মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে অনেকে কেবল ভূরাজনীতির সংঘাত হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বাস্তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে অর্থনীতিতে—বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বাড়ছে, সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য পর্যন্ত সবকিছুতে চাপ তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধের গোলাগুলি হয়তো সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক কম্পন পৌঁছে যায় হাজার মাইল দূরের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত।
বর্তমান সংকট আবারও দেখিয়ে দিল, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তেল এখনো কেবল একটি পণ্য নয়; এটি ক্ষমতা, কূটনীতি এবং নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা শুধু জ্বালানি বাজার নয়, গোটা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে সেখানে সামান্য অচলাবস্থাও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
এই সংকট সবচেয়ে বেশি উন্মোচন করেছে এশিয়ার জ্বালানি-নির্ভরতার দুর্বলতা। চীন, ভারত, জাপান কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশ বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভর করে নিজেদের শিল্প ও অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখিয়ে দিল, বিকল্প জ্বালানি কৌশল ছাড়া এই নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে গোটা অঞ্চলকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি কিংবা নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনের প্রশ্ন এখন আর পরিবেশবাদী আলোচনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েক মাসে দেশটিতে জ্বালানির মূল্য যেভাবে বেড়েছে, তা শুধু ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেনি, বরং পুরো অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্তে চলা একটি দুর্বল অর্থনীতির জন্য এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি মারাত্মক। কারণ তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির জ্বালানি ব্যয় বাড়ে না; বাড়ে শিল্প উৎপাদনের খরচ, কৃষি ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের মূল্যও।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সংকটের বড় অংশই বহু বছরের নীতিগত ব্যর্থতার ফল। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে পরিবহন খাতকে। পাকিস্তানের মতো দেশে এখনো কার্যকর রেলভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে পণ্য পরিবহন পুরোপুরি ডিজেলনির্ভর সড়ক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ডিজেলের দাম বাড়লেই সরাসরি বাড়ে বাজারমূল্য। একইভাবে শিল্প খাতও নির্ভরশীল ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর। বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে বহু শিল্পকারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সময়মতো বিনিয়োগ করা হলে এই চাপ অনেকটাই কমানো যেত।
কৃষি খাতেও একই বাস্তবতা। ট্রাক্টর, সেচযন্ত্র, ফসল কাটার মেশিন—সবকিছুতেই জ্বালানির ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা মানেই কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং তার সরাসরি প্রভাব খাদ্যদ্রব্যের দামে। যুদ্ধের কারণে সার সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এতে নতুন করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী।
রপ্তানি খাতও এই সংকটে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে। যখন প্রতিবেশী দেশগুলো তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে, তখন উচ্চ জ্বালানি ব্যয় পাকিস্তানি পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে দিচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সুদের হারও বেশি রাখতে হচ্ছে, ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবে এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো এর সামাজিক বৈষম্য। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ বহন করছে সাধারণ মানুষ, কিন্তু নীতিগত ভুলের দায় বহন করছে না ক্ষমতাবান গোষ্ঠী। দুর্বল গণপরিবহন, অদক্ষ রাষ্ট্রীয় ব্যয়, কর ব্যবস্থার বৈষম্য এবং এলিটকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে বোঝা গিয়ে পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের কাঁধে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স কমে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আদৌ আছে কি না। বহু বছর ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি সাময়িকভাবে বিশ্ববাজারকে নাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যে দেশ বিকল্প জ্বালানি, দক্ষ অবকাঠামো এবং বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারে বিনিয়োগ করবে, তারাই টিকে থাকবে।
সমস্যা হলো, পুরোনো ধাঁচের নীতিনির্ধারণ এখনো অনেক রাষ্ট্রে এতটাই প্রভাবশালী যে প্রতিটি সংকটের পরও তারা কাঠামোগত পরিবর্তনের বদলে সাময়িক সমাধানের পথেই হাঁটে। অথচ বর্তমান তেল সংকট স্পষ্ট করে দিয়েছে—এটি শুধু যুদ্ধের অভিঘাত নয়, বরং বহু বছরের অর্থনৈতিক অবহেলা ও নীতিগত অদূরদর্শিতারও ফল।
হারুন শরিফ 



















