দুই মাসেরও বেশি সময় অপেক্ষার পর আবারও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে গম কেনা শুরু করেছে এশিয়ার আটা ও ময়দা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র খরা এবং এল নিনোর কারণে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াজুড়ে শুষ্ক আবহাওয়ার পূর্বাভাস বৈশ্বিক গম সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে ভবিষ্যতে বাজার আরও অস্থির হওয়ার আশঙ্কায় এখন থেকেই গম আমদানিতে সক্রিয় হচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো।
বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম আমদানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়ার মিলাররা গত সপ্তাহে অন্তত দেড় লাখ টন কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের নতুন মৌসুমের গম কেনার চুক্তি করেছে। এসব চালান জুলাই মাসে সরবরাহ করা হবে। একই সময়ে থাইল্যান্ডের মিলাররাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার টন গম কিনেছে।
এ ছাড়া মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের ক্রেতারাও নতুন করে গম কেনার বিষয়ে বাজারে অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সিঙ্গাপুরভিত্তিক কয়েকজন ব্যবসায়ী।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই অধিকাংশ আমদানিকারক দেশ বাজার থেকে দূরে অবস্থান করছিল। যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এখন ক্রেতারা আবারও বাজারে ফিরছেন।
একজন সিঙ্গাপুরভিত্তিক ব্যবসায়ী বলেন, ক্রেতারা আশা করেছিলেন পরিবহন ব্যয় কমবে এবং গমের দাম স্থিতিশীল হবে। কিন্তু বাস্তবে দাম আরও বেড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটেরও কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না। বরং আবহাওয়াজনিত ঝুঁকির কারণে সামনে দাম আরও বাড়তে পারে।
চলতি বছরে শিকাগো গমের বেঞ্চমার্ক মূল্য ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা ২০১০ সালের পর সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন। এর আগে টানা কয়েক বছর বিশ্বজুড়ে রেকর্ড উৎপাদনের কারণে গমের দাম তুলনামূলক কম ছিল।
কৃষ্ণসাগরীয় গমে ঝুঁকছে এশিয়া
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক মিলিং প্রতিষ্ঠানের ক্রয় ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্ট সময়ের জন্য তারা গম কিনছেন এবং বর্তমানে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকেই সবচেয়ে কম দামে গম পাওয়া যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার গমের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজছেন।
বর্তমানে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রোটিনসমৃদ্ধ কৃষ্ণসাগরীয় গম ইন্দোনেশিয়ায় প্রতি টন প্রায় ২৮০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই ধরনের গমের দাম ছিল ২৫০ থেকে ২৬০ ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ান প্রিমিয়াম হোয়াইট গমের দাম এখন প্রতি টন ৩০৫ থেকে ৩১০ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ২৭০ থেকে ২৮০ ডলারের মধ্যে।
একজন ইউরোপীয় ব্যবসায়ী জানান, এশিয়ার বাজারে কৃষ্ণসাগরীয় গম এখনও মূল্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। ফলে ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্রয় আগ্রহ বেড়েছে।
খরা ও এল নিনোর বাড়তি চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, তীব্র খরার কারণে দেশটিতে এবার ১৯৭২ সালের পর সবচেয়ে কম গম উৎপাদন হতে পারে। বিশেষ করে হার্ড রেড উইন্টার গমের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানির প্রভাবে তৈরি হওয়া এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া সৃষ্টি করে, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের হিসাবে, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্ব গম উৎপাদন দাঁড়াতে পারে ৮১ কোটি ৯১ লাখ টনে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দুই কোটি ৪৮ লাখ টন কম। টানা সাত বছরের রেকর্ড উৎপাদনের পর এবারই প্রথম বড় ধরনের পতনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে এখনই বাজারে আতঙ্ক ছড়ায়নি। কারণ বিশ্ববাজারে এখনও পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং রাশিয়ায় ভালো ফসল উঠছে। তবু ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে। সে কারণে অনেক কৃষক এখনই মজুত ধরে রাখছেন।
এল নিনোর শঙ্কায় এশিয়ায় গম আমদানি বাড়ছে, বৈশ্বিক বাজারে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এল নিনো ও বৈশ্বিক গম সংকট
এশিয়াজুড়ে গমের দাম বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের খরা ও এল নিনোর আশঙ্কায় সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এল নিনোর প্রভাবে গম বাজারে নতুন চাপ, আমদানি বাড়াচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















