ঢাকার শিশু হাসপাতালে ৭ এপ্রিল মেঝেতে বসে কাঁদছিলেন কনিকা আক্তার। পাশে দাঁড়িয়ে স্বামী মোহাম্মদ জাকির, মুখে গভীর শোকের ছাপ। হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে শুয়ে থাকা ছয় মাস বয়সী মেয়ে রুহির দিকে তাকিয়ে তিনি বলছিলেন, কীভাবে এমন এক সন্তানকে মাটিতে শুইয়ে দেবেন, যে দেখতে একেবারে তার মতো? এর কিছুক্ষণ আগেই একই রোগে মারা গেছে যমজ বোন রিসা। পরে রুহিকেও নেওয়া হয় সেই একই নিবিড় পরিচর্যা শয্যায়, যেখানে তার বোন শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছিল।
এই এক পরিবারের ট্র্যাজেডিই এখন পুরো দেশের বাস্তবতা। দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে আড়াই শতাধিক মানুষের, যাদের বেশিরভাগই শিশু। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও বিছানা নেই, অনেক শিশুকে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
টিকাদান ভেঙে পড়ার প্রভাব

বিশ্বজুড়ে হাম আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে টিকাদান ব্যবস্থার ভাঙনের কারণে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ফলে দেশে টিকার ঘাটতি তৈরি হয় এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদান হার দ্রুত কমে যায়।
বাংলাদেশে সাধারণত ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয় এবং চার বছর পরপর দেশব্যাপী ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে আওতায় আনার লক্ষ্য থাকে। বহু বছর ধরে এই টিকা সরবরাহে সহায়তা করে আসছিল ইউনিসেফ, যার অর্থায়নে বড় ভূমিকা ছিল আন্তর্জাতিক অংশীদারদের।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন করে উন্মুক্ত দরপত্রে নেওয়া হয়। এতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয় এবং সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নির্ধারিত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিও বাতিল করতে হয়। ২০২৫ সালের মার্চ নাগাদ মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হাম টিকার আওতায় আসে।
রোগের বিস্তার ও ঝুঁকি
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন রোহিঙ্গা শিবির থেকে এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বর্তমানে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে এর প্রভাব পড়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১ হাজারের বেশি রোগী।

শিশুদের অপুষ্টি পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির এবং ১০ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে, অথচ ২০২৪ সালের পর থেকে কয়েকটি জাতীয় ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনও বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এপ্রিল মাসে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং মাসজুড়ে তা দেশব্যাপী বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ভিটামিন এ বিতরণ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে টিকাদান বাড়ানো না গেলে দ্রুত এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। কেউ কেউ পরিস্থিতিকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার আহ্বানও জানিয়েছেন, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

রাজনৈতিক চাপ ও জনমনে উদ্বেগ
এই সংকটকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। টিকা সংগ্রহে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন পক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগের পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল, তবু এই পরিবর্তনের মানবিক মূল্য যে কত ভয়াবহ হয়েছে, তা তারা স্বীকার করছেন।
একজন সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেছেন, প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শিশুদের মৃত্যু হৃদয়বিদারক। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং গভীর মানবিক বিপর্যয়, যার বোঝা বইতে হচ্ছে অসংখ্য পরিবারকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















