ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে আবারও তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। তবে লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি বিমান হামলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা জাগলেও যুদ্ধ পুরোপুরি থেমেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, সমঝোতা কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে। এই চুক্তিতে প্রণালিটি অবিলম্বে খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চুক্তিতে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। পূর্বঘোষিত সময়ের দুই দিন আগেই এটি কার্যকর হয়। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সমঝোতাটি নিশ্চিত করা হবে।
উত্তেজনা কমতেই তেলের দাম কমেছে
চুক্তির খবর বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আরও ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারের নিচে নেমে আসে, যা ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর সর্বনিম্ন পর্যায়।
তবে শিপিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক পর্যায়ে জাহাজ চলাচল ফিরতে সময় লাগবে। নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য মাইন অপসারণ এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
লেবানন প্রশ্নে নতুন টানাপোড়েন
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লেবাননের যুদ্ধের “স্থায়ী সমাপ্তি” এবং দেশটির “সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা” নিশ্চিত করার আহ্বান। যদিও ইসরায়েল সরাসরি আলোচনায় অংশ নেয়নি, তবু লেবানন ইস্যুটি চুক্তির কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
মার্চ মাসে ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান শুরু করে এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহর হামলার জবাব এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ অভিযান।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানের সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তু করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পুরো ভবন ধ্বংস করা হচ্ছে।
তবে ইসরায়েল জানিয়ে দিয়েছে, ট্রাম্পের আলোচনার ফল যাই হোক, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে না। বৃহস্পতিবার দেশটি দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার একটি নতুন মানচিত্রও প্রকাশ করেছে।
চলছে হামলা, বাড়ছে উদ্বেগ
লেবাননের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দক্ষিণাঞ্চলের কফারতেবনিত ও জেবদিন শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। রাজধানী বৈরুত ও তার দক্ষিণ উপশহরের আকাশে ইসরায়েলি ড্রোনও দেখা গেছে।
দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ শহর থেকে বাস্তুচ্যুত মোহাম্মদ দোগমান বলেন, “ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু লেবাননে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। আমরা জানতে চাই, যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ, নাকি আবার শুরু হবে?”
দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় কিছু বাসিন্দা ফিরতে শুরু করলেও অনেকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়িঘর দেখে হতাশ।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে নতুন চাপ
রয়টার্সকে ইসরায়েলের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লেবাননে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এসব আলোচনাকে “কঠিন ও অনমনীয়” বলে বর্ণনা করেছেন।
ভ্যান্স বলেছেন, চুক্তির লক্ষ্যগুলোর একটি হলো দক্ষিণ লেবাননে দেশটির নির্বাচিত সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে হিজবুল্লাহর প্রভাব কমে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগও হ্রাস পায়।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর সময় যেসব লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, আঞ্চলিক প্রভাব কমানো এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা—চূড়ান্ত সমঝোতিতে সেসবের কোনোটিই নিশ্চিতভাবে অর্জিত হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী চুক্তির সুযোগ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি খুললেও লেবাননে চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
#ইরান #যুক্তরাষ্ট্র #হরমুজ_প্রণালি #লেবানন #ইসরায়েল #মধ্যপ্রাচ্য #তেলবাজার #ডোনাল্ড_ট্রাম্প #জেডি_ভ্যান্স #বিশ্বরাজনীতি #সারাক্ষণ_রিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















