মোট আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। সামনে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এখানেই বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।

বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন—এত টাকা কোথায় যাবে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বিপুল অর্থ ঢালছে, তখন স্পেসএক্সও সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন প্রশ্ন তুলছেন—অতিরিক্ত বিনিয়োগ কি ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত আয় এনে দিতে পারবে?

এই প্রশ্ন শুধু স্পেসএক্সের জন্য নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।

এর প্রভাব পড়েছে স্পেসএক্সের বাজারমূল্যে। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি কমে গিয়েছিল। আর্থিক ফল প্রকাশের পর সেটি আরও নেমেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও একটি চাপ। তালিকাভুক্তির পর প্রাথমিক বিনিয়োগকারী, কর্মকর্তা ও কর্মীদের শেয়ার বিক্রির ওপর যে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ছিল, সেটি ৬ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা ছিল। ফলে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বাজারে আসতে পারে—এমন আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মাস্কের বড় প্রতিশ্রুতি, বড় লক্ষ্য

এই পরিস্থিতিতে ইলন মাস্ক বিনিয়োগকারীদের সামনে আরও বড় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।

মাস্কের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর স্পেসএক্সের তথ্যকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা প্রায় দুই গিগাওয়াট হতে পারে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সেই সক্ষমতা পাঁচ গিগাওয়াটের চেয়ে ১০ গিগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

আরও বড় দাবি এসেছে আয় নিয়ে। মাস্কের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে স্পেসএক্সের আয় এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো। অর্থাৎ চলতি বছরের সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় তা হবে ২০ গুণেরও বেশি।

শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, স্পেসএক্সের উপগ্রহভিত্তিক স্টারলিংক ব্যবসা নিয়েও মাস্কের বড় প্রত্যাশা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি গ্রাহক আকর্ষণ করছে।

এক বক্তব্যে চিপ কোম্পানির লাভ, অন্যদের ক্ষতি

মাস্কের বক্তব্যের প্রভাব যে কত দ্রুত শেয়ারবাজারে ছড়িয়ে পড়ে, তার উদাহরণও দেখা গেছে।

তিনি জানিয়েছেন, স্পেসএক্সের তথ্যকেন্দ্রগুলো উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে এনভিডিয়ার প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে। এর পরদিন এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম বেড়ে যায়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে দেখা যায় বিপরীত চিত্র।

স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট গুয়েন শটওয়েল জানিয়েছেন, আগামী বছর উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত নতুন মোবাইল উপগ্রহ এবং ইকোস্টার থেকে পাওয়া বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে স্পেসএক্স টেলিযোগাযোগ বাজারের বেশ কিছু গ্রাহক নিজেদের দিকে টানতে পারে।

এই বক্তব্যের পর এটিঅ্যান্ডটি, ভেরাইজন ও টি-মোবাইলের মতো বড় মার্কিন টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ওপর চাপ পড়ে।

অর্থাৎ মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণ করা একটি প্রতিষ্ঠান এখন পৃথিবীর চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেলিযোগাযোগ খাতের শেয়ারবাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

Musk Slammed After SpaceX Rocket To Hit Moon At 5k MPH - Comic Sands

টেসলাকে ঘিরে নতুন জল্পনা

ইলন মাস্কের আরেক বড় প্রতিষ্ঠান টেসলা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্পেসএক্স ও বৈদ্যুতিক গাড়ি ও রোবট নির্মাতা টেসলার মধ্যে ভবিষ্যতে একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও আর্থিক আলোচনায় টেসলা খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি।

তবে মাস্কের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় টেসলার মানবসদৃশ রোবটের একটি মহাকাশভিত্তিক ভূমিকার ইঙ্গিত রয়েছে।

তিনি এমন এক ভবিষ্যতের কথা বলেছেন, যেখানে চাঁদের মাটিতে রোবট কারখানা পরিচালনা করবে। সেখানে সৌর প্যানেল ও স্পেসএক্সের উপগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি হতে পারে।

শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো হলেও মাস্কের পরিকল্পনার পরিধি এখন পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

২০২৮ সালেই চাঁদে মানুষের পা?

স্পেসএক্সের পরিকল্পনা শুধু রোবট পাঠানোতে সীমাবদ্ধ নয়। গুয়েন শটওয়েল জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যেই চাঁদের মাটিতে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

এটি সফল হলে স্পেসএক্সের জন্য সেটি হবে এক ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু সেই অর্জনের পথে অর্থ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জ।

একদিকে প্রতিষ্ঠানটি মহাকাশযাত্রা, উপগ্রহ যোগাযোগ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো—তিনটি বিশাল খাতে একসঙ্গে বিস্তার ঘটাতে চাইছে। অন্যদিকে সেই বিস্তারের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিপুল বিনিয়োগ।

মহাকাশের স্বপ্ন বনাম বিনিয়োগকারীদের বাস্তবতা

ইলন মাস্কের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাঁর ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতা। তিনি এমন সব লক্ষ্য সামনে আনেন, যা একসময় অসম্ভব বলে মনে হলেও পরে প্রযুক্তিগত বাস্তবতার অংশ হয়ে যায়।

কিন্তু বিনিয়োগকারীদের কাছে শুধু স্বপ্ন যথেষ্ট নয়। তাদের জানতে হয়—সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কত টাকা লাগবে, কত সময় লাগবে এবং শেষ পর্যন্ত কতটা আয় হবে।

স্পেসএক্স এখন ঠিক সেই পরীক্ষার মুখোমুখি।

চাঁদের দিকে ছুটে যাওয়া রকেটের টুকরো হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে মাস্কের মহাকাশ স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু পৃথিবীতে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন আরও কঠিন—স্পেসএক্স কি মহাকাশের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল ব্যয় সামলে লাভজনক সাম্রাজ্যে পরিণত হতে পারবে?

মাস্কের পরিকল্পনা যদি সফল হয়, তাহলে স্পেসএক্স শুধু একটি রকেট কোম্পানি থাকবে না; বরং মহাকাশ, উপগ্রহ যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা এক বিশাল প্রযুক্তি সাম্রাজ্যে পরিণত হতে পারে।

কিন্তু সেই ভবিষ্যতের পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন প্রযুক্তি নয়—বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন।