১৯৮১ সালে ১৭ মে সকালের দিকে আকাশটা একটু মেঘলা ছিল, দুপুর হতেই প্রচণ্ড গরম। মধ্য মে মাসের গরম। দুপুর তখন বারোটা বাজেনি। এ সময়ে তীব্র গরমে গুলিস্থান বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতে শোনা যায় বাস কন্ডাকটার, বিশেষ করে বি আর টি সি বাসের কন্ডাক্টরদের হাঁক— “ফার্ম গেট ফ্রি, ফার্ম গেট ফ্রি— চলেন, চলেন শেখের বেটি আসছে”। ওই সময়ে ঢাকা শহরে বি আর টি সি বাসই বেশি চলত।
পাশে একজনের দিকে তাকাতে তিনি বুঝতে পারলেন, বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছি না। তিনি হেসে বললেন, বুঝতে পারছেন না, আজ বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা আসছে? তার দিকে কিছুটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলি, বি আর টি সি তো সরকারি বাস, ওরা কেন ফ্রি যেতে বলছে। ভদ্রলোক বুঝলেন, এতক্ষণ একটা বোকা মানুষের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন, তাই অনেকটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন, বঙ্গবন্ধুর মেয়ে বাংলাদেশে আসছে, সেখানে যাবার জন্য আবার সরকারি-বেসরকারি। দেশটা তৈরি করেছে কে?
মাথা নিচু করে কাঠের বডির একটা সদরঘাট-রামপুরা বাসে উঠে রামপুরা বাজার গিয়ে নামি। তখনও কাঠের বডির বাসগুলো রামপুরা বাসস্ট্যান্ড অবধি যেত না। রামপুরা বাজারে নেমে দেখি কবি আসাদ চৌধুরী টিভি স্টেশনে যাবার জন্য রিকসা খুঁজছেন। এগিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মিলাই। তিনি তাঁর পান ভর্তি গাল নিয়ে হেসে দেন।
কবি আসাদ চৌধুরীর প্রতি সব বাঙালির আসলে বাড়তি একটা শ্রদ্ধা শুধু তার কবিতার জন্য নয়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার একটা বিখ্যাত লাইনের জন্য— “ওরা মানুষ খুন করছে, আসুন আমরা পশু হত্যা করি”। বাঙালি সহজিয়া জাতি। সে বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, মাজার, মেলা এগুলো নিয়ে তার সহজ-সরল জীবন কাটাতে পছন্দ করে। কিন্তু ওই যে, শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে হলেও অস্ত্র হাতে লড়তে জানে। তবে সহজিয়া সন্তান তো আর মানুষ হত্যা করে না। তারা মানুষ হত্যাকারী, বাঙালি হত্যাকারী পশু হত্যা করতে পারে। আসাদ চৌধুরীর একটি লাইন সেদিন অনেক শান্তিপ্রিয় রুমি, রমিজ, আসাদ, রমেন, বিমলদের ঘোর কাটিয়ে দিয়েছিল। তারা বাঙালি হত্যাকারী পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগী পশুদের হত্যার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল।
আসাদ চৌধুরী রিকসায় ওঠার আগে কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ২টায় প্রোগ্রাম শেষ। সেখান থেকে সোজা মানিক মিঞা এভিনিউ। রিকসা না হলে হেঁটেই যাবেন।
মাথার ওপর তীব্র রোদ, ভ্যাপসা গরমে জিনস শার্ট ভিজে যাচ্ছে। তারপরেও ধীরে ধীরে হেঁটে পৌঁছাই রামপুরা মেইন রোডের ৩৬১ নম্বর বাসায়। ছোট্ট দেড়তলা একটি বাড়ি। ছোট্ট একটা লন। ছোট ভাগনিটা খেলা করছিল লনে। সে দৌঁড়ে দরজা খুলে দিয়ে বলে, “মামা, আমার এই দুই ঘণ্টা ধরে শুধু একটা কাজ, দরজা খোলা।” বলি, তোমার মা, তোমার মেজ আপু, সেজ আপু কই? সে বলে, আপুরা আজ স্কুলে যায়নি। মা নামাজ পড়ছেন।
তার হাত ধরে নিয়ে ওপরে উঠতেই সে বলে, জানো মামা, আজ আমাদের বাড়িতে মাত্র দুই কলসি আর এক জগ পানি আছে। পানি আসবে তো সেই বিকেল চারটার পরে। বলেই সে ছাদ থেকে বিলের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো। দেখি শুধু মানুষ আর মানুষ। লুঙ্গি পরা মানুষ হেঁটে আসছে। তখনও বিলের দিকে চোখ, এ সময়ে দেখি আবার গেটের কড়া নাড়ছে অনেক মানুষ। ছোট ভাগনিটি দৌঁড়ে গিয়ে তাদের বলল, “বিশ্বাস করুন, আমাদের কেন, পাশের কোনো বাড়িতেও আর পানি নেই।”

ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে কিছুটা মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়ে রামপুরা ব্রিজ থেকে নৌকায় উঠি গুলশান যাবার জন্য। নৌকায় যত মানুষ, সবার মুখে একই কথা— আজ বঙ্গবন্ধুর মেয়ে আসবেন। গুলশানে যে কাজে যাচ্ছিলাম, সেই কাজের প্রতি আর মন থাকেনি। তখনকার গুলশান মানে লাল ডুপলেক্স আর নীরবতা। তার পাশেই তখন শুকনো বিল। দেখি, ওই বিল দিয়েও মানুষ ঢাকা-মুখী। লুঙ্গি পরা হাজার হাজার মানুষ।
বিকেলে আর মানিক মিঞা এভিনিউর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারিনি। ঢাকা কলেজের অপর পাশের একটি হোটেল থেকে খেয়ে কয়েক বন্ধু মিলে যখন এগুতে থাকি, তখন শুক্রাবাদের ওপাশে আর যাওয়ার মতো নেই। মাথার ওপর তখন টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে।
সারাজীবন যে অভ্যাস থেকে রেহাই পেতে পারিনি, মাঝে মাঝেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আওড়াতে থাকি প্রিয় কোনো কবিতার লাইন। সেদিনও সেই অভ্যাস পেয়ে বসে, বার বার আওড়াতে থাকি— “যেন তিনি সব গান দুঃখ জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে রেখেছেন বন্ধ করে…”। অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আমার এ অভ্যাস জানা আছে, তাই তারা বিরক্ত হয় না। তবে কখন ঝড়বৃষ্টি সে লাইন থামিয়ে দিয়েছিল, মানুষের চাপে চাপে কোথায় চলে গিয়েছিলাম আর ঝড়ে, জলে ভিজে, পায়ের জুতো হারিয়ে কত রাতে যে নিজ ডেরায় পৌঁছেছিলাম, মনে নেই। তবে আকাশ ভেঙে যেমন বৃষ্টি হয়েছিল, শহরও মনে হয় সেদিন ভেঙে পড়েছিল রাস্তায়। আর ভিড়ের মাঝে, ঝড়-জলের মধ্যে কেবলই কানে এসেছিল— “শেখ হাসিনার ভয় নাই, আমরা আছি লক্ষ ভাই”, শেষ অবধি দুটি শব্দ— “শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা”।

বাস্তবে সেদিন শহর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর যাত্রাবাড়ীর প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে সারাদিন ক্যান্টনমেন্টেই থাকেন বলে যেমন পরে জানা যায়। ওই দিন যাত্রাবাড়ীতে তরুণ সংঘে তাঁর একটা প্রোগ্রাম ছিল, তিনি যাননি সেখানে।
এমনই আরো হাজারটি ঘটনা ও চিন্তা বদলে গিয়েছিল সেদিন। যেমন বেশ পরে শফিকুল আজিজ মুকুল ভাইয়ের কাছে শুনেছি, সদ্য প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন চট্টগ্রাম থেকে এসে উঠেছিলেন সিনেমাহল রাজমনির উল্টো দিকের হোটেলটিতে। সে সময়ের ঢাকায় ওটা অনেক ভালো হোটেল ছিল। ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ ভাই সন্ধানী সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের বন্ধু হওয়ার কারণে তার সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিন। পরে তাঁর বার্ধক্য ও আমার প্রৌঢ়ত্ব নিয়ে একসঙ্গে শরীর চর্চাও করেছিও দীর্ঘদিন। এত অল্প ভাষায় নিজে স্বাভাবিক থেকে রসিকতা করার মতো মানুষ খুব কম দেখেছি।
যাহোক, শফিকুল আজিজ মুকুল ভাইয়ের কাছে শুনেছি, বেশ রাতে ওই সময়ের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক হঠাৎ ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনের রুমে ঢুকে তাঁর খাটে আড়াআড়িভাবে শুয়ে পড়েন ও একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। মোশারফ ভাই সোফায় বসে নির্বিকারভাবে বলেন, “রাজ্জাক মন খারাপ করছেন কেন, মানুষ তাদের নেতা পেয়েছে, তাদের নেতাকে নিয়ে চলে গেছে।”
বাস্তবে তার পরে ১৯৮১ থেকে দীর্ঘ পথ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষ তিনি ভুল করুক, ঠিক করুক, তাঁর সঙ্গেই চলেছে, সমালোচনা করেছে, বিরক্ত হয়েছে, তবু তাঁকেই মনে করেছে বঙ্গবন্ধুর প্রতীক। যে কারণে দেশ পরিচালনায় এশিয়া কেন, পৃথিবীর অন্যতম যোগ্য রাষ্ট্রপরিচালক হয়েও তিনি “বঙ্গবন্ধু কন্যা” এই পরিচয়ের বাইরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের কাছে আসতে পারেননি।

দ্বিতীয়বার এই একই এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ ২০০৭ সালের দুপুরে ম্যাডোনা গার্মেন্টসের মালিক বড় ভাই ও বন্ধু আক্তারুজ্জামান ভাইয়ের অফিসে বসে বিকেলে গল্প করছি। এমন সময়ে টেলিভিশনের পর্দায় দেখি হিথ্রো এয়ারপোর্টে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশে বিমানে ওঠা আটকে দেওয়া হয়েছে। তিনি এয়ারপোর্টে। ওই টিভির রিপোর্টার হিসেবে আমিনুল হক বাদশা শুধু রিপোর্ট করছেন না, তিনি শেখ হাসিনা সম্পর্কে কুৎসিত কথাবার্তা বলছেন। আমিনুল হক বাদশা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন— কেন তিনি সেদিন ওই অবস্থায় গিয়েছিলেন এবং মৃত্যু অবধি কেন ওই অবস্থানে ছিলেন, সে অর্থের উৎস সম্পর্কে অন্য কোনো লেখায় লিখব।
যাহোক, নিউজম্যান হিসেবে তখনই মনে করি, তাঁর সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ফোন করলাম, দেখি তিনি ফোন ধরেন কিনা বা কোনো বক্তব্য দেন কিনা? বাংলাদেশের সকল সাংবাদিকই জানেন, শেখ হাসিনাকে রিচ করা অন্য সকল বড় নেতার থেকে সব সময়ই সহজ। ফোন করতেই উনি ফোন ধরলেন এবং কোনো কিছু বলার আগেই বললেন, “আমার মন্তব্য জানতে চাচ্ছো তো, আমি কি করব, লিখে দাও, আমি শেখ হাসিনা, আমার দেশ বাংলাদেশ, আমি বাংলাদেশেই ফিরব। যতদিন বাংলাদেশের জনগণ আছে, সাধারণ মানুষ আছে— ততদিন পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই আমার দেশে ফেরার পথ বন্ধ করার।” প্রশ্ন করি, কিন্তু আইনত তো আপনার ফেরার কোনো উপায় নেই। তিনি বেশ দৃঢ় স্বরে বলেন, জনগণের শক্তিই মূল আইন। এর পরে আরো কিছু কথা হয়।
তাড়াতাড়ি তাঁর ফোন রেখে অফিসে ফোন করে নিউজটি ডিকটেশন দেই। প্রেস রিলিজের বাইরে সেদিন আমাদের পত্রিকায় ছিল তাঁর এই তাৎক্ষণিক ও এই ঘটনা কেন্দ্রিক প্রথম নেওয়া ইন্টারভিউ। এর পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাধ্য হয় তাঁকে দেশে ফেরত আসতে দিতে। ৭ মে ২০০৭-এ তিনি দেশে ফিরে আসেন।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 


















