কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির যুগে বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ১৪০ কোটির দেশ ভারত শিশুদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বহুভাষিক শিক্ষা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এনেছে। দেশটির নতুন শিক্ষা নীতি এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে এখন স্পষ্টভাবে উঠে আসছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির পরিকল্পনা।
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের উপস্থিতি অনেকের নজর কাড়ছে। গুগলের সুন্দর পিচাই, মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা কিংবা আইবিএমের অরবিন্দ কৃষ্ণের মতো ব্যক্তিত্বদের উদাহরণ সামনে এনে এখন প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল কাকতালীয়, নাকি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতির ফল?
বহুভাষিক শিক্ষায় জোর
নয়াদিল্লির অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরদার প্যাটেল বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ১৮ বছর বয়সের মধ্যে অন্তত চারটি ভাষায় দক্ষ করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়টির অধ্যক্ষ অনুরাধা যোশীর ভাষ্য, ভারতের মতো বহু ভাষা ও সংস্কৃতির দেশে নেতৃত্ব গড়ে তুলতে অন্যকে বোঝার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই দক্ষতার ভিত্তি তৈরি হয় ভাষা শিক্ষার মধ্য দিয়ে।
বিদ্যালয়টিতে একই ক্যাম্পাসে তিন বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বড় হওয়ার সুযোগ পায়। শিশুদের একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়াকেও শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষকদের মতে, ছোটবেলা থেকেই একে অন্যের পার্থক্যকে বুঝে নেওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন তৈরি হয়।
শুধু পাঠ্যবই নয়, আচরণও মূল্যায়নের অংশ
ভারতের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের সামাজিক আচরণ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরদার প্যাটেল বিদ্যালয়ে তিন বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও মূল্যায়ন করা হয় তারা বিপদে থাকা সহপাঠীকে কীভাবে সাহায্য করে বা সমস্যা মোকাবিলায় কী ধরনের আচরণ করে।
বিদ্যালয়টির কর্মকর্তাদের মতে, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সহানুভূতিশীল ও অভিযোজনক্ষম করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে তারা বৈচিত্র্যময় সমাজে সহজে মানিয়ে নিতে শেখে। একই সঙ্গে ভাষা শিক্ষাও ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হয়।

নতুন শিক্ষা নীতিতে বড় পরিবর্তন
২০২০ সালে ভারত সরকার প্রায় তিন দশক পর জাতীয় শিক্ষানীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আনে। নতুন নীতি ‘ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি ২০২০’-এ বহুভাষিক শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দুই থেকে আট বছর বয়সের মধ্যে শিশুরা খুব দ্রুত ভাষা শেখে এবং বহুভাষিক শিক্ষা তাদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই নীতির আওতায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো আঞ্চলিক ভাষার শিক্ষক নিয়োগ ও প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে শিশুদের খুব অল্প বয়স থেকেই ইংরেজি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করা হচ্ছে।
শিশুদের আত্মবিশ্বাস গড়ার লড়াই
গুজরাটের গোটা এলাকায় অবস্থিত অ্যাপোলো জুনিয়র্স নামের একটি কিন্ডারগার্টেনে দুই বছর বয়স থেকেই শিশুদের ত্রিভাষিক শিক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা নিয়মিত সহপাঠীদের সামনে ইংরেজিতে বক্তব্য দেয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, আত্মবিশ্বাস তৈরি করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
শিশুদের অভিভাবকদের মধ্যেও এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ইউরোমনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে শিক্ষাখাতে পরিবারের বার্ষিক ব্যয় ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ৫৩ শতাংশ বেড়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এআই যুগের প্রস্তুতি
ভারতে বর্তমানে ১৭ বছরের নিচে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪০ কোটির বেশি। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে এআই যুগের উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে দেশটি। নতুন শিক্ষা নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শিশুর মস্তিষ্কের ৮৫ শতাংশের বেশি বিকাশ ছয় বছর বয়সের আগেই সম্পন্ন হয়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের শিক্ষা দর্শনে এখন শুধু মানবসম্পদ তৈরি নয়, বরং মানবিক বুদ্ধিমত্তাকে আরও উন্নত করার একটি বড় জাতীয় পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার সমন্বয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ভারতকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















