অভিনেতা আতাউর রহমান, একজন নাট্য আন্দোলনের আতাউর রহমান, একজন বাঙালি সংস্কৃতি বিনির্মাণের পথিক আতাউর রহমান- কখনও মারা যান না। তিনি শুধু পৃথিবী থেকে চলে গেছেন কালের নিয়মে। হয়তো সময় বা দেশের পরিবেশ যদি সুস্থ মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুকূলে থাকত তিনি আরও কিছু দিন বেঁচে থাকতেন।
আতাউর রহমানের এই প্রয়াণকে স্মরণ করে তাঁর অভিনয় নিয়ে বাস্তবে বিশ্লেষণ করার কিছু নেই। কারণ, তিনি তাঁর প্রতিটি অভিনয়ের ভেতর দিয়েই তা প্রকাশ করে গেছেন।
বাংলাদেশ এমন একটা দেশ- সবাই যে মৃত্যুর পরে তার যোগ্য সম্মান রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাবেন তা আশা করা যায় না। কবি সুফিয়া কামাল মারা যাওয়ার পরে সাত দিন রাষ্ট্র শোক পালন করেছিল। কিন্তু কবি শামসুর রাহমান বাঙালি সংস্কৃতির এমন একটি দুঃসময়ে মারা যান, তাঁকে স্মরণ সীমাবদ্ধ ছিল শুধু গুটি কয়েক মানুষের মধ্যে।

এই নদী জলে ঘেরা সহজিয়া বাংলাদেশে যে বাঙালি সংস্কৃতি ষাটের দশক থেকে বেড়ে উঠেছিল তাতে আজ আতাউর রহমান মারা গেলে শোকের মিছিল নামার কথা তার শবদেহ নিয়ে। কিন্তু যেখানে বাঙালি সংস্কৃতি নিজেই অনেকটা অন্তর্জলী যাত্রায় সেখানে আতাউর রহমানের জন্য শোক মিছিল কে আশা করতে পারে?
বরং এই বঙ্গে এখন কবি আবুল হাকিম যাদের কথা বলেছিলেন, “সেসবে কাহার জন্মে” তাদের জন্ম এত বেশি ঘটেছে- যে সোশ্যাল ফোরামে বাঙালি সংস্কৃতি বিনির্মাণের এই নাট্যজন, এই অভিনেতাকে নিয়েও তারা ট্রল করে।
এগুলো অবশ্য আতাউর রহমানের দুর্ভাগ্য নয়, দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির। শুধু দুর্ভাগ্য নয়- এ এক অশনিসংকেত। কারণ, সংস্কৃতি মারা গেলে ওই জাতির বাদবাকি অন্যকিছু কতদিন বেঁচে থাকে তা অনেক বড় প্রশ্ন রেখে যায়!
আতাউর রহমানের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো ছাড়া এ মুহূর্তে কারও কিছুই করার নেই। তার পরেও আশা শুধু ছলনা নয়, আশা সত্যও। ঠিকই কোনো এক প্রজন্ম এসে তাদের আত্মপরিচয়ের পক্ষের এই সংগ্রামী ও গুণী অভিনেতাকে ঠিকই স্মরণ করবে। মানবসভ্যতার ইতিহাসও যেমন দীর্ঘ- এর পথে পথে তেমনি আলো-আঁধারের খেলাও বড় বেশি।
আতাউর রহমানকে স্মরণ করে বলা যায়, তুমি ঠিক যেভাবে রক্তকরবীতে অভিনয় করেছিলে, একটি অদৃশ্য শেকলকে চেনাতে, তেমনি একটা বাস্তব জীবন নিয়ে তোমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা আজ পড়ে আছে। কেবল তুমি শুধু নেই।
সম্পাদকের টেবিল 


















