০৭:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
ছোলার সালাদেই কি বদলে যাবে গ্রীষ্মের টেবিলের চেনা স্বাদ? মরক্কোতে নিখোঁজ মার্কিন সেনার মরদেহ উদ্ধার, শেষ হলো দীর্ঘ অনুসন্ধান অভিযান ট্রাম্প যুগের রাজনীতি, ব্রিটেনের সংকট ও আমেরিকার নতুন বিভাজন থাইল্যান্ডের শেয়ারবাজারে বড় পরিবর্তন, কড়াকড়ি বাড়ছে স্বল্পমেয়াদি লেনদেনে ভারতের শিক্ষাবিপ্লব: এআই যুগে বহুভাষিক দক্ষতায় গড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দৌড়ে বিপুল বিনিয়োগে আলিবাবা-টেনসেন্ট কানাডার বিনিয়োগে ফিলিপাইনে নতুন অর্থনৈতিক করিডর, বাড়ছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় জোট মধ্যবিত্তের ভরসা এখন ভ্যানের বাজার, বদলে যাচ্ছে ঢাকার কেনাকাটার সংস্কৃতি নিত্যপণ্যে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা, বাড়তে পারে চাল-ডাল-তেলের দাম প্রজন্ম বদলের বার্তা দিয়ে কেরালায় কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন ভি ডি সতীশান

ঢাকার শিশুদের দিনে প্রায় ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে আসক্তি, বাড়ছে ঘুমের সমস্যা ও মানসিক ঝুঁকি

ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা, চোখের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি। প্রতিষ্ঠানটির নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজধানীর অধিকাংশ শিশু আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি সময় মোবাইল, ট্যাব, টেলিভিশন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসে কাটাচ্ছে।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ছিল। গবেষণাটি সম্প্রতি জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ হিউম্যান ফ্যাক্টরসে প্রকাশিত হয়েছে।

স্ক্রিন ব্যবহারে উদ্বেগজনক চিত্র

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজনের বেশি প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে। অথচ শিশুদের জন্য বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের আন্তর্জাতিকভাবে সুপারিশকৃত সীমা প্রায় দুই ঘণ্টা। বাস্তবে ঢাকার শিশুরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন ও গেমিং ডিভাইসে সময় কাটাচ্ছে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অংশগ্রহণকারী শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি চোখের সমস্যায় ভুগছে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার অভিযোগ করেছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যারও সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের গড়ে রাতে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুম হয়, যা তাদের বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার চেয়ে কম।

স্থূলতা ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি

গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের প্রায় ১৪ শতাংশ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে এই হার আরও বেশি দেখা গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়া প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুইজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে উদ্বেগ, অতিচঞ্চলতা, আচরণগত জটিলতা ও মানসিক অস্থিরতা উল্লেখযোগ্য। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত ডিজিটাল উদ্দীপনা ও মুখোমুখি সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণেও শিশুদের মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অভিভাবকদের জন্য সতর্কবার্তা

গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেছেন, শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, চোখে অস্বস্তি, মাথাব্যথা, খিটখিটে আচরণ, বাইরে খেলাধুলায় অনাগ্রহ বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাবের ইঙ্গিত হতে পারে।

গবেষকরা শিশুদের চোখের সুরক্ষায় “২০-২০-২০” নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে তাকাতে হবে।

আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমীদ আহমেদ বলেছেন, প্রযুক্তি এখন আধুনিক জীবন ও শিক্ষার অংশ হলেও শিশুদের জন্য সুস্থ সীমা নির্ধারণ জরুরি। তিনি অভিভাবকদের শিশুদের খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও পরিবারকেন্দ্রিক সময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিতর্ক, দলীয় পাঠচক্র, লাইব্রেরি ব্যবহার ও গাছের পরিচর্যার মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমেও শিশুদের যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

গবেষকদের মতে, প্রযুক্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়, বরং শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ছোলার সালাদেই কি বদলে যাবে গ্রীষ্মের টেবিলের চেনা স্বাদ?

ঢাকার শিশুদের দিনে প্রায় ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে আসক্তি, বাড়ছে ঘুমের সমস্যা ও মানসিক ঝুঁকি

০৩:৩১:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা, চোখের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি। প্রতিষ্ঠানটির নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজধানীর অধিকাংশ শিশু আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি সময় মোবাইল, ট্যাব, টেলিভিশন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসে কাটাচ্ছে।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ছিল। গবেষণাটি সম্প্রতি জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ হিউম্যান ফ্যাক্টরসে প্রকাশিত হয়েছে।

স্ক্রিন ব্যবহারে উদ্বেগজনক চিত্র

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজনের বেশি প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে। অথচ শিশুদের জন্য বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের আন্তর্জাতিকভাবে সুপারিশকৃত সীমা প্রায় দুই ঘণ্টা। বাস্তবে ঢাকার শিশুরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন ও গেমিং ডিভাইসে সময় কাটাচ্ছে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অংশগ্রহণকারী শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি চোখের সমস্যায় ভুগছে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার অভিযোগ করেছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যারও সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের গড়ে রাতে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুম হয়, যা তাদের বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার চেয়ে কম।

স্থূলতা ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি

গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের প্রায় ১৪ শতাংশ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে এই হার আরও বেশি দেখা গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়া প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুইজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে উদ্বেগ, অতিচঞ্চলতা, আচরণগত জটিলতা ও মানসিক অস্থিরতা উল্লেখযোগ্য। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত ডিজিটাল উদ্দীপনা ও মুখোমুখি সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণেও শিশুদের মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অভিভাবকদের জন্য সতর্কবার্তা

গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেছেন, শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, চোখে অস্বস্তি, মাথাব্যথা, খিটখিটে আচরণ, বাইরে খেলাধুলায় অনাগ্রহ বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাবের ইঙ্গিত হতে পারে।

গবেষকরা শিশুদের চোখের সুরক্ষায় “২০-২০-২০” নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে তাকাতে হবে।

আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমীদ আহমেদ বলেছেন, প্রযুক্তি এখন আধুনিক জীবন ও শিক্ষার অংশ হলেও শিশুদের জন্য সুস্থ সীমা নির্ধারণ জরুরি। তিনি অভিভাবকদের শিশুদের খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও পরিবারকেন্দ্রিক সময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিতর্ক, দলীয় পাঠচক্র, লাইব্রেরি ব্যবহার ও গাছের পরিচর্যার মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমেও শিশুদের যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

গবেষকদের মতে, প্রযুক্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়, বরং শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।