০৯:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শিথিলতা: বাণিজ্য অর্থায়নে বাড়ল ঋণসীমা কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন ভি ডি সতীশন, ১৮ মে শপথের সম্ভাবনা পাকিস্তানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাতাহ-৪’ সফল পরীক্ষা, পাল্লা ও নিখুঁত আঘাতের সক্ষমতার দাবি বেইজিং বৈঠকে ইরান ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে ব্রিকসের জোরালো অবস্থান চাইল তেহরান মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায় এল নিনোর শঙ্কায় ফের গম কেনায় ঝুঁকছে এশিয়া, বাড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা চীনের সস্তা চিপের চাপে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন, টাটার নতুন ফ্যাবের সামনে কঠিন লড়াই অভিনেত্রী নীনা ওয়াদিয়া: ‘আমাদের বাড়ির সব দেয়াল ছিল হলুদ, যেন একটা লেবু’

মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা যখন যুদ্ধের কিনারা ছুঁয়ে যাচ্ছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আলোচনার প্রশ্নটি এখন আর শুধু এই নয় যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা আদৌ সম্ভব কি না। বরং আসল প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে—কে সেই আলোচনার মঞ্চ তৈরি করবে, কে হবে গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী, আর শেষ পর্যন্ত কে এই সংকটকে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করতে পারবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ঘিরে দ্বৈত কৌশল অনুসরণ করেছে। একদিকে হুমকি, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ; অন্যদিকে সম্ভাব্য আলোচনার ইঙ্গিত। এই দ্বৈত অবস্থান ইরানের দৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে বহু আগেই। তেহরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রসঙ্গকে প্রকৃত সমঝোতার জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যুদ্ধবিরতি কিংবা আলোচনার আভাস বাজারে প্রভাব ফেলে, তেলের দাম কমায়, আর ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি ‘রাজনৈতিক বেরিয়ে যাওয়ার পথ’ তৈরি করে।

এই পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হঠাৎ করেই কৌশলগত গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট শুধু দুই রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব নয়; এটি গোটা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া।

পাকিস্তানের উত্থান

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে। এর পেছনে কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং প্রতীকী ও কৌশলগত দুই ধরনের শক্তিই কাজ করছে।

পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ইসলামী বিশ্বে এই পরিচয় তাকে একটি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা দেয়। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তারা তেহরান ও ওয়াশিংটন—দুই পক্ষের সঙ্গেই কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে। এই ভারসাম্য খুব কম রাষ্ট্রের আছে।

তবে পাকিস্তানের আগ্রহ কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠার আদর্শিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানে অস্থিরতা বাড়লে পাকিস্তানের সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক ভারসাম্যের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। তাই ইসলামাবাদ জানে, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার মূল্য তাকেও দিতে হবে।

একই সময়ে পাকিস্তান নিজের আন্তর্জাতিক অবস্থানও বদলাতে চাইছে। একসময় যাকে নিছক যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ভারতের ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখা হতো, সেই পাকিস্তান এখন চীন, রাশিয়া ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার পথে হাঁটছে। এই পরিবর্তন ইরানের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তেহরান এমন কাউকে চায়, যে পুরোপুরি আমেরিকান প্রভাবাধীন নয়, আবার প্রকাশ্য শত্রুও নয়।

যদি পাকিস্তান এই আলোচনার ক্ষেত্র সফলভাবে তৈরি করতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হবে।

ওমানের প্রভাব কমেছে, কিন্তু শেষ হয়নি

দীর্ঘদিন ধরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র গোপন যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওমান ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মঞ্চ। ওমানের শক্তি ছিল তার নীরবতা, সংযম ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক দফার আলোচনা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। ফলে ওমানের একচ্ছত্র ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তবে এটিকে পুরোপুরি ব্যর্থতা বলা কঠিন। মূল সমস্যা ছিল ওয়াশিংটনের নীতিগত অসঙ্গতি। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার ভাষা ব্যবহার করেছে, অন্যদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। ফলে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।

ওমান এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন আর একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিকল্প নয়। এ কারণেই নতুন নতুন মধ্যস্থতাকারী সামনে চলে আসছে।

তুরস্কের হিসাব

তুরস্কের অবস্থান অন্য সবার চেয়ে আলাদা। ন্যাটোর সদস্য হয়েও আঙ্কারা নিজেকে পশ্চিমা জোটের নিছক অনুসারী হিসেবে দেখতে চায় না। আবার ইরানের সঙ্গেও তার বহুস্তরীয় সম্পর্ক রয়েছে।

তুরস্কের জন্য ইরান সংকট কোনো দূরের সমস্যা নয়। ইরানের অস্থিতিশীলতা মানে সীমান্ত অস্থিরতা, নতুন শরণার্থী সংকট, কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি। ফলে আঙ্কারার স্বার্থ সরাসরি জড়িত।

এই বাস্তবতা তুরস্ককে সম্ভাব্য কার্যকর মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত করেছে। কারণ তাদের শুধু যোগাযোগের সক্ষমতা নয়, বরং সমঝোতা সফল হওয়ার বাস্তব কৌশলগত প্রয়োজনও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জন্যও এমন একটি চুক্তি তুরস্কের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

মিশরের নীরব স্বার্থ

মিশরের নাম তুলনামূলক কম আলোচিত হলেও, কায়রোরও এই সংকটে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের নিরাপত্তা মিশরের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি গোষ্ঠী যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক চলাচল ব্যাহত করে, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সুয়েজ খালে। আর সুয়েজ থেকে আসা আয় মিশরের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

তাই কায়রো চায় উত্তেজনা দ্রুত কমুক। যদিও ইরানের সঙ্গে মিশরের সম্পর্ক উষ্ণ নয়, তবুও তা প্রকাশ্য বৈরিতায়ও পরিণত হয়নি। এই মধ্যবর্তী অবস্থান মিশরকে একটি গ্রহণযোগ্য অংশীদার করে তুলতে পারে।

মধ্যস্থতা এখন ক্ষমতার প্রশ্ন

বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পুরোনো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। একসময় যেখানে নির্দিষ্ট কয়েকটি রাষ্ট্রই আলোচনার প্রধান সেতুবন্ধন ছিল, এখন সেখানে বহু শক্তি একই সুযোগের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

কারণ মধ্যস্থতাকারী হওয়া মানে কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়। এর অর্থ হচ্ছে সংকট সমাধানের কাঠামো নির্ধারণের অধিকার অর্জন করা। যে রাষ্ট্র এই ভূমিকা নিতে পারবে, সে ভবিষ্যতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

এই কারণেই পাকিস্তান, তুরস্ক, ওমান কিংবা মিশর—সবাই কেবল শান্তির দূত নয়; তারা নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও পুনর্নির্মাণ করতে চাইছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সমঝোতা আদৌ হবে কি না, সেটি এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন শুধু যুদ্ধ বা শান্তির প্রশ্ন নয়; এটি একই সঙ্গে নেতৃত্ব, প্রভাব এবং নতুন আঞ্চলিক ক্ষমতার মানচিত্র তৈরির লড়াই।

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং

মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে?

০৯:১১:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা যখন যুদ্ধের কিনারা ছুঁয়ে যাচ্ছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আলোচনার প্রশ্নটি এখন আর শুধু এই নয় যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা আদৌ সম্ভব কি না। বরং আসল প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে—কে সেই আলোচনার মঞ্চ তৈরি করবে, কে হবে গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী, আর শেষ পর্যন্ত কে এই সংকটকে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করতে পারবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ঘিরে দ্বৈত কৌশল অনুসরণ করেছে। একদিকে হুমকি, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ; অন্যদিকে সম্ভাব্য আলোচনার ইঙ্গিত। এই দ্বৈত অবস্থান ইরানের দৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে বহু আগেই। তেহরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রসঙ্গকে প্রকৃত সমঝোতার জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যুদ্ধবিরতি কিংবা আলোচনার আভাস বাজারে প্রভাব ফেলে, তেলের দাম কমায়, আর ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি ‘রাজনৈতিক বেরিয়ে যাওয়ার পথ’ তৈরি করে।

এই পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হঠাৎ করেই কৌশলগত গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট শুধু দুই রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব নয়; এটি গোটা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া।

পাকিস্তানের উত্থান

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে। এর পেছনে কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং প্রতীকী ও কৌশলগত দুই ধরনের শক্তিই কাজ করছে।

পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ইসলামী বিশ্বে এই পরিচয় তাকে একটি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা দেয়। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তারা তেহরান ও ওয়াশিংটন—দুই পক্ষের সঙ্গেই কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে। এই ভারসাম্য খুব কম রাষ্ট্রের আছে।

তবে পাকিস্তানের আগ্রহ কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠার আদর্শিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানে অস্থিরতা বাড়লে পাকিস্তানের সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক ভারসাম্যের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। তাই ইসলামাবাদ জানে, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার মূল্য তাকেও দিতে হবে।

একই সময়ে পাকিস্তান নিজের আন্তর্জাতিক অবস্থানও বদলাতে চাইছে। একসময় যাকে নিছক যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ভারতের ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখা হতো, সেই পাকিস্তান এখন চীন, রাশিয়া ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার পথে হাঁটছে। এই পরিবর্তন ইরানের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তেহরান এমন কাউকে চায়, যে পুরোপুরি আমেরিকান প্রভাবাধীন নয়, আবার প্রকাশ্য শত্রুও নয়।

যদি পাকিস্তান এই আলোচনার ক্ষেত্র সফলভাবে তৈরি করতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হবে।

ওমানের প্রভাব কমেছে, কিন্তু শেষ হয়নি

দীর্ঘদিন ধরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র গোপন যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওমান ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মঞ্চ। ওমানের শক্তি ছিল তার নীরবতা, সংযম ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক দফার আলোচনা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। ফলে ওমানের একচ্ছত্র ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তবে এটিকে পুরোপুরি ব্যর্থতা বলা কঠিন। মূল সমস্যা ছিল ওয়াশিংটনের নীতিগত অসঙ্গতি। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার ভাষা ব্যবহার করেছে, অন্যদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। ফলে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।

ওমান এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন আর একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিকল্প নয়। এ কারণেই নতুন নতুন মধ্যস্থতাকারী সামনে চলে আসছে।

তুরস্কের হিসাব

তুরস্কের অবস্থান অন্য সবার চেয়ে আলাদা। ন্যাটোর সদস্য হয়েও আঙ্কারা নিজেকে পশ্চিমা জোটের নিছক অনুসারী হিসেবে দেখতে চায় না। আবার ইরানের সঙ্গেও তার বহুস্তরীয় সম্পর্ক রয়েছে।

তুরস্কের জন্য ইরান সংকট কোনো দূরের সমস্যা নয়। ইরানের অস্থিতিশীলতা মানে সীমান্ত অস্থিরতা, নতুন শরণার্থী সংকট, কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি। ফলে আঙ্কারার স্বার্থ সরাসরি জড়িত।

এই বাস্তবতা তুরস্ককে সম্ভাব্য কার্যকর মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত করেছে। কারণ তাদের শুধু যোগাযোগের সক্ষমতা নয়, বরং সমঝোতা সফল হওয়ার বাস্তব কৌশলগত প্রয়োজনও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জন্যও এমন একটি চুক্তি তুরস্কের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

মিশরের নীরব স্বার্থ

মিশরের নাম তুলনামূলক কম আলোচিত হলেও, কায়রোরও এই সংকটে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের নিরাপত্তা মিশরের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি গোষ্ঠী যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক চলাচল ব্যাহত করে, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সুয়েজ খালে। আর সুয়েজ থেকে আসা আয় মিশরের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

তাই কায়রো চায় উত্তেজনা দ্রুত কমুক। যদিও ইরানের সঙ্গে মিশরের সম্পর্ক উষ্ণ নয়, তবুও তা প্রকাশ্য বৈরিতায়ও পরিণত হয়নি। এই মধ্যবর্তী অবস্থান মিশরকে একটি গ্রহণযোগ্য অংশীদার করে তুলতে পারে।

মধ্যস্থতা এখন ক্ষমতার প্রশ্ন

বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পুরোনো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। একসময় যেখানে নির্দিষ্ট কয়েকটি রাষ্ট্রই আলোচনার প্রধান সেতুবন্ধন ছিল, এখন সেখানে বহু শক্তি একই সুযোগের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

কারণ মধ্যস্থতাকারী হওয়া মানে কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়। এর অর্থ হচ্ছে সংকট সমাধানের কাঠামো নির্ধারণের অধিকার অর্জন করা। যে রাষ্ট্র এই ভূমিকা নিতে পারবে, সে ভবিষ্যতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

এই কারণেই পাকিস্তান, তুরস্ক, ওমান কিংবা মিশর—সবাই কেবল শান্তির দূত নয়; তারা নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও পুনর্নির্মাণ করতে চাইছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সমঝোতা আদৌ হবে কি না, সেটি এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন শুধু যুদ্ধ বা শান্তির প্রশ্ন নয়; এটি একই সঙ্গে নেতৃত্ব, প্রভাব এবং নতুন আঞ্চলিক ক্ষমতার মানচিত্র তৈরির লড়াই।