বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবস্থার একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক আবারও আলোচনায় এসেছে। সমুদ্রের গভীরে বিছিয়ে রাখা সাবমেরিন কেবল—যার ওপর নির্ভর করে প্রায় পুরো পৃথিবীর ইন্টারনেট যোগাযোগ—তা এখন নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে। সাম্প্রতিক এক ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
রুশ সাবমেরিন নিয়ে নজরদারি
এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাজ্য সরকার জানায়, উত্তর আটলান্টিকে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলের কেবলের কাছাকাছি একটি গোপন রুশ নৌ-অভিযান তারা শনাক্ত করেছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনটি রুশ সাবমেরিনকে অনুসরণ করে। এর মধ্যে একটি আক্রমণাত্মক সাবমেরিন এবং দুটি বিশেষ গভীর সমুদ্রযান ছিল।
প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবলগুলোর কোনো ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি। তবে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের চেষ্টা হলে গুরুতর পরিণতি হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এই ঘটনাই বিশ্বব্যাপী এক বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—কেন এখনও ইন্টারনেটের মূল ভরসা সমুদ্রতলের কেবল?
কেন স্যাটেলাইট নয়, কেবলই ভরসা
অনেকেই ভাবেন ইন্টারনেট মানেই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান। বাস্তবে তা নয়। বিশ্বের প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ ইন্টারনেট ডেটা সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে চলাচল করে।
এর মূল কারণ গতি, খরচ এবং সক্ষমতা। কেবলগুলো সরাসরি মহাদেশগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করে, ফলে সময়ক্ষেপণ কম হয়। ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তিতে আলোর তরঙ্গের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পাঠানো যায়। আধুনিক কেবল প্রতি সেকেন্ডে শত শত টেরাবিট ডেটা বহন করতে পারে।
অন্যদিকে স্যাটেলাইটে তথ্য পাঠাতে হলে সংকেতকে হাজার হাজার মাইল দূরে কক্ষপথে যেতে হয়, যা স্বাভাবিকভাবেই বেশি সময় নেয়। ফলে গতি কমে এবং ক্ষমতা সীমিত থাকে।

প্রযুক্তি দৌড়ে কেবলই এগিয়ে
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নতুন সাবমেরিন কেবল প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। কারণ আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড কম্পিউটিং বা সামরিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই দ্রুততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও নতুন প্রজন্মের নিম্ন-কক্ষপথ স্যাটেলাইট ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তবুও তা এখনও সমুদ্রতলের কেবলের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে
সমুদ্রতলের কেবলগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সেগুলো পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষা দেওয়া কঠিন। বেশিরভাগ সময় ক্ষতি হয় মাছ ধরার জাল, জাহাজের নোঙর বা প্রাকৃতিক কারণে। তবে এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে সামরিক যোগাযোগ পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই কেবলগুলোর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। ফলে এগুলোকে ‘নরম দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ নির্ভরতা
স্যাটেলাইট এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকা, দুর্যোগ পরিস্থিতি বা সমুদ্র ও আকাশপথে চলাচলের ক্ষেত্রে। কিন্তু আগামী অনেক বছর পর্যন্ত বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার মূল ভরসা হিসেবে সমুদ্রতলের কেবলই থাকবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো লুকিয়ে আছে সমুদ্রের তলায়—আর সেটিই এখন ক্রমেই বাড়তি নজর কাড়ছে।
সমুদ্রতলের কেবল ঘিরে বৈশ্বিক ইন্টারনেট নিরাপত্তা নতুন করে আলোচনায়, রুশ সাবমেরিন ঘটনার পর উদ্বেগ বেড়েছে
সমুদ্রতলের কেবল নির্ভর ইন্টারনেট
বিশ্ব ইন্টারনেটের বড় অংশ সমুদ্রতলের কেবলে নির্ভরশীল—নিরাপত্তা ঝুঁকি কতটা, জানুন বিস্তারিত
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















