০৫:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬
কলকাতাজুড়ে মিশ্র জনমত, গণনার দিনে এগিয়ে বিজেপি—তবু এলাকায় এলাকায় ভিন্ন চিত্র ইরানের হুশিয়ারি, হরমুজ প্রণালীতে কোন বিদেশী বাহিনী এলেই হামলা চালানো হবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে উৎপাদনে ধস, এপ্রিলেই সংকোচনে শিল্পখাত আল কাদসিয়ার ধাক্কায় থামল আল নাসরের জয়ের ধারা, শিরোপা দৌড়ে অনিশ্চয়তা রোনালদোর দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের জন্য এক দ্বীপ: সেন্ট হেলেনা আবিষ্কার পাঁচ রাজ্যের ভোটে নাটকীয় পালাবদল: বাংলায় বিজেপির ঝড়, তামিলনাড়ুতে বিজয়ের চমক, কেরালায় কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তন টোকিওর লক্ষ্য: এআইকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ শক্তিতে বিশ্বনেতা হওয়ার দৌড় ১০০ কেন্দ্রে ভোট গণনা বন্ধের অভিযোগ, কর্মীদের কেন্দ্রে থাকার আহ্বান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসছে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ গ্রামীণ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্তদের অবস্থান কর্মসূচী: পেনশন পুনঃস্থাপনসহ ভাতার দাবিতে ঢাকায় সমাবেশ

আসছে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ

সরকার শেষ পর্যন্ত আর কথা রাখতে পারল না। দুই দলের ভোট হলেও জনগনের ভোটেই বিজয়ী হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকার। ফলে শুরুতে ইরান যুদ্ধের চাপ সত্ত্বেও সরকার কথা দিয়েছিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কথা আর রাখতে পারল না নবনির্বাচিত সরকার। কিন্তু এমন এক সময়ে এসে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় জ্বালানি তেলের এই মুল্যবৃদ্ধির যে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা সরকার সামাল দেবে কিভাবে? কারণ ২০২২ সালে এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম ৪৫ থেকে ৫১ শতাংশ বৃদ্ধির রেশ এখনও কাটেনি। ওই ধাক্কায় দেশের গড় মুল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ থেকে বাড়তে বাড়তে প্রায় ১০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। সেই উচ্চ মুল্যস্ফীতির ধারা এখনও চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওই মুল্যস্ফীতি কিছু কমলেও তা ৯ শতাংশের ঘরেই অবস্থান করছে। এই অবস্থায় নতুন করে আবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পণ্য পরিবহন, কৃষি এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। এতে জনজীবনে আরও দুর্ভোগ নেমে আসবে।

বৈশ্বিক বাজার বনাম দেশীয় মূল্য বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারিত হয় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের ওপর ভিত্তি করে। ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের আন্তর্জাতিক বাজারে কখন কেমন দাম তার ওপর বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর জ্বালানির দাম কত হতে পারে তার একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে কোনও কোনও দেশের নিজস্ব শুল্ক হার, তেল বিক্রির কমিশন এবং তেল পরিবহন ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ জ্বালানির বাজারের দামকে প্রভাবিত করে। এর আগের দফায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ ডলার। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের শুরুতেই তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলারে দাঁড়ায়। মার্চে দাম আরও বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১৩৯ ডলারে ঠেকে। তবে বছরের মাঝামাঝি সময়ে আবার তেলের দাম কমে ১১০ ডলারে দাঁড়ায় এবং একেবারে বছরের শেষে আবার দাম ৮৫ ডলারে নেমে আসে। কিন্তু ওই বছরের আগস্টে সরকার তেলের দাম অতিমাত্রায় বৃদ্ধি করে। ওই সময়ে ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে ৪২ ভাগ বাড়িয়ে করা হয় ১১৪ টাকা। অকটেনের দাম ৫১ ভাগ বাড়িয়ে ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা একই হারে অর্থাৎ ৫১ ভাগ বাড়িয়ে পেট্রোলের দাম ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়। এই মুল্যবৃদ্ধির পেছনে তৎকালীন সরকারের যুক্তি ছিল বিপিসির লোকসান কমানো এবং প্রতিবেশী দেশে তেল পাচার রোধ করা। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর দীর্ঘদিনের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধ্য হয় বাংলাদেশে। ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। এতে দেশের বাজারে তেলের দাম খানিকটা কমে যায়। বিপিসি লোকসানের কবল থেকে বের হয়ে আসে। এমনকি বিপুল পরিমাণ মুনাফাও করে। এরপর থেকে অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজাওে জ্বালানি তেলের দাম কমতেই থাকে। ২০২৪ সালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ২০২৫ সালেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ থেকে ৮৫ ডলারের মধ্যেই ছিল। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২০ ডলারে উঠে যায়। তবে তা খুব সীমিত সময়ের জন্যে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড ৯০ ডলারে পাওয়া যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে কিছু কিছু দেশের জাহাজ চলাচল করছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চলছে।

শর্ত মানলেই মিলবে ঋণ, না হয় সরে দাঁড়াবে আইএমএফ

পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনাও হচ্ছে। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেই দেশে ১৯ এপ্রিল থেকে তেলের নতুন বর্ধিত দাম কার্যকর হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা লিটার করা হয়েছে। জ্বালানি তেলের পাশাপাশি একই মাসে দ্বিতীয় দফায় বাড়ানো হয়েছে রান্নার গ্যাস এলপিজির দাম। নতুন সিদ্ধান্তে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আগে ছিল ১ হাজার ৭২৮ টাকা। বর্তমানে আলোচনার টেবিলে রয়েছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও। পিডিবি’র উৎপাদন খরচ ও আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল গঠিত কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ দিলেই বিদ্যুতের দামও বাড়তে পারে। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ‘চেইন ইফেক্ট’ হিসাবে এর ওপর নির্ভরশীল সব সেবা ও পন্যের দাম বাড়ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার জনগণের প্রতি সুবিচার করেনি। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে তারা জনগণের দিক দেখবে। সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিল কোনও পণ্যের দাম বাড়াবে না, ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম নিম্নমুখী, তখন দেশে দাম বাড়ানো হলো। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের প্রতি জনআস্থার সংকট তৈরি হবে। সেইসঙ্গে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। কেন এই দাম বৃদ্ধি এখন প্রশ্ন হলো, দাম না বাড়ানোর কথা দেয়ার পরও কেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। প্রশ্ন টি এর কারণে আরও সঙ্গত যে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখনও যদি আন্তর্জাতিক বাজারে একই থাকে তাহলে কেন তেলের দাম বাড়ানো হলো। সরকার অবশ্য বলছে যে, লোকসান কমানোর জন্যই এই দাম বৃদ্ধি। তাহলে দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার আগে সরকারের মন্ত্রীদের মাথায় বিষয়টি ছিল না। অবশ্যই ছিল। সরকার ভেবেছিল, সরকার সবেমাত্র ক্ষমতায় এসেছে, এই অবস্থায় দাম বাড়ালে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই কথা দিয়েছিল দাম বাড়বে না। কিন্তু আমরা দেখছি যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অংশগ্রহণ শেষে ১৮ এপ্রিল রাতে দেশে ফেরেন অর্থমন্ত্রী।

আরও ওই রাতেই ঘোষণা করা হয় জ্বালানি তেলের নতুন দাম। যা পরদিন ১৯ এপ্রিল থেকেই কার্যকর করা হয়। ফলে আইএমএফের ঋণের জন্য যে জ্বালানি তেলের এই দাম বাড়ানো হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও অর্থমন্ত্রী বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আইএমএফ কি চাচ্ছে সেটা আমরা পর্যালোচনা করছি। আমাদেরও চাওয়া পাওয়া রয়েছে, আমরা একটি নির্বাচিত সরকার। কেউ কিছু চাইলেই আমরা সেটা মানব সেরকম না। বর্তমান সরকার জনগণের, ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এরকম কোন সিদ্ধান্ত নেবে না।’ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আইএমএফের শর্ত মেনে করা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সারা দুনিয়ায় তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আমরাই শুধু বাড়ায়নি। সবাই বলেছে আপনারা কেন তেলের দাম বাড়াচ্ছেন না। শ্রীলঙ্কায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালে তহবিলের ওপরে এত প্রেসার আসছে, সামনে বাজেট আসছে, এটা আসলে সামলানো সহজ না। সেজন্য যতটুকু না বাড়ালে নয় ততটাই বাড়ানো হয়েছে। এর সাথে আইএমএফের কোন সম্পর্ক নেই।’ এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের সম্পর্ক না থাকলে এতোদিন বাড়ানো হলো না কেন? তীব্র সংকটকে কেন্দ্র করে দেশ জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে এমন একটি আশংকা তৈরিও হয়েছিল। কিন্তু তখনও সরকার তেলের দাম বাড়াবে না তা মন্ত্রিরা জানিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে এই মুল্যবৃদ্ধির পেছনে যে আইএমএফের প্রেসক্রিপশন কাজ করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্লেষকরাও বলছেন, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানির দাম সমন্বয় করেছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আসছিল। তবে সরকারের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে পড়েছিল। তাই এই মুল্যবৃদ্ধি। তবে এতে সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন করে চাপ তৈরি হবে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সানেম’ – এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মতে, “জ্বালানির দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কমে, এটি সত্য। কিন্তু একইসঙ্গে এটি পুরো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে। পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর এর বোঝা পড়ে। এটি একটি দীর্ঘ চেইন ইফেক্ট তৈরি করে, যা নিয়ন্ত্রণ না করলে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে।’’ বর্তমানে আইএমএফের একটি বড় ঋণ কিস্তি ঝুলে আছে। সংস্থাটি বারবার জানিয়েছে, কাঠামোগত সংস্কার, বিশেষ করে ভর্তুকি প্রত্যাহার দ্রুত না হলে ঋণ ছাড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম সমন্বয়কে অর্থনীতিবিদরা ‘সংস্কারের সূচনা’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে আইএমএফকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সরকার ধীরে ধীরে হলেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “এই মুহূর্তে আইএমএফের একটা বড় ঋণের কিস্তি বকেয়া আছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার করছে না, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি প্রত্যাহারের বিষয়ে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিক্রেতা ও ভোক্তার মানসিকতা পরিবর্তন  অপরিহার্য'

সেই দিকেই হয়তো এখন একটি ধাপে ধাপে অগ্রগতি শুরু হলো। অতিরিক্ত ভর্তূকি দেওয়া সরকারের পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণও প্রত্যাশিতভাবে হচ্ছে না। তাই জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের খুব বেশি বিকল্প ছিল না।” বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের ঋণ শুধু অর্থের যোগান নয়, বরং একটি ‘নীতিগত আস্থার সনদ’ হিসেবেও বিবেচিত। তাছাড়া, আইএমএফের ঋণের কিস্তি আটকে থাকলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বৈদেশিক লেনদেন, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা রক্ষায় ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি চলমান রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উন্নয়ন সহযোগী অন্যান্য সংস্থাও সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে আইএমএফের মূল্যায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাজার ও জনজীবনে প্রভাব জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। সর্বশেষ লিটারপ্রতি বেড়েছে ভোজ্য তেলের দাম। ইতোমধ্যে বাস ও ট্রাক ভাড়া বাড়ে গেছে। কৃষি খাতে সেচ এবং শিল্প খাতে কাঁচামাল পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়ে গেছে, ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি খাদ্যপণ্যের দামে। সামনে চাল, ডালসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ জ্বালানির মুল্য বৃদ্ধির এই অতিরিক্ত খরচের চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার কাঁধেই চাপছে। রাজধানীতে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংয়ে যাতায়াত এখন অনেকের জন্যই ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরপরই বেড়েছে ভাড়া, কমেছে দরকষাকষির সুযোগ। স্বল্প দূরত্বে মোটরসাইকেল ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শুধু রাইড মোটরসাইকেলই নয়, সিএনজি এবং অটোরিকসা ভাড়াও বেড়ে গেছে। ফলে নগরবাসীর জন্য বাড়তি খরচের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই ২০০ টাকা বেড়েছে বরিশালের লঞ্চ ভাড়া। লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা যাত্রীদের ভাড়া ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ২৩ এপ্রিল থেকে সরকার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বিভিন্ন রুটে গড়ে প্রায় ৪.৫ শতাংশ থেকে ৫.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন গণপরিবহননির্ভর মানুষ। পরিবহন ব্যয় বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কাঁচাবাজারে। সবজি, মাছ, মাংস— প্রায় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বেশিরভাগ সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে উঠে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোজ্যতেলের সংকট। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলা তেলের দাম ২০০ থেকে ২২০ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে রান্নাঘরের খরচ হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে গেছে। একজন ক্রেতার ভাষায়, আগে যেখানে ৫০০ টাকায় একদিনের বাজার করা যেত, এখন সেখানে ৭০০-৮০০ টাকা ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অর্থ শুধু পাম্পে বেশি টাকা দেওয়া নয়; এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে মানুষের প্রতিদিনের জীবনে। অফিসে যাতায়াত, শিশুদের স্কুলে পাঠানো, বাজার করা, খাদ্য, পরিবহন, শিক্ষা ও বাসাভাড়ার খরচ বাড়ায় বাস্তব আয় কমে যাবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। গ্রামাঞ্চলেও কৃষিপণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মে মাসের জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। তাদের আয় একই থাকলেও ব্যয় দ্রুত বাড়বে। অনেক পরিবার এখন বাধ্য হয়ে খাদ্য তালিকা পরিবর্তন করছে। মাছ-মাংস কমিয়ে দিচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তিন বেলার খাবারও সীমিত করতে হচ্ছে। বাসাভাড়া, যাতায়াত ও খাদ্য ব্যয়ের সম্মিলিত চাপ তাদের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। মূলত গত তিন বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির চাপে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। একটি ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আসছে আরেকটি। মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের বোঝা এতটাই ভারী হয়েছে যে, জীবনযাত্রার মান ধরে রাখাই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি কতটা সংকটজনক তার একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে পরিসংখ্যান থেকেও। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদে মতে, বেসরকারি হিসাবে এই মুল্যস্ফীতি আরও বেশি, প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি। মানুষের আয় কাগজে-কলমে কিছুটা বাড়লেও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেই চলেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আয় না বাড়লেও প্রতিনিয়ত ব্যয় বাড়ায় কষ্টের চাপ দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর নীতি সহায়তা ছাড়া এই চাপ থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না, এটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। পরিবহন খাত থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা ভোগ্যপণ্য, সবখানেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কিছুটা কমলেও তার বহুগুণ সামাজিক মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, রপ্তানি ও আমদানি হ্রাস পেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শিল্প খাতেও হবে বহুমাত্রিক। প্রথমত, পণ্য পরিবহন খরচ বাড়বে।

তার সঙ্গে বাড়বে উৎপাদন খরচও। এ ছাড়া শিল্পের প্রশাসনিক খরচও অনেক বেড়ে যাবে। দেশের বেশির ভাগ শিল্পে কমবেশি ডিজেল ব্যবহার হয়। বিদ্যুত সংকটের কারণে এমনিতেই এখন শিল্পে ডিজেলের ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ডিজেলের ব্যবহার বাড়ায় আগের চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে এ খাতে। নতুন করে এখন যুক্ত হয়েছে ডিজেলের বাড়তি দাম। পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে শেষ বিচারে তার চাপ ভোক্তার ওপর গিয়েই পড়বে। যেভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে, সেই ধাক্কা অর্থনীতি নিতে পারবে কি না, এ নিয়ে শঙ্কায় আছি। এমনিতে ডলার–সংকটের কারণে একধরনের চাপের মধ্যে ছিলাম। এখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শিল্পের ক্ষেত্রে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বেশি দামে পণ্য উৎপাদন করে বেশি দামে বেচতে পারব তো? এই মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু একটি জ্বালানি সমন্বয় হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা, বরং তারা এটিকে পুরো অর্থনীতিতে ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরির সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছেন। তারা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, এই ধাক্কা সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদে অন্তত তিন মাসের জন্য একটি জরুরি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়া জরুরি। খাদ্য সহায়তা ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা না করলে দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হলেও সামাজিক খরচ অনেক বেশি। কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়লে তার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ওপর পড়ে। তারা মনে করেন, জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজার তদারকি, পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার একদিকে হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় করতে পারছে, কিন্তু এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবনে তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ। উৎপাদন, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এর প্রভাব পড়ছে।

অর্থাৎ অর্থনীতির হিসাব বলছে, সরকার কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পেলেও সামাজিক বাস্তবতায় বাড়ছে মানুষের কষ্ট। আর এই ভারসাম্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ। প্রথমে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, তারপর বাড়বে উৎপাদন খরচ এবং শেষে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাবে, অর্থাৎ হাতে টাকা থাকলেও সেই টাকায় আগের মতো পণ্য কেনা যাবে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ দিশাহারা। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এই দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই দ্রব্যমূল্যের ওপর এই তেলের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে এর সামাজিক প্রভাব সামাল দিতে কার্যকর নীতি সহায়তা জরুরি। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, জ্বালানি এমন একটি খাত যার সঙ্গে অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্র জড়িত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়বে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন এই দাম সমন্বয় মূলত ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ এবং সরকারের সীমিত নীতিগত বিকল্পেরই প্রতিফলন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দেবে। একইসঙ্গে পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয়ের বোঝা বাড়িয়ে দেবে। জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকবে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অত্যন্ত সতর্ক ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন হবে।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

জনপ্রিয় সংবাদ

কলকাতাজুড়ে মিশ্র জনমত, গণনার দিনে এগিয়ে বিজেপি—তবু এলাকায় এলাকায় ভিন্ন চিত্র

আসছে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ

০৩:৩৯:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

সরকার শেষ পর্যন্ত আর কথা রাখতে পারল না। দুই দলের ভোট হলেও জনগনের ভোটেই বিজয়ী হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকার। ফলে শুরুতে ইরান যুদ্ধের চাপ সত্ত্বেও সরকার কথা দিয়েছিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কথা আর রাখতে পারল না নবনির্বাচিত সরকার। কিন্তু এমন এক সময়ে এসে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় জ্বালানি তেলের এই মুল্যবৃদ্ধির যে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা সরকার সামাল দেবে কিভাবে? কারণ ২০২২ সালে এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম ৪৫ থেকে ৫১ শতাংশ বৃদ্ধির রেশ এখনও কাটেনি। ওই ধাক্কায় দেশের গড় মুল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ থেকে বাড়তে বাড়তে প্রায় ১০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। সেই উচ্চ মুল্যস্ফীতির ধারা এখনও চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওই মুল্যস্ফীতি কিছু কমলেও তা ৯ শতাংশের ঘরেই অবস্থান করছে। এই অবস্থায় নতুন করে আবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পণ্য পরিবহন, কৃষি এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। এতে জনজীবনে আরও দুর্ভোগ নেমে আসবে।

বৈশ্বিক বাজার বনাম দেশীয় মূল্য বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারিত হয় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের ওপর ভিত্তি করে। ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের আন্তর্জাতিক বাজারে কখন কেমন দাম তার ওপর বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর জ্বালানির দাম কত হতে পারে তার একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে কোনও কোনও দেশের নিজস্ব শুল্ক হার, তেল বিক্রির কমিশন এবং তেল পরিবহন ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ জ্বালানির বাজারের দামকে প্রভাবিত করে। এর আগের দফায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ ডলার। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের শুরুতেই তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলারে দাঁড়ায়। মার্চে দাম আরও বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১৩৯ ডলারে ঠেকে। তবে বছরের মাঝামাঝি সময়ে আবার তেলের দাম কমে ১১০ ডলারে দাঁড়ায় এবং একেবারে বছরের শেষে আবার দাম ৮৫ ডলারে নেমে আসে। কিন্তু ওই বছরের আগস্টে সরকার তেলের দাম অতিমাত্রায় বৃদ্ধি করে। ওই সময়ে ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে ৪২ ভাগ বাড়িয়ে করা হয় ১১৪ টাকা। অকটেনের দাম ৫১ ভাগ বাড়িয়ে ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা একই হারে অর্থাৎ ৫১ ভাগ বাড়িয়ে পেট্রোলের দাম ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়। এই মুল্যবৃদ্ধির পেছনে তৎকালীন সরকারের যুক্তি ছিল বিপিসির লোকসান কমানো এবং প্রতিবেশী দেশে তেল পাচার রোধ করা। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর দীর্ঘদিনের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধ্য হয় বাংলাদেশে। ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। এতে দেশের বাজারে তেলের দাম খানিকটা কমে যায়। বিপিসি লোকসানের কবল থেকে বের হয়ে আসে। এমনকি বিপুল পরিমাণ মুনাফাও করে। এরপর থেকে অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজাওে জ্বালানি তেলের দাম কমতেই থাকে। ২০২৪ সালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ২০২৫ সালেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ থেকে ৮৫ ডলারের মধ্যেই ছিল। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২০ ডলারে উঠে যায়। তবে তা খুব সীমিত সময়ের জন্যে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড ৯০ ডলারে পাওয়া যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে কিছু কিছু দেশের জাহাজ চলাচল করছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চলছে।

শর্ত মানলেই মিলবে ঋণ, না হয় সরে দাঁড়াবে আইএমএফ

পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনাও হচ্ছে। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেই দেশে ১৯ এপ্রিল থেকে তেলের নতুন বর্ধিত দাম কার্যকর হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা লিটার করা হয়েছে। জ্বালানি তেলের পাশাপাশি একই মাসে দ্বিতীয় দফায় বাড়ানো হয়েছে রান্নার গ্যাস এলপিজির দাম। নতুন সিদ্ধান্তে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আগে ছিল ১ হাজার ৭২৮ টাকা। বর্তমানে আলোচনার টেবিলে রয়েছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও। পিডিবি’র উৎপাদন খরচ ও আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল গঠিত কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ দিলেই বিদ্যুতের দামও বাড়তে পারে। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ‘চেইন ইফেক্ট’ হিসাবে এর ওপর নির্ভরশীল সব সেবা ও পন্যের দাম বাড়ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার জনগণের প্রতি সুবিচার করেনি। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে তারা জনগণের দিক দেখবে। সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিল কোনও পণ্যের দাম বাড়াবে না, ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম নিম্নমুখী, তখন দেশে দাম বাড়ানো হলো। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের প্রতি জনআস্থার সংকট তৈরি হবে। সেইসঙ্গে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। কেন এই দাম বৃদ্ধি এখন প্রশ্ন হলো, দাম না বাড়ানোর কথা দেয়ার পরও কেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। প্রশ্ন টি এর কারণে আরও সঙ্গত যে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখনও যদি আন্তর্জাতিক বাজারে একই থাকে তাহলে কেন তেলের দাম বাড়ানো হলো। সরকার অবশ্য বলছে যে, লোকসান কমানোর জন্যই এই দাম বৃদ্ধি। তাহলে দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার আগে সরকারের মন্ত্রীদের মাথায় বিষয়টি ছিল না। অবশ্যই ছিল। সরকার ভেবেছিল, সরকার সবেমাত্র ক্ষমতায় এসেছে, এই অবস্থায় দাম বাড়ালে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই কথা দিয়েছিল দাম বাড়বে না। কিন্তু আমরা দেখছি যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অংশগ্রহণ শেষে ১৮ এপ্রিল রাতে দেশে ফেরেন অর্থমন্ত্রী।

আরও ওই রাতেই ঘোষণা করা হয় জ্বালানি তেলের নতুন দাম। যা পরদিন ১৯ এপ্রিল থেকেই কার্যকর করা হয়। ফলে আইএমএফের ঋণের জন্য যে জ্বালানি তেলের এই দাম বাড়ানো হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও অর্থমন্ত্রী বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আইএমএফ কি চাচ্ছে সেটা আমরা পর্যালোচনা করছি। আমাদেরও চাওয়া পাওয়া রয়েছে, আমরা একটি নির্বাচিত সরকার। কেউ কিছু চাইলেই আমরা সেটা মানব সেরকম না। বর্তমান সরকার জনগণের, ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এরকম কোন সিদ্ধান্ত নেবে না।’ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আইএমএফের শর্ত মেনে করা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সারা দুনিয়ায় তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আমরাই শুধু বাড়ায়নি। সবাই বলেছে আপনারা কেন তেলের দাম বাড়াচ্ছেন না। শ্রীলঙ্কায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালে তহবিলের ওপরে এত প্রেসার আসছে, সামনে বাজেট আসছে, এটা আসলে সামলানো সহজ না। সেজন্য যতটুকু না বাড়ালে নয় ততটাই বাড়ানো হয়েছে। এর সাথে আইএমএফের কোন সম্পর্ক নেই।’ এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের সম্পর্ক না থাকলে এতোদিন বাড়ানো হলো না কেন? তীব্র সংকটকে কেন্দ্র করে দেশ জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে এমন একটি আশংকা তৈরিও হয়েছিল। কিন্তু তখনও সরকার তেলের দাম বাড়াবে না তা মন্ত্রিরা জানিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে এই মুল্যবৃদ্ধির পেছনে যে আইএমএফের প্রেসক্রিপশন কাজ করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্লেষকরাও বলছেন, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানির দাম সমন্বয় করেছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আসছিল। তবে সরকারের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে পড়েছিল। তাই এই মুল্যবৃদ্ধি। তবে এতে সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন করে চাপ তৈরি হবে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সানেম’ – এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মতে, “জ্বালানির দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কমে, এটি সত্য। কিন্তু একইসঙ্গে এটি পুরো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে। পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর এর বোঝা পড়ে। এটি একটি দীর্ঘ চেইন ইফেক্ট তৈরি করে, যা নিয়ন্ত্রণ না করলে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে।’’ বর্তমানে আইএমএফের একটি বড় ঋণ কিস্তি ঝুলে আছে। সংস্থাটি বারবার জানিয়েছে, কাঠামোগত সংস্কার, বিশেষ করে ভর্তুকি প্রত্যাহার দ্রুত না হলে ঋণ ছাড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম সমন্বয়কে অর্থনীতিবিদরা ‘সংস্কারের সূচনা’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে আইএমএফকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সরকার ধীরে ধীরে হলেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “এই মুহূর্তে আইএমএফের একটা বড় ঋণের কিস্তি বকেয়া আছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার করছে না, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি প্রত্যাহারের বিষয়ে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিক্রেতা ও ভোক্তার মানসিকতা পরিবর্তন  অপরিহার্য'

সেই দিকেই হয়তো এখন একটি ধাপে ধাপে অগ্রগতি শুরু হলো। অতিরিক্ত ভর্তূকি দেওয়া সরকারের পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণও প্রত্যাশিতভাবে হচ্ছে না। তাই জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের খুব বেশি বিকল্প ছিল না।” বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের ঋণ শুধু অর্থের যোগান নয়, বরং একটি ‘নীতিগত আস্থার সনদ’ হিসেবেও বিবেচিত। তাছাড়া, আইএমএফের ঋণের কিস্তি আটকে থাকলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বৈদেশিক লেনদেন, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা রক্ষায় ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি চলমান রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উন্নয়ন সহযোগী অন্যান্য সংস্থাও সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে আইএমএফের মূল্যায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাজার ও জনজীবনে প্রভাব জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। সর্বশেষ লিটারপ্রতি বেড়েছে ভোজ্য তেলের দাম। ইতোমধ্যে বাস ও ট্রাক ভাড়া বাড়ে গেছে। কৃষি খাতে সেচ এবং শিল্প খাতে কাঁচামাল পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়ে গেছে, ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি খাদ্যপণ্যের দামে। সামনে চাল, ডালসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ জ্বালানির মুল্য বৃদ্ধির এই অতিরিক্ত খরচের চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার কাঁধেই চাপছে। রাজধানীতে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংয়ে যাতায়াত এখন অনেকের জন্যই ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরপরই বেড়েছে ভাড়া, কমেছে দরকষাকষির সুযোগ। স্বল্প দূরত্বে মোটরসাইকেল ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শুধু রাইড মোটরসাইকেলই নয়, সিএনজি এবং অটোরিকসা ভাড়াও বেড়ে গেছে। ফলে নগরবাসীর জন্য বাড়তি খরচের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই ২০০ টাকা বেড়েছে বরিশালের লঞ্চ ভাড়া। লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা যাত্রীদের ভাড়া ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ২৩ এপ্রিল থেকে সরকার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বিভিন্ন রুটে গড়ে প্রায় ৪.৫ শতাংশ থেকে ৫.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন গণপরিবহননির্ভর মানুষ। পরিবহন ব্যয় বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কাঁচাবাজারে। সবজি, মাছ, মাংস— প্রায় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বেশিরভাগ সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে উঠে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোজ্যতেলের সংকট। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলা তেলের দাম ২০০ থেকে ২২০ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে রান্নাঘরের খরচ হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে গেছে। একজন ক্রেতার ভাষায়, আগে যেখানে ৫০০ টাকায় একদিনের বাজার করা যেত, এখন সেখানে ৭০০-৮০০ টাকা ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অর্থ শুধু পাম্পে বেশি টাকা দেওয়া নয়; এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে মানুষের প্রতিদিনের জীবনে। অফিসে যাতায়াত, শিশুদের স্কুলে পাঠানো, বাজার করা, খাদ্য, পরিবহন, শিক্ষা ও বাসাভাড়ার খরচ বাড়ায় বাস্তব আয় কমে যাবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। গ্রামাঞ্চলেও কৃষিপণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মে মাসের জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। তাদের আয় একই থাকলেও ব্যয় দ্রুত বাড়বে। অনেক পরিবার এখন বাধ্য হয়ে খাদ্য তালিকা পরিবর্তন করছে। মাছ-মাংস কমিয়ে দিচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তিন বেলার খাবারও সীমিত করতে হচ্ছে। বাসাভাড়া, যাতায়াত ও খাদ্য ব্যয়ের সম্মিলিত চাপ তাদের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। মূলত গত তিন বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির চাপে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। একটি ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আসছে আরেকটি। মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের বোঝা এতটাই ভারী হয়েছে যে, জীবনযাত্রার মান ধরে রাখাই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি কতটা সংকটজনক তার একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে পরিসংখ্যান থেকেও। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদে মতে, বেসরকারি হিসাবে এই মুল্যস্ফীতি আরও বেশি, প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি। মানুষের আয় কাগজে-কলমে কিছুটা বাড়লেও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেই চলেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আয় না বাড়লেও প্রতিনিয়ত ব্যয় বাড়ায় কষ্টের চাপ দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর নীতি সহায়তা ছাড়া এই চাপ থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না, এটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। পরিবহন খাত থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা ভোগ্যপণ্য, সবখানেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কিছুটা কমলেও তার বহুগুণ সামাজিক মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, রপ্তানি ও আমদানি হ্রাস পেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শিল্প খাতেও হবে বহুমাত্রিক। প্রথমত, পণ্য পরিবহন খরচ বাড়বে।

তার সঙ্গে বাড়বে উৎপাদন খরচও। এ ছাড়া শিল্পের প্রশাসনিক খরচও অনেক বেড়ে যাবে। দেশের বেশির ভাগ শিল্পে কমবেশি ডিজেল ব্যবহার হয়। বিদ্যুত সংকটের কারণে এমনিতেই এখন শিল্পে ডিজেলের ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ডিজেলের ব্যবহার বাড়ায় আগের চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে এ খাতে। নতুন করে এখন যুক্ত হয়েছে ডিজেলের বাড়তি দাম। পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে শেষ বিচারে তার চাপ ভোক্তার ওপর গিয়েই পড়বে। যেভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে, সেই ধাক্কা অর্থনীতি নিতে পারবে কি না, এ নিয়ে শঙ্কায় আছি। এমনিতে ডলার–সংকটের কারণে একধরনের চাপের মধ্যে ছিলাম। এখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শিল্পের ক্ষেত্রে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বেশি দামে পণ্য উৎপাদন করে বেশি দামে বেচতে পারব তো? এই মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু একটি জ্বালানি সমন্বয় হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা, বরং তারা এটিকে পুরো অর্থনীতিতে ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরির সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছেন। তারা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, এই ধাক্কা সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদে অন্তত তিন মাসের জন্য একটি জরুরি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়া জরুরি। খাদ্য সহায়তা ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা না করলে দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হলেও সামাজিক খরচ অনেক বেশি। কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়লে তার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ওপর পড়ে। তারা মনে করেন, জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজার তদারকি, পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার একদিকে হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় করতে পারছে, কিন্তু এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবনে তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ। উৎপাদন, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এর প্রভাব পড়ছে।

অর্থাৎ অর্থনীতির হিসাব বলছে, সরকার কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পেলেও সামাজিক বাস্তবতায় বাড়ছে মানুষের কষ্ট। আর এই ভারসাম্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ। প্রথমে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, তারপর বাড়বে উৎপাদন খরচ এবং শেষে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাবে, অর্থাৎ হাতে টাকা থাকলেও সেই টাকায় আগের মতো পণ্য কেনা যাবে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ দিশাহারা। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এই দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই দ্রব্যমূল্যের ওপর এই তেলের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে এর সামাজিক প্রভাব সামাল দিতে কার্যকর নীতি সহায়তা জরুরি। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, জ্বালানি এমন একটি খাত যার সঙ্গে অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্র জড়িত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়বে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন এই দাম সমন্বয় মূলত ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ এবং সরকারের সীমিত নীতিগত বিকল্পেরই প্রতিফলন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দেবে। একইসঙ্গে পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয়ের বোঝা বাড়িয়ে দেবে। জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকবে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অত্যন্ত সতর্ক ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন হবে।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক