টেকনাফ উপকূল থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়া রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি যাত্রীবোঝাই একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার পর আন্দামান সাগরে ভাসমান ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে বাংলাদেশি জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইড। সমুদ্রের মাঝখানে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের মধ্যে থাকা এই মানুষদের উদ্ধারে কয়েক ঘণ্টার টানা অভিযান চালাতে হয় জাহাজটির ক্রুদের।
উদ্ধার অভিযান কীভাবে শুরু
৯ এপ্রিল দুপুরে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজটি আন্দামান সাগরে প্রবেশ করার কিছুক্ষণ পরই ডেক থেকে এক ক্রুর চোখে পড়ে পানিতে ভাসমান একজন মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং শুরু হয় অনুসন্ধান। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে শুরু হওয়া এই অভিযান চলে টানা তিন থেকে চার ঘণ্টা। বাইনোকুলার দিয়ে খুঁজে খুঁজে প্রায় তিন নটিক্যাল মাইল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের শনাক্ত করা হয়।
দুপুর ১টার দিকে অভিযান শেষ করে মোট ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে আটজন পুরুষ ও একজন নারী ছিলেন।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অবস্থা
উদ্ধারের সময় তাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। দীর্ঘ সময় লোনা পানিতে ভেসে থাকার কারণে শরীর ঝলসে গিয়েছিল, অনেকেই প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় ছিলেন। কারও শরীরে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। জাহাজে তোলার পর তাদের নতুন কাপড় দেওয়া হয়, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে খাবার সরবরাহ করা হয়। প্রথমে পানি ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়, পরে শরীর কিছুটা স্বাভাবিক হলে ভারী খাবার দেওয়া হয়। তারা এতটাই ক্লান্ত ছিল যে কয়েক ঘণ্টা অচেতন ঘুমে ছিল।
ডুবির পেছনের কারণ
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ এপ্রিল রাতে টেকনাফ উপকূল থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে নৌকাটি যাত্রা করে। ৭ বা ৮ এপ্রিল ভোরের দিকে এটি ডুবে যায়। কোনো ঝড় নয়, বরং অতিরিক্ত যাত্রী, ভেতরের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ এবং যাত্রীদের সঙ্গে মাঝিদের ধাক্কাধাক্কির কারণেই নৌকাটি উল্টে যায় বলে ধারণা করা হয়। একপর্যায়ে সবাই একদিকে চলে গেলে নৌকাটি কাত হয়ে ডুবে যায়।
সমুদ্রে টিকে থাকার লড়াই
উদ্ধারস্থলটি ছিল সেন্ট মার্টিন উপকূল থেকে প্রায় ৪০০ নটিক্যাল মাইল দূরে। কাছাকাছি আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ থাকলেও সেখানে পৌঁছানো তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। প্রবল স্রোতের মধ্যে তারা কেউ ড্রাম, কেউ কাঠের টুকরা বা জালের ফ্লোট আঁকড়ে ভেসে ছিল। তারা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে নিজেরা জাহাজের কাছে আসার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিল। এজন্য জাহাজ থেকে বয়া ছুড়ে তাদের উদ্ধার করতে হয়।

উদ্ধারের চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী সমুদ্রে বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে এটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি, সময়সূচি বিঘ্নিত হওয়া এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে বিলম্বের মতো সমস্যার মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতার আশঙ্কায় কিছু জাহাজ এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে যায় বলেও জানা গেছে।
উদ্ধারের পর পরবর্তী পদক্ষেপ
উদ্ধারের পর তাদের কোথায় নামানো হবে, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অবৈধ অভিবাসনের কারণে কোনো দেশের বন্দর তাদের গ্রহণে অনীহা দেখাতে পারে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত হয়, তাদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ১১ এপ্রিল মধ্যরাতে কোস্টগার্ডের জাহাজে তাদের তুলে দেওয়া হয়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা উভয়ই ছিলেন। তাদের নাম-পরিচয়সহ প্রাথমিক তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















