০৮:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
হামের মহামারী: “শিশু হত্যায় কাঁপিছে বসুন্ধরা” হঠাৎ কোটিপতি হওয়ার মানসিক চাপ, নতুন ধনী শ্রেণির অদৃশ্য সংকট কান মঞ্চে শাড়ির নতুন রূপ: আলিয়া ভাটের ইন্দো-ওয়েস্টার্ন লুকে ঝড় যখন আকাশ মেঘলা  হরমুজের লড়াই: জ্বালানি পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন ভূরাজনৈতিক সংঘাত চীনা গাড়ির সামনে আমেরিকার দেয়াল কতদিন টিকবে আল-কায়েদার ছায়া কি আবার বিশ্বকে তাড়া করছে? লেবার পার্টির পুরোনো জোট ভেঙে গেছে, স্টারমার একা এর সমাধান নন স্টারমারের নেতৃত্বে চাপে ব্রিটিশ লেবার পার্টি, ভাঙনের আশঙ্কায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ আফ্রিকার একাধিক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ

হামের মহামারী: “শিশু হত্যায় কাঁপিছে বসুন্ধরা”

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রখ্যাত বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ইউএনবি একটি পরিবারের হাম রোগে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে একটি নিউজ ও তার সঙ্গে একটা ছবি প্রকাশ করে। ছবিতে শুষ্ক মুখের একটি তরুণ তার হাতে ধরা একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারতার পাশে মায়ের কোলে নাকে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো শিশুটিমায়ের চোখে জল আর পেছনে অনেকটা ভেঙে পড়া একজন পুরুষ। তার পরিচয় লেখা হয়নিতবে মুখ বলে দেয় তিনি শিশুটির বাবা। তারা ওই অক্সিজেন সিলিন্ডার হাতে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরছেশিশুটিকে বাঁচানোর জন্যে একটি ইনটেনসিভ কেয়ার রুম পাবার জন্যে।

ওই দিনই সোশ্যাল ফোরামে আরেকটি ছবিসহ খবর ভাইরাল হয়সেখানে দেখা যায়একটি মৃত শিশুকে কাপড়ে ঢেকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছে। পেছনে ক্রন্দনরত তার স্বজনরা। তারা বাড়ি বন্ধক রেখে হামে আক্রান্ত শিশুটিকে বাঁচানোর জন্যে ঢাকা এসেছিল। তারা এখন মৃতদেহ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই লেখা যখন লিখছি সে সময়ে দেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত হামে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা ৪০৯। আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৫০ হাজারের ওপরে।

পৃথিবীতে সব থেকে সংবেদনশীল বিষয় শিশুর মৃত্যু। যেমন কোভিড অতিমারী হলেও এতটা সংবেদনশীল ছিল না এ কারণেকোভিডে মৃত্যুর ভয় ছিল পয়ষট্টির ওপরে যাদের বয়স তাদের। বাস্তবে ৬০র পরে খুব কম মানুষই পৃথিবীকে খুব কিছু দিতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে একটি শিশুযার মধ্যে একজন ভবিষ্যৎ আইনস্টাইন বা নিউটনও থাকতে পারেএকজন রবীন্দ্রনাথনজরুল বা সত্যেন বোসজামাল নজরুল ইসলামশামসুর রাহমানসৈয়দ শামসুল হক থাকতে পারেন।

হাম উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু | Barta Bazar

তাই শিশু মৃত্যু যেমন জাতীয় ক্ষতি তেমনি আছে পরিবারের মানসিক ক্ষতি। বাস্তবে পিতা মাতার কাঁধে সন্তানের দেহকে কেন সব থেকে ভারী বলা হয়এর মূল কারণপিতা-মাতা সন্তানহারা হলে প্রকৃতপক্ষে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। তাদের মানসিক ট্রমা থেকে আধুনিক সাইকিয়াট্রিস্টরাও বের করে আনতে বা চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ করতে পারেন না।

তাই রাষ্ট্র ও সমাজ সকলেরই দায়িত্ব থাকে শিশুকে ভিন্ন গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা করা। এবং আমাদের বাংলাদেশের চিকিৎসকরা সেটা করেনও। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের ঢালাওভাবে যারা দোষ দেনতারা না জেনেই দোষ দেন। এ কাজটা সঠিক নয়। আমরা যারা সব সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেইআমরা জানিআমাদের ডাক্তাররা কত বেশি অভিজ্ঞ ও কত বেশি সংখ্যক রোগী তারা সামলাতে পারেন।

শুধু কোভিড নয়ডেঙ্গু থেকে শুরু করে প্রতিদিনের হাজারো সমস্যা তারা সামলে যাচ্ছেন। এবং কোভিডে শুধু সাউথ এশিয়ার মধ্যে নয়বলা যেতে পারে আমেরিকার থেকেও বাংলাদেশ ভালোভাবে ম্যানেজমেন্ট করেছিল। সেখানে সরকারের ম্যানেজমেন্টকেও যেমন ধন্যবাদ দিতে হবে তেমনি ধন্যবাদ দিতে হবে ডাক্তারদেরকেও। চিন্তা করে দেখুন বাংলাদেশে কত ডাক্তার কোভিড চিকিৎসা করতে গিয়ে মারা গেছেন। কিন্তু তারা কোভিডের মতো অতিমারীতে অন্য দেশের তুলনায় রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা রেখেছিল খুবই কমে।

Regulating Body Temperature - Crystalinks

আর কোভিডের টিকা আবিষ্কারের আগে যত কোভিড হয়েছে এবং কোভিড বুস্টার টিকা নেবার পরেও আমার নিজেরই চার বার কোভিড হয়েছে। প্রতিবারই খেয়াল করেছি ডাক্তার সব সময়ই খেয়াল রেখেছেনযাতে শরীরে তাপমাত্রা বেশি না বাড়েনিউমোনিয়া একবার হয়েছিল তখন দ্রুত নিউমোনিয়া থেকে সুস্থ করেনআর যেন কোনোক্রমে ডায়রিয়া না হয় সে ব্যবস্থা করেন।

আমাদের ছোট বেলায় হামের টিকা ছিল না। হামের টিকা বাংলাদেশে দেওয়া শুরু হয়েছে অনেক পরেসম্ভবত ১৯৭৯ সাল থেকে। তাও সীমিত আকারে। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই চিকিৎসক পরিমণ্ডলে বড় হওয়াতে হামের চিকিৎসা দেখেছি। রোগটা ছোঁয়াচে বলে শিশুকে আলাদা করে রাখা হতো। তার সঙ্গে যিনি থাকতেন তিনি প্রতিবার কাপড় বদল করতেন। হাত ওয়াশ করতেন। আর চিকিৎসা বলতে দেখেছিযেন শিশুটির নিউমোনিয়া না হয়শরীরে তাপমাত্রা বেশি না বাড়েআর ডায়রিয়া না হয়। এই সাইড এফেক্টগুলোকেই গুরুত্ব দিতেন চিকিৎসকরা। এগুলোর ওষুধ দিতেন। আর তাতেই হামে আক্রান্ত শিশুরা এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে যেত।

অনেকে বলতে পারেন তখন এত মিডিয়া ছিল না বলেমৃত্যুর সংখ্যা জানা যেত না। কথাটা সত্য নয়। তখন শহরগুলো ছোট ছিল হয়তোতবে প্রতিটি শহরই মহল্লায় ভাগ ছিল। গ্রামগুলো পাড়ায় ভাগ ছিল। মহল্লা ও পাড়ার মানুষের মধ্যে বন্ধন ছিল অনেকটা পারিবারিক বন্ধনের মতো। তাই একটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে মুহূর্তে মহল্লার বা পাড়ার অনেক বেশি মানুষ সেখানে ছুটে যেতেন। আর শিশু মৃত্যু হলে তো ভিন্ন কথা। সে এক ভিন্ন বেদনার চিত্র। যা আজ ঠিক বোঝানো যাবে না।

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স হামে এভাবে মৃত্যুর প্রতিবাদে ১২ তারিখ মিছিলে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেনএই যে ৪র অধিক মৃত্যুর কথা বলা হচ্ছে আর ৫০ হাজার আক্রান্তের কথা বলা হচ্ছেএটা যাদের নাম রেজিস্টার্ড হচ্ছে সেই সংখ্যা। এর বাইরে কত হাজার হাজার আক্রান্ত ও মৃত্যু গ্রামেবস্তিতে ঘটছেতার কি কোনো হিসাব আছে?

কেউ বলতে পারেনরুহিন হোসেন প্রিন্সের কথা যদি সত্য হতো তাহলে তো সেটা মিডিয়া প্রকাশ করত। বাস্তবে সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কাজ প্রকৃত চিত্র তুলে আনা। কিন্তু আমরা কি করছি তা তো আমাদের প্রখ্যাত সম্পাদক মাহফুজ আনামের বক্তব্যই প্রকাশ করে দেয়। ইউনূস সরকার প্রধান হলে তিনি তার সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, “দেশে প্রথম কোনো মিডিয়া বান্ধব সরকার এসেছে। আবার তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে নোয়াবের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পরেমাহফুজ আনাম আবার বলেছেন, “দেশে এই প্রথম মিডিয়া বান্ধব সরকার এসেছে। টেলিভিশনে সংবাদ দেখে দুষ্টু দর্শকরা অনেকে সোশ্যাল ফোরামে লেখেনমাহফুজ আনাম তারেক রহমানের সামনে এ কথা বলার সময় অন্য নোয়াব নেতা এ কে আজাদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছিল। এ কে আজাদের চেহারাও মাহফুজ আনামের মতো সুন্দর। সুন্দর মুখে হাসি থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই এ কে আজাদের হাসির রহস্য না খুঁজে ওটা তার মুখের সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে ছেড়ে দেয়া ভালো।

অতীতের সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বিকশিত হতে না  দেওয়া: মাহ্‌ফুজ আনাম

তবে মাহফুজ আনামের মিডিয়া বান্ধব সরকারের সংজ্ঞা ভবিষ্যতে যদি এমন হয়সেই সরকারই মিডিয়া বান্ধব যেখানে সরকার যা যা চায় সেগুলোই লিখতে হয়। যেমন যখন দেশে হামে প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছেপানিতে ডুবে যাচ্ছে কৃষকের সারা বছরের সম্পদ। সে সময়ে দশ বছর আগের বাজারে ভেসে বেড়ানো গল্প শোনাচ্ছে বড় পত্রিকাহামের মৃত্যু ও ফসল নষ্ট থেকে মানুষের চোখ ফেরানোর জন্যে। এর থেকে মিডিয়া আর কত বড় বান্ধব হতে পারে সরকারের!

কিন্তু একবারও খোঁজ নেয়া হচ্ছে না কেনডাক্তাররা কোভিডের সময়ের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হামের রোগীদের বাঁচাতে পারছে নাকেন চিকিৎসকদের জন্যে এ চিকিৎসাকাজ কোভিড কালের মতো জরুরি ঘোষণা করা হলো নাকেন শিশুকে বাঁচাতে হামের চিকিৎসাকাজ কোভিডের মতো জরুরি ঘোষণা করা হচ্ছে না তা কেউ জানে না। অন্যদিকে, অন্য সকল পেশার মতো ডাক্তাররা এখনও সকলে কাজে যোগ দিতে পারেননি। কেন পারেননিসে উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে ইউনূসের সেই ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট উক্তির মধ্যে, “শুধু কি সরকারের মধ্যে আছেআপনার পাশে নেইআপনি তাকে শেষ করবেন না। সেই শেষ করার কাজ তো শেষ হয়নি।

ইউনূস শুধু হামের টিকা না কিনে শিশুদেরকে এই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়নি। সে এদেশের প্রতিটি পেশার মানুষের মধ্যে এক ভয়াবহ বিভেদ সৃষ্টি করে গেছে। অনেকে বলছেনডাবলিউ এইচ ও থেকে হুশিয়ারি করার পরেও ইউনূসের টিকা না কেনার মূল কারণ টাকে এনজিও সেক্টরে নেয়া যায় কিনাএবং সেখানে বড় ধরনের কোনো চুরি করা যায় কিনা এ লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলোফজলে হাসান আবেদ ছাড়া এ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো এনজিও করা মানুষ দেখেনিযার ভেতর দেশপ্রেম বা দেশের মানুষের প্রতি কোনো মমতা আছে। সাধারণ মানুষএদের কাছে পয়সা ও খ্যাতি রোজগারের একটা উপাদান মাত্র। কারণ এনজিও করে আজ সমাজে যারা বড় বড়এরা নিজেরা বা এদের লোকজন তো প্রেস রিলিজ ছাপানোর জন্যে আমাদের পিছে পিছে ঘুরততাই আমরা কম বেশি এদের আসল রূপ চিনি। অবশ্য নব্বইয়ের পরবর্তীতে সাংবাদিকতায় নতুন জাগরণ বলে একটি গোষ্ঠির এনজিওকরণ হয়েছে। যাক সে বিষয়। তবে ইউনূস বা এনজিও করা লোকদের কাছ থেকে দেশের মানুষের বা এদেশের শিশুদের জন্য এছাড়া অন্যকিছু আশা করা যায় না।

একদিকে হামে শিশু মারা যাচ্ছেআরেক দিকে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল ভেসে যাচ্ছেঅথচ দীর্ঘ সময়ে সংসদ চললেও তা নিয়ে কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত হলো না। অনেকে বলছেনআমেরিকার সঙ্গে কী চুক্তি হয়েছে সেটা নিয়েও সংসদে আলোচনা হয়নি।

হাম: বাংলাদেশ 'উচ্চ ঝুঁকিতে' আছে বলতে কী বুঝিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা?  - BBC News বাংলা

আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি না হয় অনেক বড় বিষয়কিন্তু হামে আক্রান্ত শিশুদের বাঁচানোর জন্যে তো একটা জরুরি সিদ্ধান্ত হতে পারতইউএনবির রিপোর্ট আর ছবিও তো বলে দিচ্ছে শিশুদের বাঁচানোর জন্যে প্রথম কী প্রয়োজনহাসপাতালগুলোতে অনেক বেশি ইনটেনসিভ কেয়ার আর পর্যাপ্ত অক্সিজেন। অনেক রোগী অক্সিজেনের অভাবে ভুগছে বলে নানানভাবে জানা যাচ্ছে (সরকার বান্ধব মিডিয়াতে নয়)।

সাংবাদিক হিসেবে যতদূর জানিপ্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অসম রাজ্যে সব থেকে বেশি অক্সিজেন প্রোডাকশান হয় এ এলাকায়। অসম বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা রাজ্য। তাদের সঙ্গে ল্যান্ড বর্ডারও আছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ১২ মে ২০২৬ তারিখে সাংবাদিকদের বলেছেনভারত ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় বসায়নি। যে কোনো সাংবাদিক বা যে কোনো নাগরিককে অফিসিয়াল বক্তব্য মেনে নিতে হবে। তবে সাধারণ মানুষ যা দেখেছে ও জানে তাতে এটা বলা যায়এই সরকার ভারতের কাছে যেমন ক্রুড অয়েল চাচ্ছেতাদেরকে রিফাইন করে দিতে বলছেভারতও এই সরকারকে নিয়ে অনেক বিগলিততাহলে অক্সিজেন কেন চাইতে পারে নাকেন আরো বেশি হাসপাতালে হামের রোগী চিকিৎসার জন্য জরুরি ইউনিট খোলা হবে না?

অবশ্য দুর্মুখেরা বলতে পারে যে কোনো সরকারের কাছে মানুষের থেকে ভোটারের মূল্য বেশি। এই শিশুরা তো ভোটার হবে ১৮ বছর পরে। আর যাই হোক তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে ১৮ বছর কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ইন্দিরা গান্ধী বা শেখ হাসিনার মতো শক্তিশালী নেত্রীও পারেনি। তাই হামে আক্রান্ত শিশুদের থেকে বর্তমান ভোটারদের কথা চিন্তা করাই ভালো।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের মহামারী: “শিশু হত্যায় কাঁপিছে বসুন্ধরা”

হামের মহামারী: “শিশু হত্যায় কাঁপিছে বসুন্ধরা”

০৮:০০:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রখ্যাত বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ইউএনবি একটি পরিবারের হাম রোগে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে একটি নিউজ ও তার সঙ্গে একটা ছবি প্রকাশ করে। ছবিতে শুষ্ক মুখের একটি তরুণ তার হাতে ধরা একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারতার পাশে মায়ের কোলে নাকে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো শিশুটিমায়ের চোখে জল আর পেছনে অনেকটা ভেঙে পড়া একজন পুরুষ। তার পরিচয় লেখা হয়নিতবে মুখ বলে দেয় তিনি শিশুটির বাবা। তারা ওই অক্সিজেন সিলিন্ডার হাতে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরছেশিশুটিকে বাঁচানোর জন্যে একটি ইনটেনসিভ কেয়ার রুম পাবার জন্যে।

ওই দিনই সোশ্যাল ফোরামে আরেকটি ছবিসহ খবর ভাইরাল হয়সেখানে দেখা যায়একটি মৃত শিশুকে কাপড়ে ঢেকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছে। পেছনে ক্রন্দনরত তার স্বজনরা। তারা বাড়ি বন্ধক রেখে হামে আক্রান্ত শিশুটিকে বাঁচানোর জন্যে ঢাকা এসেছিল। তারা এখন মৃতদেহ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই লেখা যখন লিখছি সে সময়ে দেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত হামে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা ৪০৯। আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৫০ হাজারের ওপরে।

পৃথিবীতে সব থেকে সংবেদনশীল বিষয় শিশুর মৃত্যু। যেমন কোভিড অতিমারী হলেও এতটা সংবেদনশীল ছিল না এ কারণেকোভিডে মৃত্যুর ভয় ছিল পয়ষট্টির ওপরে যাদের বয়স তাদের। বাস্তবে ৬০র পরে খুব কম মানুষই পৃথিবীকে খুব কিছু দিতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে একটি শিশুযার মধ্যে একজন ভবিষ্যৎ আইনস্টাইন বা নিউটনও থাকতে পারেএকজন রবীন্দ্রনাথনজরুল বা সত্যেন বোসজামাল নজরুল ইসলামশামসুর রাহমানসৈয়দ শামসুল হক থাকতে পারেন।

হাম উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু | Barta Bazar

তাই শিশু মৃত্যু যেমন জাতীয় ক্ষতি তেমনি আছে পরিবারের মানসিক ক্ষতি। বাস্তবে পিতা মাতার কাঁধে সন্তানের দেহকে কেন সব থেকে ভারী বলা হয়এর মূল কারণপিতা-মাতা সন্তানহারা হলে প্রকৃতপক্ষে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। তাদের মানসিক ট্রমা থেকে আধুনিক সাইকিয়াট্রিস্টরাও বের করে আনতে বা চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ করতে পারেন না।

তাই রাষ্ট্র ও সমাজ সকলেরই দায়িত্ব থাকে শিশুকে ভিন্ন গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা করা। এবং আমাদের বাংলাদেশের চিকিৎসকরা সেটা করেনও। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের ঢালাওভাবে যারা দোষ দেনতারা না জেনেই দোষ দেন। এ কাজটা সঠিক নয়। আমরা যারা সব সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেইআমরা জানিআমাদের ডাক্তাররা কত বেশি অভিজ্ঞ ও কত বেশি সংখ্যক রোগী তারা সামলাতে পারেন।

শুধু কোভিড নয়ডেঙ্গু থেকে শুরু করে প্রতিদিনের হাজারো সমস্যা তারা সামলে যাচ্ছেন। এবং কোভিডে শুধু সাউথ এশিয়ার মধ্যে নয়বলা যেতে পারে আমেরিকার থেকেও বাংলাদেশ ভালোভাবে ম্যানেজমেন্ট করেছিল। সেখানে সরকারের ম্যানেজমেন্টকেও যেমন ধন্যবাদ দিতে হবে তেমনি ধন্যবাদ দিতে হবে ডাক্তারদেরকেও। চিন্তা করে দেখুন বাংলাদেশে কত ডাক্তার কোভিড চিকিৎসা করতে গিয়ে মারা গেছেন। কিন্তু তারা কোভিডের মতো অতিমারীতে অন্য দেশের তুলনায় রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা রেখেছিল খুবই কমে।

Regulating Body Temperature - Crystalinks

আর কোভিডের টিকা আবিষ্কারের আগে যত কোভিড হয়েছে এবং কোভিড বুস্টার টিকা নেবার পরেও আমার নিজেরই চার বার কোভিড হয়েছে। প্রতিবারই খেয়াল করেছি ডাক্তার সব সময়ই খেয়াল রেখেছেনযাতে শরীরে তাপমাত্রা বেশি না বাড়েনিউমোনিয়া একবার হয়েছিল তখন দ্রুত নিউমোনিয়া থেকে সুস্থ করেনআর যেন কোনোক্রমে ডায়রিয়া না হয় সে ব্যবস্থা করেন।

আমাদের ছোট বেলায় হামের টিকা ছিল না। হামের টিকা বাংলাদেশে দেওয়া শুরু হয়েছে অনেক পরেসম্ভবত ১৯৭৯ সাল থেকে। তাও সীমিত আকারে। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই চিকিৎসক পরিমণ্ডলে বড় হওয়াতে হামের চিকিৎসা দেখেছি। রোগটা ছোঁয়াচে বলে শিশুকে আলাদা করে রাখা হতো। তার সঙ্গে যিনি থাকতেন তিনি প্রতিবার কাপড় বদল করতেন। হাত ওয়াশ করতেন। আর চিকিৎসা বলতে দেখেছিযেন শিশুটির নিউমোনিয়া না হয়শরীরে তাপমাত্রা বেশি না বাড়েআর ডায়রিয়া না হয়। এই সাইড এফেক্টগুলোকেই গুরুত্ব দিতেন চিকিৎসকরা। এগুলোর ওষুধ দিতেন। আর তাতেই হামে আক্রান্ত শিশুরা এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে যেত।

অনেকে বলতে পারেন তখন এত মিডিয়া ছিল না বলেমৃত্যুর সংখ্যা জানা যেত না। কথাটা সত্য নয়। তখন শহরগুলো ছোট ছিল হয়তোতবে প্রতিটি শহরই মহল্লায় ভাগ ছিল। গ্রামগুলো পাড়ায় ভাগ ছিল। মহল্লা ও পাড়ার মানুষের মধ্যে বন্ধন ছিল অনেকটা পারিবারিক বন্ধনের মতো। তাই একটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে মুহূর্তে মহল্লার বা পাড়ার অনেক বেশি মানুষ সেখানে ছুটে যেতেন। আর শিশু মৃত্যু হলে তো ভিন্ন কথা। সে এক ভিন্ন বেদনার চিত্র। যা আজ ঠিক বোঝানো যাবে না।

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স হামে এভাবে মৃত্যুর প্রতিবাদে ১২ তারিখ মিছিলে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেনএই যে ৪র অধিক মৃত্যুর কথা বলা হচ্ছে আর ৫০ হাজার আক্রান্তের কথা বলা হচ্ছেএটা যাদের নাম রেজিস্টার্ড হচ্ছে সেই সংখ্যা। এর বাইরে কত হাজার হাজার আক্রান্ত ও মৃত্যু গ্রামেবস্তিতে ঘটছেতার কি কোনো হিসাব আছে?

কেউ বলতে পারেনরুহিন হোসেন প্রিন্সের কথা যদি সত্য হতো তাহলে তো সেটা মিডিয়া প্রকাশ করত। বাস্তবে সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কাজ প্রকৃত চিত্র তুলে আনা। কিন্তু আমরা কি করছি তা তো আমাদের প্রখ্যাত সম্পাদক মাহফুজ আনামের বক্তব্যই প্রকাশ করে দেয়। ইউনূস সরকার প্রধান হলে তিনি তার সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, “দেশে প্রথম কোনো মিডিয়া বান্ধব সরকার এসেছে। আবার তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে নোয়াবের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পরেমাহফুজ আনাম আবার বলেছেন, “দেশে এই প্রথম মিডিয়া বান্ধব সরকার এসেছে। টেলিভিশনে সংবাদ দেখে দুষ্টু দর্শকরা অনেকে সোশ্যাল ফোরামে লেখেনমাহফুজ আনাম তারেক রহমানের সামনে এ কথা বলার সময় অন্য নোয়াব নেতা এ কে আজাদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছিল। এ কে আজাদের চেহারাও মাহফুজ আনামের মতো সুন্দর। সুন্দর মুখে হাসি থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই এ কে আজাদের হাসির রহস্য না খুঁজে ওটা তার মুখের সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে ছেড়ে দেয়া ভালো।

অতীতের সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বিকশিত হতে না  দেওয়া: মাহ্‌ফুজ আনাম

তবে মাহফুজ আনামের মিডিয়া বান্ধব সরকারের সংজ্ঞা ভবিষ্যতে যদি এমন হয়সেই সরকারই মিডিয়া বান্ধব যেখানে সরকার যা যা চায় সেগুলোই লিখতে হয়। যেমন যখন দেশে হামে প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছেপানিতে ডুবে যাচ্ছে কৃষকের সারা বছরের সম্পদ। সে সময়ে দশ বছর আগের বাজারে ভেসে বেড়ানো গল্প শোনাচ্ছে বড় পত্রিকাহামের মৃত্যু ও ফসল নষ্ট থেকে মানুষের চোখ ফেরানোর জন্যে। এর থেকে মিডিয়া আর কত বড় বান্ধব হতে পারে সরকারের!

কিন্তু একবারও খোঁজ নেয়া হচ্ছে না কেনডাক্তাররা কোভিডের সময়ের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হামের রোগীদের বাঁচাতে পারছে নাকেন চিকিৎসকদের জন্যে এ চিকিৎসাকাজ কোভিড কালের মতো জরুরি ঘোষণা করা হলো নাকেন শিশুকে বাঁচাতে হামের চিকিৎসাকাজ কোভিডের মতো জরুরি ঘোষণা করা হচ্ছে না তা কেউ জানে না। অন্যদিকে, অন্য সকল পেশার মতো ডাক্তাররা এখনও সকলে কাজে যোগ দিতে পারেননি। কেন পারেননিসে উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে ইউনূসের সেই ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট উক্তির মধ্যে, “শুধু কি সরকারের মধ্যে আছেআপনার পাশে নেইআপনি তাকে শেষ করবেন না। সেই শেষ করার কাজ তো শেষ হয়নি।

ইউনূস শুধু হামের টিকা না কিনে শিশুদেরকে এই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়নি। সে এদেশের প্রতিটি পেশার মানুষের মধ্যে এক ভয়াবহ বিভেদ সৃষ্টি করে গেছে। অনেকে বলছেনডাবলিউ এইচ ও থেকে হুশিয়ারি করার পরেও ইউনূসের টিকা না কেনার মূল কারণ টাকে এনজিও সেক্টরে নেয়া যায় কিনাএবং সেখানে বড় ধরনের কোনো চুরি করা যায় কিনা এ লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলোফজলে হাসান আবেদ ছাড়া এ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো এনজিও করা মানুষ দেখেনিযার ভেতর দেশপ্রেম বা দেশের মানুষের প্রতি কোনো মমতা আছে। সাধারণ মানুষএদের কাছে পয়সা ও খ্যাতি রোজগারের একটা উপাদান মাত্র। কারণ এনজিও করে আজ সমাজে যারা বড় বড়এরা নিজেরা বা এদের লোকজন তো প্রেস রিলিজ ছাপানোর জন্যে আমাদের পিছে পিছে ঘুরততাই আমরা কম বেশি এদের আসল রূপ চিনি। অবশ্য নব্বইয়ের পরবর্তীতে সাংবাদিকতায় নতুন জাগরণ বলে একটি গোষ্ঠির এনজিওকরণ হয়েছে। যাক সে বিষয়। তবে ইউনূস বা এনজিও করা লোকদের কাছ থেকে দেশের মানুষের বা এদেশের শিশুদের জন্য এছাড়া অন্যকিছু আশা করা যায় না।

একদিকে হামে শিশু মারা যাচ্ছেআরেক দিকে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল ভেসে যাচ্ছেঅথচ দীর্ঘ সময়ে সংসদ চললেও তা নিয়ে কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত হলো না। অনেকে বলছেনআমেরিকার সঙ্গে কী চুক্তি হয়েছে সেটা নিয়েও সংসদে আলোচনা হয়নি।

হাম: বাংলাদেশ 'উচ্চ ঝুঁকিতে' আছে বলতে কী বুঝিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা?  - BBC News বাংলা

আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি না হয় অনেক বড় বিষয়কিন্তু হামে আক্রান্ত শিশুদের বাঁচানোর জন্যে তো একটা জরুরি সিদ্ধান্ত হতে পারতইউএনবির রিপোর্ট আর ছবিও তো বলে দিচ্ছে শিশুদের বাঁচানোর জন্যে প্রথম কী প্রয়োজনহাসপাতালগুলোতে অনেক বেশি ইনটেনসিভ কেয়ার আর পর্যাপ্ত অক্সিজেন। অনেক রোগী অক্সিজেনের অভাবে ভুগছে বলে নানানভাবে জানা যাচ্ছে (সরকার বান্ধব মিডিয়াতে নয়)।

সাংবাদিক হিসেবে যতদূর জানিপ্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অসম রাজ্যে সব থেকে বেশি অক্সিজেন প্রোডাকশান হয় এ এলাকায়। অসম বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা রাজ্য। তাদের সঙ্গে ল্যান্ড বর্ডারও আছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ১২ মে ২০২৬ তারিখে সাংবাদিকদের বলেছেনভারত ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় বসায়নি। যে কোনো সাংবাদিক বা যে কোনো নাগরিককে অফিসিয়াল বক্তব্য মেনে নিতে হবে। তবে সাধারণ মানুষ যা দেখেছে ও জানে তাতে এটা বলা যায়এই সরকার ভারতের কাছে যেমন ক্রুড অয়েল চাচ্ছেতাদেরকে রিফাইন করে দিতে বলছেভারতও এই সরকারকে নিয়ে অনেক বিগলিততাহলে অক্সিজেন কেন চাইতে পারে নাকেন আরো বেশি হাসপাতালে হামের রোগী চিকিৎসার জন্য জরুরি ইউনিট খোলা হবে না?

অবশ্য দুর্মুখেরা বলতে পারে যে কোনো সরকারের কাছে মানুষের থেকে ভোটারের মূল্য বেশি। এই শিশুরা তো ভোটার হবে ১৮ বছর পরে। আর যাই হোক তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে ১৮ বছর কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ইন্দিরা গান্ধী বা শেখ হাসিনার মতো শক্তিশালী নেত্রীও পারেনি। তাই হামে আক্রান্ত শিশুদের থেকে বর্তমান ভোটারদের কথা চিন্তা করাই ভালো।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World