ইউক্রেনের সীমান্ত শহর ভভচানস্কের ধ্বংসস্তূপে পড়ে ছিলেন এক সৈনিক। চারপাশে যুদ্ধ, ড্রোনের গুঞ্জন, ভাঙা দেয়াল আর মৃত্যু। সেই নরকসম পরিস্থিতিতে ১৭৭ দিন আটকে থেকেও বেঁচে ছিলেন তিনি—শুধু স্ত্রীর কণ্ঠ শুনে বেঁচে থাকার শক্তি পেয়েছিলেন বলে।
রোমান মঙ্গোল্ড, বয়স ৩৮। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে এক ধরনের ‘কিল জোন’-এ আটকে ছিলেন। সেখানে যেকোনো নড়াচড়া মানেই মৃত্যু। রাস্তাঘাট ধ্বংস, চারদিকে মাইন, আকাশে শত্রু ড্রোন—পালানোর কোনো পথ ছিল না।
যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই
ভভচানস্ক শহরটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র লড়াইয়ের কেন্দ্র। ধ্বংস হয়ে যাওয়া কারখানা, ভাঙা ভবন আর পরিত্যক্ত ঘরেই চলছিল যুদ্ধ। সৈন্যরা লড়ছিল কক্ষ থেকে কক্ষে, দেয়ালের আড়াল থেকে।
রোমান ও তাঁর সহযোদ্ধারা বেঁচে থাকতেন আকাশ থেকে ফেলা সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। ড্রোনে করে খাবার, পানি, ওষুধ, এমনকি পরিবারের পাঠানো বার্তাও পৌঁছাত। কিন্তু সেই সরবরাহ সংগ্রহ করাও ছিল জীবন বাজি রেখে করা কাজ।
একটি এমন অভিযানে রোমানের সহযোদ্ধা আন্দ্রিই গুলিবিদ্ধ হন। হাঁটতে অক্ষম হয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসা না পাওয়ায় ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থা খারাপ হতে থাকে।
স্ত্রীর কণ্ঠই ছিল আশ্রয়
প্রতিদিনের ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে রোমানের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল স্ত্রীর কণ্ঠ। প্রতি সপ্তাহে তাঁর স্ত্রী হালিনা একটি ভয়েস মেসেজ পাঠাতেন, যা কমান্ডার রেডিওতে বাজিয়ে শোনাতেন। সেই কণ্ঠই রোমানকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রাখত।
তিনি নিজেও পাল্টা বার্তা পাঠাতেন, যদিও সত্যিকারের ভয়াবহতা তিনি কখনো প্রকাশ করতেন না। স্ত্রী বুঝতেন, তবু সেই কথাগুলোই বারবার শুনে সান্ত্বনা খুঁজতেন।

সহযোদ্ধার মৃত্যু ও নিঃসঙ্গতা
আন্দ্রিইর অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। রোমান তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন, ক্ষত পরিষ্কার করেন, ওষুধ দেন, সান্ত্বনা দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগস্টের দিকে তাঁর কোলে মাথা রেখেই মারা যান আন্দ্রিই।
সেই মুহূর্ত রোমানের জন্য ছিল ভেঙে পড়ার মতো। তবু যুদ্ধ থেমে থাকেনি। তাঁকে আবার অবস্থান ধরে রাখতে হয়েছে, আবার লড়াই করতে হয়েছে।
১৭৭ দিন পর মুক্তি
অবশেষে একদিন নির্দেশ আসে—তিনি ফিরে যেতে পারবেন। ১৭৭ দিন পর ভোরবেলা তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। শত্রু ড্রোন এড়িয়ে, গুলি আর মর্টারের মধ্যে দিয়ে, নদী পার হয়ে তিনি ফিরে আসেন নিজের ঘাঁটিতে।
সেই দৌড় ছিল জীবন-মৃত্যুর মাঝখানের শেষ লড়াই।
বাড়ি ফেরা, কিন্তু যুদ্ধ শেষ নয়
নভেম্বরের দিকে তিনি বাড়ি ফেরেন। পরিবারকে জড়িয়ে ধরেন, দীর্ঘদিন পর স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ পান। তবে যুদ্ধের স্মৃতি তাঁকে ছাড়েনি।
শারীরিক ক্ষত কিছুটা সেরে উঠলেও মানসিক দাগ এখনো রয়ে গেছে। বন্ধুদের মৃত্যু, সহযোদ্ধাকে বাঁচাতে না পারার যন্ত্রণা তাঁকে তাড়া করে।
তবু তিনি জানেন, যুদ্ধ এখনো চলছে। আবারও তাঁকে ফিরতে হবে ফ্রন্টলাইনে। কারণ তাঁর মতো অনেকেই এখনো সেই ‘কিল জোন’-এ আটকে আছে।
এই গল্প শুধু একজন সৈনিকের বেঁচে ফেরার নয়, বরং যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা আর মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছার প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















