( লেখক সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী)
ব্রিটেনের রাজনীতি আবারও এক অদ্ভুত চক্রে ঢুকে পড়েছে। সরকার চলছে, কিন্তু যেন পুরোপুরি কাজ করছে না। মন্ত্রীরা টিকে থাকার হিসাব কষছেন, এমপিরা সংখ্যার অঙ্ক মিলাচ্ছেন, আর বাজার অপেক্ষা করছে—পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? এই দৃশ্য শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত নয়; এটি ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার গভীর দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
এক সময় ব্রিটেনের সংসদীয় কাঠামোর বড় শক্তি ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। নির্বাচনে স্পষ্ট জয় মানে ছিল শক্তিশালী সরকার, আর শক্তিশালী সরকার মানে বড় নীতিগত পদক্ষেপ। কিন্তু এখন সেই সুবিধা যেন উধাও হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম চাপ, দলীয় ষড়যন্ত্রের সংস্কৃতি এবং প্রতিদিনের জনমত জরিপের রাজনীতি নেতৃত্বকে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরিয়ে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার খেলায় পরিণত করেছে।
এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে নীতির জায়গায় শূন্যতা তৈরি হওয়া। নির্বাচনে জয় পাওয়া এখন অনেক ক্ষেত্রেই “অন্যদের চেয়ে কম খারাপ” প্রমাণ করার প্রতিযোগিতা। কিন্তু সরকার পরিচালনা শুধুমাত্র প্রতিপক্ষকে হারানোর দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ক্ষমতায় আসার পর একটি সরকারকে জানতে হয়—অর্থনীতি কোথায় যাবে, রাষ্ট্রের আকার কী হবে, করব্যবস্থা কীভাবে চলবে, এবং নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির সীমা কোথায়।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর খুব কমই দেখা গেছে। নির্বাচনী কৌশল এতটাই বার্তানির্ভর হয়ে উঠেছে যে বড় দলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই কঠিন নীতিগত বিতর্ক এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলাফল হলো, ক্ষমতায় এসে তারা নিজেদেরই তৈরি করা অস্পষ্টতার মধ্যে আটকে পড়ছে। জনসমর্থন থাকলেও কার্যকর সংস্কারের জন্য যে রাজনৈতিক ম্যান্ডেট দরকার, তা আর তৈরি হয় না।
এই সংকটের আরেকটি দিক আরও উদ্বেগজনক। নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রতিটি লড়াই ধীরে ধীরে বাস্তব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। দলীয় কর্মী বা সমর্থকদের মন জয় করতে গিয়ে নেতারা এমন সব প্রতিশ্রুতি দেন, যা বাজার, বিনিয়োগ বা রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে খাপ খায় না। একসময় কনজারভেটিভ পার্টি বিশ্বাস করেছিল, বড় করছাড় নিজেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তৈরি করবে এবং শেষ পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতিও পূরণ হবে। বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজার আস্থা হারিয়েছিল, ঋণের খরচ বেড়েছিল, মুদ্রার ওপর চাপ পড়েছিল, আর সরকারকে দ্রুত পিছু হটতে হয়েছিল।

এখন একই ধরনের ঝুঁকি অন্য দিক থেকেও দেখা যাচ্ছে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে যে অবিরাম ঋণ নিয়ে প্রবৃদ্ধি তৈরি করা সম্ভব, অথবা ধনীদের ওপর বাড়তি কর চাপিয়েই দীর্ঘমেয়াদে বিপুল সরকারি ব্যয় বহন করা যাবে, তাহলে তারা অর্থনীতির বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে। একইভাবে ব্যবসার ওপর ক্রমাগত অতিরিক্ত ব্যয় চাপিয়ে দিয়ে আবার কর্মসংস্থান অক্ষুণ্ণ থাকবে—এমন ধারণাও বিপজ্জনক সরলীকরণ।
সমস্যা হলো, ব্রিটেন এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে যখন কঠিন সিদ্ধান্ত এড়ানোর সুযোগ খুব কম। প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর চাপ রয়েছে। স্বাস্থ্য ও কল্যাণ খাতে বিপুল সরকারি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জনসংখ্যার পরিবর্তন রাষ্ট্রের ব্যয় আরও বাড়াবে। কিন্তু রাজনীতিতে এখনও এমন ভাষা খুব কম শোনা যায়, যা জনগণকে বাস্তব চিত্রটি স্পষ্ট করে বলতে প্রস্তুত।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা তাই কেবল অর্থনীতিবিদদের বিষয় নয়; এটি এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। যখন মানুষ মনে করে তাদের জীবনমান উন্নত হচ্ছে না, তখন তারা মূলধারার রাজনীতির বাইরে বিকল্প খুঁজতে শুরু করে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী ও বামপন্থী প্রতিবাদী রাজনীতির উত্থান সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। ব্রিটেনও এর বাইরে নয়।
কিন্তু ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া সহজ হলেও একটি জটিল অর্থনীতি চালানো অনেক কঠিন কাজ। জনপ্রিয় স্লোগান দিয়ে সাময়িক উচ্ছ্বাস তৈরি করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় কঠিন অঙ্ক কষে। সেই অঙ্কে কখনও কর বাড়াতে হয়, কখনও ব্যয় কমাতে হয়, কখনও আবার নাগরিকদের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার সমঝোতা করাতে হয়।
আজকের ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় অভাব সম্ভবত সেখানেই। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা চলছে, কিন্তু দেশের সামনে থাকা প্রকৃত সংকট নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব কম। কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—তিনি জনগণকে সত্য কথা বলার সাহস রাখবেন কি না।
ঋষি সুনাক 


















