দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হিজবুল্লাহ এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। সংগঠনটি এখনও টিকে আছে, তাদের সংসদ সদস্য আছে এবং দক্ষিণ লেবাননে সশস্ত্র উপস্থিতিও বজায় রয়েছে। কিন্তু টিকে থাকা আর আগের মতো শক্তিশালী থাকা—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষ এবং ধারাবাহিক হামলায় সংগঠনটির নেতৃত্ব ও সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
অজেয়তার দাবি প্রশ্নের মুখে
হিজবুল্লাহর নেতারা দাবি করছেন তারা যুদ্ধ হারেনি। তবে বাস্তবতা বলছে, সংগঠনটির বহু শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন এবং সামরিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যে অজেয়তার ভাবমূর্তি এতদিন তারা ধরে রেখেছিল, তা এখন আর বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক চাপের কারণে নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও এতে বড় ভূমিকা রাখছে।

লেবাননের রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ
লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ও স্বাধীন অবস্থান নিচ্ছে। রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউন এবং প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার পথে এগোচ্ছেন। হিজবুল্লাহ এই প্রক্রিয়ায় সন্তুষ্ট না হলেও তাদের থামানোর মতো ক্ষমতা এখন আর আগের মতো নেই। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের বাইরে থেকেও শক্তি প্রয়োগ করে আসা সংগঠনটির প্রভাব এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।
সংঘাত, যুদ্ধবিরতি ও বাস্তবতা
হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকৃত কোনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি। তাদের দাবি, ইসরায়েল এখনও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। যুদ্ধবিরতির পরও বহু মানুষ নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেনি, যা পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা বজায় রয়েছে, যেখানে পাল্টাপাল্টি হামলা থামেনি।
নিরস্ত্রীকরণে কঠিন শর্ত

হিজবুল্লাহ তাত্ত্বিকভাবে নিরস্ত্রীকরণের সম্ভাবনা পুরোপুরি অস্বীকার করছে না। তবে তারা এমন কিছু শর্ত দিয়েছে—যেমন লেবাননের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বন্দিদের মুক্তি, পুনর্গঠন সম্পন্ন করা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণ—যা বাস্তবে পূরণ করা খুবই কঠিন। ফলে এই প্রক্রিয়া দ্রুত এগোনোর সম্ভাবনা কম।
ভয় ও চাপের রাজনীতি
সংগঠনটি এখনও ভয় দেখানোর ক্ষমতা রাখে। অতীতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কঠোরপন্থী নেতার বক্তব্যে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হুমকির ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। যদিও হিজবুল্লাহ নেতারা এসব বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক মন্তব্য’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, তবুও এতে লেবাননের রাজনৈতিক পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে হিজবুল্লাহ
সব মিলিয়ে হিজবুল্লাহ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ, অন্যদিকে আঞ্চলিক সমীকরণের পরিবর্তন—এই দুইয়ের মধ্যে তাদের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারিত হবে। অতীতের শক্তির ওপর ভর করে টিকে থাকা সম্ভব হলেও, আগের মতো প্রভাব বজায় রাখা যে আর সহজ নয়, তা এখন স্পষ্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















