০৬:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
শেখ হাসিনার দুই বার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন এআইয়ের ধাক্কায় চাকরিহীন তরুণরা, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিও আর দিচ্ছে না নিশ্চয়তা মুদির বাজারে নতুন ঝড়, টমেটো থেকে দুধ—সবকিছুর দাম বাড়ার আশঙ্কায় আমেরিকা তেলের ধাক্কা শুধু যুদ্ধের নয়, নীতিহীনতারও মূল্য রঘু রাইয়ের ক্যামেরা ছিল শুধু ছবি তোলার যন্ত্র নয়, এক ধরনের জীবনদর্শন ট্রাম্পের কঠোর আশ্রয়নীতি কি স্থায়ী রূপ নিচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল ঘিরে বিতর্ক, সমালোচনায় রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ নিউইয়র্কে আবাসন নির্মাণে বড় বাধা কমছে, বদলে যেতে পারে শহরের ভবিষ্যৎ ট্রাম্পের প্রতিশোধ রাজনীতি নিয়ে চাপে রিপাবলিকানরা ট্রাম্প-শি বৈঠকে বাণিজ্যের হাসি, আড়ালে তাইওয়ান-ইউক্রেন-ইরান উত্তেজনা

শেখ হাসিনার দুই বার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন

১৯৮১ সালে ১৭ মে সকালের দিকে আকাশটা একটু মেঘলা ছিলদুপুর হতেই প্রচণ্ড গরম। মধ্য মে মাসের গরম। দুপুর তখন বারোটা বাজেনি। এ সময়ে তীব্র গরমে গুলিস্থান বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতে শোনা যায় বাস কন্ডাকটারবিশেষ করে বি আর টি সি বাসের কন্ডাক্টরদের হাঁক— “ফার্ম গেট ফ্রিফার্ম গেট ফ্রি— চলেনচলেন শেখের বেটি আসছে। ওই সময়ে ঢাকা শহরে বি আর টি সি বাসই বেশি চলত।

পাশে একজনের দিকে তাকাতে তিনি বুঝতে পারলেনবিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছি না। তিনি হেসে বললেনবুঝতে পারছেন নাআজ বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা আসছেতার দিকে কিছুটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলিবি আর টি সি তো সরকারি বাসওরা কেন ফ্রি যেতে বলছে। ভদ্রলোক বুঝলেনএতক্ষণ একটা বোকা মানুষের সঙ্গে তিনি কথা বলছেনতাই অনেকটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেনবঙ্গবন্ধুর মেয়ে বাংলাদেশে আসছেসেখানে যাবার জন্য আবার সরকারি-বেসরকারি। দেশটা তৈরি করেছে কে?

মাথা নিচু করে কাঠের বডির একটা সদরঘাট-রামপুরা বাসে উঠে রামপুরা বাজার গিয়ে নামি। তখনও কাঠের বডির বাসগুলো রামপুরা বাসস্ট্যান্ড অবধি যেত না। রামপুরা বাজারে নেমে দেখি কবি আসাদ চৌধুরী টিভি স্টেশনে যাবার জন্য রিকসা খুঁজছেন। এগিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মিলাই। তিনি তাঁর পান ভর্তি গাল নিয়ে হেসে দেন।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ

কবি আসাদ চৌধুরীর প্রতি সব বাঙালির আসলে বাড়তি একটা শ্রদ্ধা শুধু তার কবিতার জন্য নয়স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার একটা বিখ্যাত লাইনের জন্য— “ওরা মানুষ খুন করছেআসুন আমরা পশু হত্যা করি। বাঙালি সহজিয়া জাতি। সে বাউলভাটিয়ালিকীর্তনমাজারমেলা এগুলো নিয়ে তার সহজ-সরল জীবন কাটাতে পছন্দ করে। কিন্তু ওই যেশান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে হলেও অস্ত্র হাতে লড়তে জানে। তবে সহজিয়া সন্তান তো আর মানুষ হত্যা করে না। তারা মানুষ হত্যাকারীবাঙালি হত্যাকারী পশু হত্যা করতে পারে। আসাদ চৌধুরীর একটি লাইন সেদিন অনেক শান্তিপ্রিয় রুমিরমিজআসাদরমেনবিমলদের ঘোর কাটিয়ে দিয়েছিল। তারা বাঙালি হত্যাকারী পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগী পশুদের হত্যার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল।

আসাদ চৌধুরী রিকসায় ওঠার আগে কানের কাছে মুখ এনে বললেন২টায় প্রোগ্রাম শেষ। সেখান থেকে সোজা মানিক মিঞা এভিনিউ। রিকসা না হলে হেঁটেই যাবেন।

মাথার ওপর তীব্র রোদভ্যাপসা গরমে জিনস শার্ট ভিজে যাচ্ছে। তারপরেও ধীরে ধীরে হেঁটে পৌঁছাই রামপুরা মেইন রোডের ৩৬১ নম্বর বাসায়। ছোট্ট দেড়তলা একটি বাড়ি। ছোট্ট একটা লন। ছোট ভাগনিটা খেলা করছিল লনে। সে দৌঁড়ে দরজা খুলে দিয়ে বলে, “মামাআমার এই দুই ঘণ্টা ধরে শুধু একটা কাজদরজা খোলা।” বলিতোমার মাতোমার মেজ আপুসেজ আপু কইসে বলেআপুরা আজ স্কুলে যায়নি। মা নামাজ পড়ছেন।

তার হাত ধরে নিয়ে ওপরে উঠতেই সে বলেজানো মামাআজ আমাদের বাড়িতে মাত্র দুই কলসি আর এক জগ পানি আছে। পানি আসবে তো সেই বিকেল চারটার পরে। বলেই সে ছাদ থেকে বিলের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো। দেখি শুধু মানুষ আর মানুষ। লুঙ্গি পরা মানুষ হেঁটে আসছে। তখনও বিলের দিকে চোখএ সময়ে দেখি আবার গেটের কড়া নাড়ছে অনেক মানুষ। ছোট ভাগনিটি দৌঁড়ে গিয়ে তাদের বলল, “বিশ্বাস করুনআমাদের কেনপাশের কোনো বাড়িতেও আর পানি নেই।

কেমন ছিল সাব জেলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দুই ঈদ

ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে কিছুটা মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়ে রামপুরা ব্রিজ থেকে নৌকায় উঠি গুলশান যাবার জন্য। নৌকায় যত মানুষসবার মুখে একই কথা— আজ বঙ্গবন্ধুর মেয়ে আসবেন। গুলশানে যে কাজে যাচ্ছিলামসেই কাজের প্রতি আর মন থাকেনি। তখনকার গুলশান মানে লাল ডুপলেক্স আর নীরবতা। তার পাশেই তখন শুকনো বিল। দেখিওই বিল দিয়েও মানুষ ঢাকা-মুখী। লুঙ্গি পরা হাজার হাজার মানুষ।

বিকেলে আর মানিক মিঞা এভিনিউর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারিনি। ঢাকা কলেজের অপর পাশের একটি হোটেল থেকে খেয়ে কয়েক বন্ধু মিলে যখন এগুতে থাকিতখন শুক্রাবাদের ওপাশে আর যাওয়ার মতো নেই। মাথার ওপর তখন টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে।

সারাজীবন যে অভ্যাস থেকে রেহাই পেতে পারিনিমাঝে মাঝেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আওড়াতে থাকি প্রিয় কোনো কবিতার লাইন। সেদিনও সেই অভ্যাস পেয়ে বসেবার বার আওড়াতে থাকি— “যেন তিনি সব গান দুঃখ জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে রেখেছেন বন্ধ করে…। অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আমার এ অভ্যাস জানা আছেতাই তারা বিরক্ত হয় না। তবে কখন ঝড়বৃষ্টি সে লাইন থামিয়ে দিয়েছিলমানুষের চাপে চাপে কোথায় চলে গিয়েছিলাম আর ঝড়েজলে ভিজেপায়ের জুতো হারিয়ে কত রাতে যে নিজ ডেরায় পৌঁছেছিলামমনে নেই। তবে আকাশ ভেঙে যেমন বৃষ্টি হয়েছিলশহরও মনে হয় সেদিন ভেঙে পড়েছিল রাস্তায়। আর ভিড়ের মাঝেঝড়-জলের মধ্যে কেবলই কানে এসেছিল— “শেখ হাসিনার ভয় নাইআমরা আছি লক্ষ ভাই”, শেষ অবধি দুটি শব্দ— “শেখ হাসিনাশেখ হাসিনা

শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন

বাস্তবে সেদিন শহর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর যাত্রাবাড়ীর প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে সারাদিন ক্যান্টনমেন্টেই থাকেন বলে যেমন পরে জানা যায়। ওই দিন যাত্রাবাড়ীতে তরুণ সংঘে তাঁর একটা প্রোগ্রাম ছিলতিনি যাননি সেখানে।

এমনই আরো হাজারটি ঘটনা ও চিন্তা বদলে গিয়েছিল সেদিন। যেমন বেশ পরে শফিকুল আজিজ মুকুল ভাইয়ের কাছে শুনেছিসদ্য প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন চট্টগ্রাম থেকে এসে উঠেছিলেন সিনেমাহল রাজমনির উল্টো দিকের হোটেলটিতে। সে সময়ের ঢাকায় ওটা অনেক ভালো হোটেল ছিল। ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ ভাই সন্ধানী সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের বন্ধু হওয়ার কারণে তার সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিন। পরে তার বার্ধক্য ও আমার প্রৌঢ়ত্ব নিয়ে একসঙ্গে শরীর চর্চাও করেছিও দীর্ঘদিন। এত অল্প ভাষায় নিজে স্বাভাবিক থেকে রসিকতা করার মতো মানুষ খুব কম দেখেছি।

যাহোকশফিকুল আজিজ মুকুল ভাইয়ের কাছে শুনেছিবেশ রাতে ওই সময়ের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক হঠাৎ ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনের রুমে ঢুকে তার খাটে আড়াআড়িভাবে শুয়ে পড়েন ও একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। মোশারফ ভাই সোফায় বসে নির্বিকারভাবে বলেন, “রাজ্জাক মন খারাপ করছেন কেনমানুষ তাদের নেতা পেয়েছেতাদের নেতাকে নিয়ে চলে গেছে।

বাস্তবে তার পরে ১৯৮১ থেকে দীর্ঘ পথ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষ তিনি ভুল করুকঠিক করুকতাঁর সঙ্গেই চলেছেসমালোচনা করেছেবিরক্ত হয়েছেতবু তাকেই মনে করেছে বঙ্গবন্ধুর প্রতীক। যে কারণে দেশ পরিচালনায় এশিয়া কেনপৃথিবীর অন্যতম যোগ্য রাষ্ট্রপরিচালক হয়েও তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা” এই পরিচয়ের বাইরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের কাছে আসতে পারেননি।

Former PM barred from taking flight - Taipei Times

দ্বিতীয়বার এই একই এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ ২০০৭ সালের দুপুরে ম্যাডোনা গার্মেন্টসের মালিক বড় ভাই ও বন্ধু আক্তারুজ্জামান ভাইয়ের অফিসে বসে বিকেলে গল্প করছি। এমন সময়ে টেলিভিশনের পর্দায় দেখি হিথ্রো এয়ারপোর্টে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশে বিমানে ওঠা আটকে দেওয়া হয়েছে। তিনি এয়ারপোর্টে। ওই টিভির রিপোর্টার হিসেবে আমিনুল হক বাদশা শুধু রিপোর্ট করছেন নাতিনি শেখ হাসিনা সম্পর্কে কুৎসিত কথাবার্তা বলছেন। আমিনুল হক বাদশা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন— কেন তিনি সেদিন ওই অবস্থায় গিয়েছিলেন এবং মৃত্যু অবধি কেন ওই অবস্থানে ছিলেনসে অর্থের উৎস সম্পর্কে অন্য কোনো লেখায় লিখব।

যাহোকনিউজম্যান হিসেবে তখনই মনে করিতাঁর সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ফোন করলামদেখি তিনি ফোন ধরেন কিনা বা কোনো বক্তব্য দেন কিনাবাংলাদেশের সকল সাংবাদিকই জানেনশেখ হাসিনাকে রিচ করা অন্য সকল বড় নেতার থেকে সব সময়ই সহজ। ফোন করতেই উনি ফোন ধরলেন এবং কোনো কিছু বলার আগেই বললেন, “আমার মন্তব্য জানতে চাচ্ছো তোআমি কি করবলিখে দাওআমি শেখ হাসিনাআমার দেশ বাংলাদেশআমি বাংলাদেশেই ফিরব। যতদিন বাংলাদেশের জনগণ আছেসাধারণ মানুষ আছে— ততদিন পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই আমার দেশে ফেরার পথ বন্ধ করার।” প্রশ্ন করিকিন্তু আইনত তো আপনার ফেরার কোনো উপায় নেই। তিনি বেশ দৃঢ় স্বরে বলেনজনগণের শক্তিই মূল আইন। এর পরে আরো কিছু কথা হয়।

তাড়াতাড়ি তার ফোন রেখে অফিসে ফোন করে নিউজটি ডিকটেশন দেই। প্রেস রিলিজের বাইরে সেদিন আমাদের পত্রিকায় ছিল তার এই তাৎক্ষণিক ও এই ঘটনা কেন্দ্রিক প্রথম নেওয়া ইন্টারভিউ। এর পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাধ্য হয় তাকে দেশে ফেরত আসতে দিতে। ৭ মে ২০০৭-এ তিনি দেশে ফিরে আসেন।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখ হাসিনার দুই বার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন

শেখ হাসিনার দুই বার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন

০৫:১৫:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

১৯৮১ সালে ১৭ মে সকালের দিকে আকাশটা একটু মেঘলা ছিলদুপুর হতেই প্রচণ্ড গরম। মধ্য মে মাসের গরম। দুপুর তখন বারোটা বাজেনি। এ সময়ে তীব্র গরমে গুলিস্থান বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতে শোনা যায় বাস কন্ডাকটারবিশেষ করে বি আর টি সি বাসের কন্ডাক্টরদের হাঁক— “ফার্ম গেট ফ্রিফার্ম গেট ফ্রি— চলেনচলেন শেখের বেটি আসছে। ওই সময়ে ঢাকা শহরে বি আর টি সি বাসই বেশি চলত।

পাশে একজনের দিকে তাকাতে তিনি বুঝতে পারলেনবিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছি না। তিনি হেসে বললেনবুঝতে পারছেন নাআজ বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা আসছেতার দিকে কিছুটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলিবি আর টি সি তো সরকারি বাসওরা কেন ফ্রি যেতে বলছে। ভদ্রলোক বুঝলেনএতক্ষণ একটা বোকা মানুষের সঙ্গে তিনি কথা বলছেনতাই অনেকটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেনবঙ্গবন্ধুর মেয়ে বাংলাদেশে আসছেসেখানে যাবার জন্য আবার সরকারি-বেসরকারি। দেশটা তৈরি করেছে কে?

মাথা নিচু করে কাঠের বডির একটা সদরঘাট-রামপুরা বাসে উঠে রামপুরা বাজার গিয়ে নামি। তখনও কাঠের বডির বাসগুলো রামপুরা বাসস্ট্যান্ড অবধি যেত না। রামপুরা বাজারে নেমে দেখি কবি আসাদ চৌধুরী টিভি স্টেশনে যাবার জন্য রিকসা খুঁজছেন। এগিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মিলাই। তিনি তাঁর পান ভর্তি গাল নিয়ে হেসে দেন।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ

কবি আসাদ চৌধুরীর প্রতি সব বাঙালির আসলে বাড়তি একটা শ্রদ্ধা শুধু তার কবিতার জন্য নয়স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার একটা বিখ্যাত লাইনের জন্য— “ওরা মানুষ খুন করছেআসুন আমরা পশু হত্যা করি। বাঙালি সহজিয়া জাতি। সে বাউলভাটিয়ালিকীর্তনমাজারমেলা এগুলো নিয়ে তার সহজ-সরল জীবন কাটাতে পছন্দ করে। কিন্তু ওই যেশান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে হলেও অস্ত্র হাতে লড়তে জানে। তবে সহজিয়া সন্তান তো আর মানুষ হত্যা করে না। তারা মানুষ হত্যাকারীবাঙালি হত্যাকারী পশু হত্যা করতে পারে। আসাদ চৌধুরীর একটি লাইন সেদিন অনেক শান্তিপ্রিয় রুমিরমিজআসাদরমেনবিমলদের ঘোর কাটিয়ে দিয়েছিল। তারা বাঙালি হত্যাকারী পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগী পশুদের হত্যার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল।

আসাদ চৌধুরী রিকসায় ওঠার আগে কানের কাছে মুখ এনে বললেন২টায় প্রোগ্রাম শেষ। সেখান থেকে সোজা মানিক মিঞা এভিনিউ। রিকসা না হলে হেঁটেই যাবেন।

মাথার ওপর তীব্র রোদভ্যাপসা গরমে জিনস শার্ট ভিজে যাচ্ছে। তারপরেও ধীরে ধীরে হেঁটে পৌঁছাই রামপুরা মেইন রোডের ৩৬১ নম্বর বাসায়। ছোট্ট দেড়তলা একটি বাড়ি। ছোট্ট একটা লন। ছোট ভাগনিটা খেলা করছিল লনে। সে দৌঁড়ে দরজা খুলে দিয়ে বলে, “মামাআমার এই দুই ঘণ্টা ধরে শুধু একটা কাজদরজা খোলা।” বলিতোমার মাতোমার মেজ আপুসেজ আপু কইসে বলেআপুরা আজ স্কুলে যায়নি। মা নামাজ পড়ছেন।

তার হাত ধরে নিয়ে ওপরে উঠতেই সে বলেজানো মামাআজ আমাদের বাড়িতে মাত্র দুই কলসি আর এক জগ পানি আছে। পানি আসবে তো সেই বিকেল চারটার পরে। বলেই সে ছাদ থেকে বিলের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো। দেখি শুধু মানুষ আর মানুষ। লুঙ্গি পরা মানুষ হেঁটে আসছে। তখনও বিলের দিকে চোখএ সময়ে দেখি আবার গেটের কড়া নাড়ছে অনেক মানুষ। ছোট ভাগনিটি দৌঁড়ে গিয়ে তাদের বলল, “বিশ্বাস করুনআমাদের কেনপাশের কোনো বাড়িতেও আর পানি নেই।

কেমন ছিল সাব জেলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দুই ঈদ

ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে কিছুটা মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়ে রামপুরা ব্রিজ থেকে নৌকায় উঠি গুলশান যাবার জন্য। নৌকায় যত মানুষসবার মুখে একই কথা— আজ বঙ্গবন্ধুর মেয়ে আসবেন। গুলশানে যে কাজে যাচ্ছিলামসেই কাজের প্রতি আর মন থাকেনি। তখনকার গুলশান মানে লাল ডুপলেক্স আর নীরবতা। তার পাশেই তখন শুকনো বিল। দেখিওই বিল দিয়েও মানুষ ঢাকা-মুখী। লুঙ্গি পরা হাজার হাজার মানুষ।

বিকেলে আর মানিক মিঞা এভিনিউর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারিনি। ঢাকা কলেজের অপর পাশের একটি হোটেল থেকে খেয়ে কয়েক বন্ধু মিলে যখন এগুতে থাকিতখন শুক্রাবাদের ওপাশে আর যাওয়ার মতো নেই। মাথার ওপর তখন টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে।

সারাজীবন যে অভ্যাস থেকে রেহাই পেতে পারিনিমাঝে মাঝেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আওড়াতে থাকি প্রিয় কোনো কবিতার লাইন। সেদিনও সেই অভ্যাস পেয়ে বসেবার বার আওড়াতে থাকি— “যেন তিনি সব গান দুঃখ জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে রেখেছেন বন্ধ করে…। অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আমার এ অভ্যাস জানা আছেতাই তারা বিরক্ত হয় না। তবে কখন ঝড়বৃষ্টি সে লাইন থামিয়ে দিয়েছিলমানুষের চাপে চাপে কোথায় চলে গিয়েছিলাম আর ঝড়েজলে ভিজেপায়ের জুতো হারিয়ে কত রাতে যে নিজ ডেরায় পৌঁছেছিলামমনে নেই। তবে আকাশ ভেঙে যেমন বৃষ্টি হয়েছিলশহরও মনে হয় সেদিন ভেঙে পড়েছিল রাস্তায়। আর ভিড়ের মাঝেঝড়-জলের মধ্যে কেবলই কানে এসেছিল— “শেখ হাসিনার ভয় নাইআমরা আছি লক্ষ ভাই”, শেষ অবধি দুটি শব্দ— “শেখ হাসিনাশেখ হাসিনা

শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন

বাস্তবে সেদিন শহর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর যাত্রাবাড়ীর প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে সারাদিন ক্যান্টনমেন্টেই থাকেন বলে যেমন পরে জানা যায়। ওই দিন যাত্রাবাড়ীতে তরুণ সংঘে তাঁর একটা প্রোগ্রাম ছিলতিনি যাননি সেখানে।

এমনই আরো হাজারটি ঘটনা ও চিন্তা বদলে গিয়েছিল সেদিন। যেমন বেশ পরে শফিকুল আজিজ মুকুল ভাইয়ের কাছে শুনেছিসদ্য প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন চট্টগ্রাম থেকে এসে উঠেছিলেন সিনেমাহল রাজমনির উল্টো দিকের হোটেলটিতে। সে সময়ের ঢাকায় ওটা অনেক ভালো হোটেল ছিল। ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ ভাই সন্ধানী সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের বন্ধু হওয়ার কারণে তার সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিন। পরে তার বার্ধক্য ও আমার প্রৌঢ়ত্ব নিয়ে একসঙ্গে শরীর চর্চাও করেছিও দীর্ঘদিন। এত অল্প ভাষায় নিজে স্বাভাবিক থেকে রসিকতা করার মতো মানুষ খুব কম দেখেছি।

যাহোকশফিকুল আজিজ মুকুল ভাইয়ের কাছে শুনেছিবেশ রাতে ওই সময়ের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক হঠাৎ ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনের রুমে ঢুকে তার খাটে আড়াআড়িভাবে শুয়ে পড়েন ও একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। মোশারফ ভাই সোফায় বসে নির্বিকারভাবে বলেন, “রাজ্জাক মন খারাপ করছেন কেনমানুষ তাদের নেতা পেয়েছেতাদের নেতাকে নিয়ে চলে গেছে।

বাস্তবে তার পরে ১৯৮১ থেকে দীর্ঘ পথ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষ তিনি ভুল করুকঠিক করুকতাঁর সঙ্গেই চলেছেসমালোচনা করেছেবিরক্ত হয়েছেতবু তাকেই মনে করেছে বঙ্গবন্ধুর প্রতীক। যে কারণে দেশ পরিচালনায় এশিয়া কেনপৃথিবীর অন্যতম যোগ্য রাষ্ট্রপরিচালক হয়েও তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা” এই পরিচয়ের বাইরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের কাছে আসতে পারেননি।

Former PM barred from taking flight - Taipei Times

দ্বিতীয়বার এই একই এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ ২০০৭ সালের দুপুরে ম্যাডোনা গার্মেন্টসের মালিক বড় ভাই ও বন্ধু আক্তারুজ্জামান ভাইয়ের অফিসে বসে বিকেলে গল্প করছি। এমন সময়ে টেলিভিশনের পর্দায় দেখি হিথ্রো এয়ারপোর্টে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশে বিমানে ওঠা আটকে দেওয়া হয়েছে। তিনি এয়ারপোর্টে। ওই টিভির রিপোর্টার হিসেবে আমিনুল হক বাদশা শুধু রিপোর্ট করছেন নাতিনি শেখ হাসিনা সম্পর্কে কুৎসিত কথাবার্তা বলছেন। আমিনুল হক বাদশা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন— কেন তিনি সেদিন ওই অবস্থায় গিয়েছিলেন এবং মৃত্যু অবধি কেন ওই অবস্থানে ছিলেনসে অর্থের উৎস সম্পর্কে অন্য কোনো লেখায় লিখব।

যাহোকনিউজম্যান হিসেবে তখনই মনে করিতাঁর সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ফোন করলামদেখি তিনি ফোন ধরেন কিনা বা কোনো বক্তব্য দেন কিনাবাংলাদেশের সকল সাংবাদিকই জানেনশেখ হাসিনাকে রিচ করা অন্য সকল বড় নেতার থেকে সব সময়ই সহজ। ফোন করতেই উনি ফোন ধরলেন এবং কোনো কিছু বলার আগেই বললেন, “আমার মন্তব্য জানতে চাচ্ছো তোআমি কি করবলিখে দাওআমি শেখ হাসিনাআমার দেশ বাংলাদেশআমি বাংলাদেশেই ফিরব। যতদিন বাংলাদেশের জনগণ আছেসাধারণ মানুষ আছে— ততদিন পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই আমার দেশে ফেরার পথ বন্ধ করার।” প্রশ্ন করিকিন্তু আইনত তো আপনার ফেরার কোনো উপায় নেই। তিনি বেশ দৃঢ় স্বরে বলেনজনগণের শক্তিই মূল আইন। এর পরে আরো কিছু কথা হয়।

তাড়াতাড়ি তার ফোন রেখে অফিসে ফোন করে নিউজটি ডিকটেশন দেই। প্রেস রিলিজের বাইরে সেদিন আমাদের পত্রিকায় ছিল তার এই তাৎক্ষণিক ও এই ঘটনা কেন্দ্রিক প্রথম নেওয়া ইন্টারভিউ। এর পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাধ্য হয় তাকে দেশে ফেরত আসতে দিতে। ৭ মে ২০০৭-এ তিনি দেশে ফিরে আসেন।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World