মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নতুন অন্তর্বর্তী চুক্তিকে সমর্থকেরা ঐতিহাসিক ‘মহাসমঝোতা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে ইসরায়েল, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র এবং লেবাননের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে এটি এমন এক সমঝোতা, যা ইরানকে আরও নিরাপদ, বৈধ ও প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফার একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তিন মাসের সংঘাতের পর এই চুক্তি যুদ্ধবিরতির পথ খুলে দেয়। জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়, যা অনেকের কাছে যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন আন্তর্জাতিক বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চুক্তির মূল বিষয়
চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে। এর আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই সময়ের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতার জন্য আলোচনা চলবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।
লেবাননের বিশ্লেষক সারকিস নাউমের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের জন্য এটি এমন এক চুক্তি, যেখান থেকে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুব কম। তার ভাষায়, ইরান দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক চাপ আর সহ্য করতে পারছে না, অন্যদিকে ট্রাম্পও নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন।
ইসরায়েলের দৃষ্টিতে বড় ধাক্কা
ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এই চুক্তিকে কৌশলগত বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন। তার মতে, যে প্রচেষ্টা ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল বা উৎখাত করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত উল্টো ইরানকেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পথে নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, চুক্তিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর ওপর কোনো নতুন নিয়ন্ত্রণ নেই। একই সঙ্গে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখাও অনুপস্থিত। ফলে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধান দাবিগুলোর কোনোটি পূরণ হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইরাননীতি এবং ওয়াশিংটনের ওপর তার প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করেছে।
ইরানের কৌশলগত সুবিধা
চুক্তি কার্যকর থাকলে ইরান যুদ্ধের অবসান, ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, তেল রপ্তানি পুনরুজ্জীবন এবং পুনর্গঠনের জন্য সম্ভাব্য অর্থায়নের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে দেশটির বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাও কার্যত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
অন্যদিকে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যে লক্ষ্যগুলো ছিল—ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে দুর্বল করা, পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমানো—তার অনেকগুলোই বাস্তবায়িত হয়নি বলে সমালোচকেরা মনে করছেন।
লেবাননে নতুন সমীকরণ
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে লেবাননে। সমঝোতার ফলে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে লেবাননকে বৃহত্তর মার্কিন-ইরান আলোচনার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।
যদিও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সম্প্রতি বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বা দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো বিষয়ে ইরান লেবাননের পক্ষ হয়ে আলোচনা করতে পারে না। তবে হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, এই নতুন কূটনৈতিক প্রক্রিয়া লেবাননের অবস্থানকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের হামলা তাদের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন নতুন চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর আস্থা কমতে পারে এবং ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার মতে, বহু বছরের চাপ প্রয়োগের নীতি ব্যর্থ হওয়ার পর এই চুক্তি সবচেয়ে কম ক্ষতিকর বিকল্প। সামরিক উপায়ে ইরানকে পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি, আর বৃহত্তর যুদ্ধ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারত।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন চুক্তির বাস্তবায়ন, পারমাণবিক আলোচনা এবং আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য: মার্কিন-ইরান চুক্তির পর ইরানের অবস্থান শক্তিশালী হলেও উদ্বেগে রয়েছে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো।
#মার্কিনইরানচুক্তি #ইরান #যুক্তরাষ্ট্র #মধ্যপ্রাচ্য #ইসরায়েল #হিজবুল্লাহ #লেবানন #ট্রাম্প #পেজেশকিয়ান #আন্তর্জাতিকরাজনীতি
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















