ভারতের প্রথম সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কারখানা চালুর প্রস্তুতি যখন শেষ পর্যায়ে, তখনই সামনে এসেছে বড় এক চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, পুরোনো প্রজন্মের বা ‘ম্যাচিউর-নোড’ চিপ উৎপাদনে চীনের দ্রুত বিস্তার ভারতের নতুন সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য বড় চাপ তৈরি করতে যাচ্ছে। বিশেষ করে টাটা ইলেকট্রনিক্সের নতুন ফ্যাব যেসব বাজারকে লক্ষ্য করছে, ঠিক সেই বাজারেই চীনের আধিপত্য বাড়ছে।
গুজরাটের ঢোলেরায় টাটা ইলেকট্রনিক্স ও তাইওয়ানের পাওয়ারচিপ সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের এই কারখানায় চলতি বছরের শেষ দিকে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে। তখন প্রতি মাসে ৫০ হাজার সিলিকন ওয়েফার এবং বছরে প্রায় ১২০ কোটি চিপ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বাজারের তুলনায় এটি এখনও খুব সীমিত। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেমিআ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক শ্রাবণ কুন্দোজ্জালা বলেছেন, এই কারখানা দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম পূরণ করতে পারবে। অন্যদিকে চীন বহু আগেই পুরোনো প্রজন্মের চিপ উৎপাদনে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করেছে।
চীনের বাড়তি চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে উন্নতমানের এআই চিপ উৎপাদনে বাধার মুখে পড়েছে চীনা কোম্পানিগুলো। ফলে তারা এখন গাড়ি, শিল্পযন্ত্র ও ভোক্তা পণ্যে ব্যবহৃত পুরোনো প্রযুক্তির চিপ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছে। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনের ম্যাচিউর-নোড চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির গড় হারের তুলনায় চার গুণ দ্রুত বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী কয়েক বছরে নতুন উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই চীনা কোম্পানিগুলোর হাতে যেতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ বা ট্যাবলেটের মতো বাজারে প্রবেশ করলে ভারতের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। কারণ সেখানে দাম কমানোর প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। এর আগে একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, চীনা কোম্পানিগুলো বাজারদরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম দামে চিপ সরবরাহ করতে সক্ষম।

বাণিজ্যের বাইরে কৌশলগত গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের এই প্রকল্প শুধু ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়, বরং কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক উত্তেজনা এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কারণে অনেক দেশ এখন বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় ভারত।
প্রযুক্তি নীতিবিষয়ক গবেষক প্রণয় কোটাস্থানের মতে, ভারতের প্রথম ফ্যাব মূলত পুরো সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেমের জন্য একটি ‘প্রুফ অব কনসেপ্ট’। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি অংশীদার ও সরকার ভবিষ্যতের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।
এদিকে চীন যেখানে সেমিকন্ডাক্টর খাতে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সরকারি সহায়তা দিয়েছে, সেখানে ভারতের ‘ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন’-এর বরাদ্দ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। এখন পর্যন্ত অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পের বেশিরভাগই অ্যাসেম্বলি ও প্যাকেজিং খাতে সীমাবদ্ধ।
দীর্ঘ পথের শুরু
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বড় পরিসরে সফল উৎপাদনের সক্ষমতা প্রমাণ করা। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ভরযোগ্য সাপ্লাই চেইন অংশীদার হতে দেশটির আরও অন্তত এক দশক সময় লাগতে পারে। তবুও ইন্টেল ও বোশের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টাটার প্রাথমিক সমঝোতা ভবিষ্যতে চাহিদা তৈরি করতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারত এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প শুধু প্রযুক্তি বা ব্যবসার প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কৌশলগত অবস্থানেরও বড় অংশ হয়ে উঠেছে। চীনের প্রবল প্রতিযোগিতার মধ্যেও তাই দেশটি নিজেদের শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















