একজন বৃদ্ধ মানুষ বিকেলের হাঁটায় বের হলেন। তিনি পরিবারকে বলেছিলেন, “আমি ফিরছি।” তারপর তিনি আর কখনও ফেরেননি। ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া সমাজগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক গভীর মানবিক ও নীতিগত সংকটের প্রতীক।
জাপানে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে “নিখোঁজ” হওয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ হারিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে জীবিত ফিরে আসেন, অনেকে মৃত অবস্থায় মিলেন, আবার কেউ কেউ বছরের পর বছর নিখোঁজই থেকে যান। পরিসংখ্যান এখানে শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একেকটি পরিবার, যাদের জীবন থমকে গেছে অনিশ্চয়তা, অপরাধবোধ এবং অপেক্ষার মধ্যে।
ডিমেনশিয়াকে আমরা প্রায়ই স্মৃতিভ্রংশের রোগ হিসেবে দেখি। কিন্তু এই রোগের সবচেয়ে নির্মম দিকগুলোর একটি হলো, এটি মানুষের দিকজ্ঞান, নিরাপত্তাবোধ এবং পরিচিত জগতের সঙ্গে সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। একজন মানুষ হয়তো নিজের নাম মনে রাখতে পারেন, পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারেন, এমনকি স্বাভাবিক কথাবার্তাও বলতে পারেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি ভুল পথে হাঁটা শুরু করতে পারেন, পুরোনো কোনো বাড়ির খোঁজে বের হতে পারেন, কিংবা পরিচিত রাস্তাকেও অপরিচিত মনে হতে পারে।

সমস্যাটি আরও জটিল কারণ এই “ঘোরাঘুরি” সবসময় বিভ্রান্তি থেকে জন্ম নেয় না। অনেক সময় এটি মানুষের বহু বছরের অভ্যাসেরই ধারাবাহিকতা। কেউ প্রতিদিনের মতো হাঁটতে বের হন, কেউ পুরোনো কর্মস্থলের দিকে যেতে চান, কেউ হয়তো শৈশবের পরিচিত এলাকায় ফিরে যেতে চান। কিন্তু স্মৃতির ফাঁক আর বাস্তবতার অমিলের মধ্যে কোথাও গিয়ে তারা হারিয়ে যান।
এখানেই সমাজের বড় ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। আমরা প্রায়ই মনে করি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি মানেই পুরোপুরি অক্ষম একজন মানুষ। বাস্তবে অনেকেই দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। ফলে পরিবারও অনেক সময় বিপদের গভীরতা বুঝতে পারে না। “তিনি তো প্রতিদিনই হাঁটতে যান” — এই স্বাভাবিক ভাবনাটিই কখনও কখনও শেষ স্বাভাবিক মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়। গবেষণা বলছে, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যত দেরি হয়, মৃত্যুঝুঁকি তত বাড়ে। বিশেষ করে নদী, খাল বা জলাশয়ে পড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় খোলা পরিবেশে থাকার কারণে হাইপোথার্মিয়ায় মৃত্যুর ঘটনা অনেক বেশি দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে পরিবারগুলো প্রায়ই দ্বিধায় পড়ে যায়— পুলিশে জানাবে কি না, হয়তো তিনি নিজেই ফিরে আসবেন, হয়তো কাছেই কোথাও আছেন। এই সামান্য দেরিই কখনও অমোচনীয় হয়ে ওঠে।
ডিমেনশিয়া-সংকটের সঙ্গে আরেকটি সামাজিক পরিবর্তন জড়িয়ে আছে: একাকী বার্ধক্য। আধুনিক নগরজীবনে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে একা থাকার প্রবণতাও। সন্তান অন্য শহরে বা দেশে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ কম, আর স্থানীয় সামাজিক বন্ধন আগের মতো শক্ত নয়। ফলে কেউ নিখোঁজ হলে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেউ টেরই পান না।
এই বাস্তবতায় শুধু পরিবারকে দায়ী করলে চলবে না। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা প্রস্তুত? জাপানের কিছু শহর ইতিমধ্যে কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ নিয়েছে। কোথাও স্থানীয় বাসিন্দাদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে বিভ্রান্ত বৃদ্ধ মানুষকে নিরাপদে সাহায্য করতে হয়। কোথাও কিউআর কোড, জিপিএস ট্র্যাকিং বা এসওএস নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এসব উদ্যোগ দেখায়, সমস্যার সমাধান কেবল প্রযুক্তিতে নয়; সামাজিক সচেতনতা ও সমন্বয়েও।

তবে প্রযুক্তি একাই যথেষ্ট নয়। কারণ সবচেয়ে বড় ঘাটতি প্রায়ই তথ্যপ্রাপ্তিতে। অনেক পরিবার জানেই না কী ধরনের সহায়তা ব্যবস্থা ইতিমধ্যে আছে। আবার অনেক বয়স্ক মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারেও স্বচ্ছন্দ নন। ফলে বাস্তব সমাধান হতে হবে বহুস্তরীয়— স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে।
এই সংকট আমাদের আরেকটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আধুনিক সমাজ বৃদ্ধ মানুষদের কীভাবে দেখে? তারা কি শুধু স্বাস্থ্যসেবার পরিসংখ্যানে পরিণত হচ্ছেন, নাকি এখনও সামাজিক সম্পর্কের সক্রিয় অংশ? ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের “হারিয়ে যাওয়া” আসলে অনেক সময় সমাজের ভেতর থেকেই তাদের ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার প্রতিফলন।
একজন মানুষ নিখোঁজ হলে পরিবার কখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। মৃত্যু অন্তত সমাপ্তির একটি ভাষা দেয়; কিন্তু অনিশ্চয়তা দেয় না। অপেক্ষা তখন বছর পেরিয়ে যায়, অথচ শেষ হয় না। দরজার শব্দ, ফোনের রিং, রাস্তায় দেখা কোনো মুখ— সবকিছুতেই ফিরে আসে অসমাপ্ত আশার ছায়া।
ডিমেনশিয়াকে তাই শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে সামাজিক অবকাঠামো, পারিবারিক সম্পর্ক, নগরজীবন এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। যতদিন আমরা এই সংকটকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখব, ততদিন আরও অনেক মানুষ প্রতিদিনের মতো হাঁটতে বের হয়ে আর কখনও বাড়ি ফিরবেন না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















