০৯:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শিথিলতা: বাণিজ্য অর্থায়নে বাড়ল ঋণসীমা কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন ভি ডি সতীশন, ১৮ মে শপথের সম্ভাবনা পাকিস্তানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাতাহ-৪’ সফল পরীক্ষা, পাল্লা ও নিখুঁত আঘাতের সক্ষমতার দাবি বেইজিং বৈঠকে ইরান ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে ব্রিকসের জোরালো অবস্থান চাইল তেহরান মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায় এল নিনোর শঙ্কায় ফের গম কেনায় ঝুঁকছে এশিয়া, বাড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা চীনের সস্তা চিপের চাপে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন, টাটার নতুন ফ্যাবের সামনে কঠিন লড়াই অভিনেত্রী নীনা ওয়াদিয়া: ‘আমাদের বাড়ির সব দেয়াল ছিল হলুদ, যেন একটা লেবু’

মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায়

মিয়ানমারের সামরিক শাসন, জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম—এই তিন পক্ষকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘাত চলছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “বৈধতা” নিয়ে লড়াই। কে মিয়ানমারের প্রকৃত প্রতিনিধি, কার বক্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, আর কোন পরিচয় ব্যবহার করা হবে—এসব প্রশ্ন এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং তথ্যযুদ্ধেরও অংশ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি জাকার্তায় অবস্থিত মিয়ানমার দূতাবাস একটি আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত মতামত নিবন্ধ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সেখানে এনইউজির এক প্রতিনিধিকে “উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। সামরিক সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, এনইউজিকে তারা বহু আগেই “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফলে এমন পরিচয় ব্যবহার করা রাষ্ট্রের সার্বভৌম অবস্থানের বিরুদ্ধে যায় বলেই তারা মনে করে।

এই প্রতিক্রিয়া কেবল একটি কূটনৈতিক প্রতিবাদ নয়; এটি মিয়ানমার সংকটের গভীরে থাকা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। সামরিক সরকার জানে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাষা ও পরিচয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কী নামে ডাকা হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় রাজনৈতিক স্বীকৃতির সূচক হয়ে দাঁড়ায়। তাই “উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী” শব্দবন্ধটি তাদের কাছে কেবল একটি পরিচয় নয়, বরং বিকল্প ক্ষমতার কাঠামোকে বৈধতা দেওয়ার ইঙ্গিত।

সংবাদমাধ্যমের জন্য এখানেই তৈরি হয় জটিলতা। একটি স্বাধীন সংবাদপত্রের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন মত ও অবস্থান তুলে ধরা। কিন্তু একই সঙ্গে তাদেরকে এমন ভাষা ব্যবহার করতে হয়, যা তথ্যগতভাবে নির্ভুল এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কোনো বিরোধী গোষ্ঠী নিজেদের সরকার দাবি করলেই কি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাদের সরকারি পদবী ব্যবহার করবে? আবার উল্টোভাবে, কোনো সামরিক সরকার যদি বিরোধীদের “সন্ত্রাসী” আখ্যা দেয়, সেটি কি সংবাদমাধ্যম যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করবে? এই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর নেই।

মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—রাষ্ট্রের বৈধতা কি কেবল ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, নাকি জনগণের গ্রহণযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থনও সেখানে ভূমিকা রাখে? ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে দীর্ঘ অস্থিরতা, সংঘাত ও মানবাধিকার সংকট তৈরি হয়েছে। একই সময়ে এনইউজি আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও প্রায়ই দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

তবে সংবাদপত্রের প্রতি মিয়ানমার দূতাবাসের চিঠিতে আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। তারা “ভারসাম্যপূর্ণ সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত”, “ক্ষতি না করার নীতি” এবং “সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান” এর কথা বলেছে। এই ভাষা কূটনৈতিকভাবে পরিমিত হলেও এর ভেতরে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেন সামরিক সরকারের অবস্থানকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প শক্তিগুলোকে স্বীকৃতি না দেয়।

কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রত্যাশার মধ্যে এই টানাপোড়েন নতুন নয়। বিশ্বের বহু সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংবাদমাধ্যমকে একই ধরনের চাপে পড়তে হয়েছে। কোথাও বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে কী নামে ডাকা হবে, কোথাও নির্বাসিত সরকারকে কী মর্যাদা দেওয়া হবে—এসব প্রশ্ন প্রায়ই সংবাদকক্ষের সম্পাদকীয় বিতর্কে জায়গা করে নেয়।

মিয়ানমারের ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, আজকের বিশ্বে তথ্য ও বর্ণনাও ক্ষমতার অংশ। রাষ্ট্র শুধু ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেই বৈধতা ধরে রাখতে পারে না; আন্তর্জাতিক ভাষ্য ও সংবাদপ্রবাহের ওপরও প্রভাব রাখতে চায়। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে গিয়ে প্রায়ই কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়ে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সতর্কতা ও স্বচ্ছতা। সংবাদমাধ্যমকে এমন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যা তথ্যসম্মত, প্রাসঙ্গিক এবং পাঠককে বিভ্রান্ত না করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোকেও বুঝতে হবে, সমালোচনা বা ভিন্ন পরিচয় ব্যবহারের অর্থ সবসময় শত্রুতা নয়। উন্মুক্ত বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সংবেদনশীলতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং

মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায়

০৮:৫১:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

মিয়ানমারের সামরিক শাসন, জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম—এই তিন পক্ষকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘাত চলছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “বৈধতা” নিয়ে লড়াই। কে মিয়ানমারের প্রকৃত প্রতিনিধি, কার বক্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, আর কোন পরিচয় ব্যবহার করা হবে—এসব প্রশ্ন এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং তথ্যযুদ্ধেরও অংশ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি জাকার্তায় অবস্থিত মিয়ানমার দূতাবাস একটি আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত মতামত নিবন্ধ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সেখানে এনইউজির এক প্রতিনিধিকে “উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। সামরিক সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, এনইউজিকে তারা বহু আগেই “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফলে এমন পরিচয় ব্যবহার করা রাষ্ট্রের সার্বভৌম অবস্থানের বিরুদ্ধে যায় বলেই তারা মনে করে।

এই প্রতিক্রিয়া কেবল একটি কূটনৈতিক প্রতিবাদ নয়; এটি মিয়ানমার সংকটের গভীরে থাকা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। সামরিক সরকার জানে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাষা ও পরিচয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কী নামে ডাকা হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় রাজনৈতিক স্বীকৃতির সূচক হয়ে দাঁড়ায়। তাই “উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী” শব্দবন্ধটি তাদের কাছে কেবল একটি পরিচয় নয়, বরং বিকল্প ক্ষমতার কাঠামোকে বৈধতা দেওয়ার ইঙ্গিত।

সংবাদমাধ্যমের জন্য এখানেই তৈরি হয় জটিলতা। একটি স্বাধীন সংবাদপত্রের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন মত ও অবস্থান তুলে ধরা। কিন্তু একই সঙ্গে তাদেরকে এমন ভাষা ব্যবহার করতে হয়, যা তথ্যগতভাবে নির্ভুল এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কোনো বিরোধী গোষ্ঠী নিজেদের সরকার দাবি করলেই কি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাদের সরকারি পদবী ব্যবহার করবে? আবার উল্টোভাবে, কোনো সামরিক সরকার যদি বিরোধীদের “সন্ত্রাসী” আখ্যা দেয়, সেটি কি সংবাদমাধ্যম যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করবে? এই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর নেই।

মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—রাষ্ট্রের বৈধতা কি কেবল ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, নাকি জনগণের গ্রহণযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থনও সেখানে ভূমিকা রাখে? ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে দীর্ঘ অস্থিরতা, সংঘাত ও মানবাধিকার সংকট তৈরি হয়েছে। একই সময়ে এনইউজি আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও প্রায়ই দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

তবে সংবাদপত্রের প্রতি মিয়ানমার দূতাবাসের চিঠিতে আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। তারা “ভারসাম্যপূর্ণ সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত”, “ক্ষতি না করার নীতি” এবং “সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান” এর কথা বলেছে। এই ভাষা কূটনৈতিকভাবে পরিমিত হলেও এর ভেতরে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেন সামরিক সরকারের অবস্থানকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প শক্তিগুলোকে স্বীকৃতি না দেয়।

কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রত্যাশার মধ্যে এই টানাপোড়েন নতুন নয়। বিশ্বের বহু সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংবাদমাধ্যমকে একই ধরনের চাপে পড়তে হয়েছে। কোথাও বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে কী নামে ডাকা হবে, কোথাও নির্বাসিত সরকারকে কী মর্যাদা দেওয়া হবে—এসব প্রশ্ন প্রায়ই সংবাদকক্ষের সম্পাদকীয় বিতর্কে জায়গা করে নেয়।

মিয়ানমারের ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, আজকের বিশ্বে তথ্য ও বর্ণনাও ক্ষমতার অংশ। রাষ্ট্র শুধু ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেই বৈধতা ধরে রাখতে পারে না; আন্তর্জাতিক ভাষ্য ও সংবাদপ্রবাহের ওপরও প্রভাব রাখতে চায়। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে গিয়ে প্রায়ই কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়ে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সতর্কতা ও স্বচ্ছতা। সংবাদমাধ্যমকে এমন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যা তথ্যসম্মত, প্রাসঙ্গিক এবং পাঠককে বিভ্রান্ত না করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোকেও বুঝতে হবে, সমালোচনা বা ভিন্ন পরিচয় ব্যবহারের অর্থ সবসময় শত্রুতা নয়। উন্মুক্ত বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সংবেদনশীলতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।