যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, এই যুদ্ধের প্রতি বিরোধিতা এখন এমন মাত্রায় পৌঁছেছে, যা ২০০৬ সালে ইরাক যুদ্ধের চরম সময় কিংবা ১৯৭০-এর দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার জনমতের সঙ্গে তুলনীয়।
জরিপ অনুযায়ী, ৬১ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। মাত্র প্রতি ১০ জনের কম মানুষ মনে করেন এই অভিযান সফল হয়েছে। প্রায় ৪০ শতাংশ বলছেন এটি ব্যর্থ হয়েছে, আর সমসংখ্যক মানুষ মনে করেন এখনই ফলাফল মূল্যায়নের সময় আসেনি।
তবে রিপাবলিকানদের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন এখনো বেশ শক্তিশালী। প্রায় ৭৯ শতাংশ রিপাবলিকান এটিকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। রিপাবলিকানমুখী স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে মতামত বিভক্ত।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তিনি বলেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাবনা পুরোপুরি ত্যাগ না করে, তাহলে কোনো চুক্তি হবে না। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না এবং যুদ্ধবিরতি ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ পুনরায় চালু করাকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এপ্রিলের শুরুতে আলোচনার একটি দফা ভেঙে যাওয়ার পর আপাতত সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন ট্রাম্প। যদিও তিনি যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন, তবু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে আসছে।
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে তিনি স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় থাকলেও ইরান প্রসঙ্গে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল।
যুদ্ধ নিয়ে সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও আমেরিকানদের মধ্যে ইরান সম্পর্কে অনাস্থা রয়ে গেছে। প্রায় ৪৮ শতাংশ মানুষ এখনই একটি শান্তি চুক্তি করতে চান, যদিও তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কম সুবিধাজনক হয়। অন্যদিকে ৪৬ শতাংশ চান, আরও ভালো চুক্তির জন্য চাপ বাড়ানো হোক, এমনকি প্রয়োজনে সামরিক অভিযান আবার শুরু করা হোক।
ডেমোক্র্যাটদের বড় অংশ শান্তি চুক্তির পক্ষে, যেখানে রিপাবলিকানদের অধিকাংশ শক্ত অবস্থান নেওয়ার পক্ষে। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে শান্তি চুক্তির প্রতি ঝোঁক কিছুটা বেশি।
ট্রাম্পের এক বিতর্কিত মন্তব্য—যেখানে তিনি সতর্ক করেছিলেন, চুক্তি না হলে পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে—সেটিও ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ এ ধরনের বক্তব্যকে নেতিবাচক হিসেবে দেখেছেন।
এই যুদ্ধের সঙ্গে ইরাক ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের তুলনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঐ যুদ্ধগুলো শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, এবং তখনও জনমত বিভক্ত ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই মাসের মধ্যেই বিরোধিতা এতটা বেড়ে যাওয়া নজরকাড়া।
এখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের ফলে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, যা অতীতের বড় যুদ্ধগুলোর তুলনায় অনেক কম। তবুও জনমতের নেতিবাচকতা বেশি হওয়া বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন না যে কোনো চুক্তি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে পারবে।
এই যুদ্ধ ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। মাত্র ২২ শতাংশ মনে করেন, তার পদক্ষেপ নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে মিল আছে, যেখানে ৪৬ শতাংশ এটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলছেন।
অভ্যন্তরীণভাবেও উদ্বেগ বাড়ছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুত কমে যাওয়া নিয়ে তিনি চিন্তিত।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট। ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এই সামরিক পদক্ষেপ মন্দার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কম গাড়ি চালাচ্ছেন এবং খরচ কমাচ্ছেন। অনেকেই ভ্রমণ পরিকল্পনাও বদলে ফেলেছেন।
আগামী এক বছরে জ্বালানির দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অর্ধেক আমেরিকান। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়ার কথা বলছেন এমন মানুষের হারও বেড়েছে।
একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ৬১ শতাংশ মনে করেন, এই যুদ্ধের ফলে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বেড়েছে। এছাড়া ৫৬ শতাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে।
জরিপটি ২৪ থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে ২,৫৬০ জন প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানের ওপর পরিচালিত হয়। এর ত্রুটির সীমা প্রায় দুই শতাংশ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















