গত সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রখ্যাত বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ইউএনবি একটি পরিবারের হাম রোগে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে একটি নিউজ ও তার সঙ্গে একটা ছবি প্রকাশ করে। ছবিতে শুষ্ক মুখের একটি তরুণ তার হাতে ধরা একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার, তার পাশে মায়ের কোলে নাকে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো শিশুটি, মায়ের চোখে জল আর পেছনে অনেকটা ভেঙে পড়া একজন পুরুষ। তার পরিচয় লেখা হয়নি, তবে মুখ বলে দেয় তিনি শিশুটির বাবা। তারা ওই অক্সিজেন সিলিন্ডার হাতে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরছে—শিশুটিকে বাঁচানোর জন্যে একটি ইনটেনসিভ কেয়ার রুম পাবার জন্যে।
ওই দিনই সোশ্যাল ফোরামে আরেকটি ছবিসহ খবর ভাইরাল হয়, সেখানে দেখা যায়, একটি মৃত শিশুকে কাপড়ে ঢেকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছে। পেছনে ক্রন্দনরত তার স্বজনরা। তারা বাড়ি বন্ধক রেখে হামে আক্রান্ত শিশুটিকে বাঁচানোর জন্যে ঢাকা এসেছিল। তারা এখন মৃতদেহ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই লেখা যখন লিখছি সে সময়ে দেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত হামে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা ৪০৯। আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৫০ হাজারের ওপরে।
পৃথিবীতে সব থেকে সংবেদনশীল বিষয় শিশুর মৃত্যু। যেমন কোভিড অতিমারী হলেও এতটা সংবেদনশীল ছিল না এ কারণে—কোভিডে মৃত্যুর ভয় ছিল পয়ষট্টির ওপরে যাদের বয়স তাদের। বাস্তবে ৬০’র পরে খুব কম মানুষই পৃথিবীকে খুব কিছু দিতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে একটি শিশু, যার মধ্যে একজন ভবিষ্যৎ আইনস্টাইন বা নিউটনও থাকতে পারে, একজন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা সত্যেন বোস, জামাল নজরুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক থাকতে পারেন।
তাই শিশু মৃত্যু যেমন জাতীয় ক্ষতি– তেমনি আছে পরিবারের মানসিক ক্ষতিও। বাস্তবে পিতা– মাতার কাঁধে সন্তানের দেহকে কেন সব থেকে ভারী বলা হয়? এর মূল কারণ, পিতা-মাতা সন্তানহারা হলে প্রকৃতপক্ষে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। তাদের মানসিক ট্রমা থেকে আধুনিক সাইকিয়াট্রিস্টরাও বের করে আনতে বা চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ করতে পারেন না।
তাই রাষ্ট্র ও সমাজ সকলেরই দায়িত্ব থাকে শিশুকে ভিন্ন গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা করা। এবং আমাদের বাংলাদেশের চিকিৎসকরা সেটা করেনও। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের ঢালাওভাবে যারা দোষ দেন—তারা না জেনেই দোষ দেন। এ কাজটা সঠিক নয়। আমরা যারা সব সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেই, আমরা জানি, আমাদের ডাক্তাররা কত বেশি অভিজ্ঞ ও কত বেশি সংখ্যক রোগী তারা সামলাতে পারেন।
শুধু কোভিড নয়, ডেঙ্গু থেকে শুরু করে প্রতিদিনের হাজারো সমস্যা তারা সামলে যাচ্ছেন। এবং কোভিডে শুধু সাউথ এশিয়ার মধ্যে নয়, বলা যেতে পারে আমেরিকার থেকেও বাংলাদেশ ভালোভাবে ম্যানেজমেন্ট করেছিল। সেখানে সরকারের ম্যানেজমেন্টকেও যেমন ধন্যবাদ দিতে হবে তেমনি ধন্যবাদ দিতে হবে ডাক্তারদেরকেও। চিন্তা করে দেখুন বাংলাদেশে কত ডাক্তার কোভিড চিকিৎসা করতে গিয়ে মারা গেছেন। কিন্তু তারা কোভিডের মতো অতিমারীতে অন্য দেশের তুলনায় রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা রেখেছিল খুবই কমে।

আর কোভিডের টিকা আবিষ্কারের আগে যত কোভিড হয়েছে এবং কোভিড বুস্টার টিকা নেবার পরেও আমার নিজেরই চার বার কোভিড হয়েছে। প্রতিবারই খেয়াল করেছি ডাক্তার সব সময়ই খেয়াল রেখেছেন, যাতে শরীরে তাপমাত্রা বেশি না বাড়ে, নিউমোনিয়া একবার হয়েছিল তখন দ্রুত নিউমোনিয়া থেকে সুস্থ করেন, আর যেন কোনোক্রমে ডায়রিয়া না হয় সে ব্যবস্থা করেন।
আমাদের ছোট বেলায় হামের টিকা ছিল না। হামের টিকা বাংলাদেশে দেওয়া শুরু হয়েছে অনেক পরে, সম্ভবত ১৯৭৯ সাল থেকে। তাও সীমিত আকারে। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই চিকিৎসক পরিমণ্ডলে বড় হওয়াতে হামের চিকিৎসা দেখেছি। রোগটা ছোঁয়াচে বলে শিশুকে আলাদা করে রাখা হতো। তার সঙ্গে যিনি থাকতেন তিনি প্রতিবার কাপড় বদল করতেন। হাত ওয়াশ করতেন। আর চিকিৎসা বলতে দেখেছি, যেন শিশুটির নিউমোনিয়া না হয়, শরীরে তাপমাত্রা বেশি না বাড়ে—আর ডায়রিয়া না হয়। এই সাইড এফেক্টগুলোকেই গুরুত্ব দিতেন চিকিৎসকরা। এগুলোর ওষুধ দিতেন। আর তাতেই হামে আক্রান্ত শিশুরা এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে যেত।
অনেকে বলতে পারেন তখন এত মিডিয়া ছিল না বলে, মৃত্যুর সংখ্যা জানা যেত না। কথাটা সত্য নয়। তখন শহরগুলো ছোট ছিল হয়তো, তবে প্রতিটি শহরই মহল্লায় ভাগ ছিল। গ্রামগুলো পাড়ায় ভাগ ছিল। মহল্লা ও পাড়ার মানুষের মধ্যে বন্ধন ছিল অনেকটা পারিবারিক বন্ধনের মতো। তাই একটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে মুহূর্তে মহল্লার বা পাড়ার অনেক বেশি মানুষ সেখানে ছুটে যেতেন। আর শিশু মৃত্যু হলে তো ভিন্ন কথা। সে এক ভিন্ন বেদনার চিত্র। যা আজ ঠিক বোঝানো যাবে না।
কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স হামে এভাবে মৃত্যুর প্রতিবাদে ১২ তারিখ মিছিলে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, এই যে ৪’শ’র অধিক মৃত্যুর কথা বলা হচ্ছে আর ৫০ হাজার আক্রান্তের কথা বলা হচ্ছে—এটা যাদের নাম রেজিস্টার্ড হচ্ছে সেই সংখ্যা। এর বাইরে কত হাজার হাজার আক্রান্ত ও মৃত্যু গ্রামে, বস্তিতে ঘটছে—তার কি কোনো হিসাব আছে?
কেউ বলতে পারেন, রুহিন হোসেন প্রিন্সের কথা যদি সত্য হতো তাহলে তো সেটা মিডিয়া প্রকাশ করত। বাস্তবে সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কাজ প্রকৃত চিত্র তুলে আনা। কিন্তু আমরা কি করছি তা তো আমাদের প্রখ্যাত সম্পাদক মাহফুজ আনামের বক্তব্যই প্রকাশ করে দেয়। ইউনূস সরকার প্রধান হলে তিনি তার সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, “দেশে প্রথম কোনো মিডিয়া বান্ধব সরকার এসেছে”। আবার তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে নোয়াবের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পরে, মাহফুজ আনাম আবার বলেছেন, “দেশে এই প্রথম মিডিয়া বান্ধব সরকার এসেছে”। টেলিভিশনে সংবাদ দেখে দুষ্টু দর্শকরা অনেকে সোশ্যাল ফোরামে লেখেন, মাহফুজ আনাম তারেক রহমানের সামনে এ কথা বলার সময় অন্য নোয়াব নেতা এ কে আজাদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছিল। এ কে আজাদের চেহারাও মাহফুজ আনামের মতো সুন্দর। সুন্দর মুখে হাসি থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই এ কে আজাদের হাসির রহস্য না খুঁজে ওটা তার মুখের সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে ছেড়ে দেয়া ভালো।
তবে মাহফুজ আনামের মিডিয়া বান্ধব সরকারের সংজ্ঞা ভবিষ্যতে যদি এমন হয়, সেই সরকারই মিডিয়া বান্ধব যেখানে সরকার যা যা চায় সেগুলোই লিখতে হয়। যেমন যখন দেশে হামে প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে, পানিতে ডুবে যাচ্ছে কৃষকের সারা বছরের সম্পদ। সে সময়ে দশ বছর আগের বাজারে ভেসে বেড়ানো গল্প শোনাচ্ছে বড় পত্রিকা—হামের মৃত্যু ও ফসল নষ্ট থেকে মানুষের চোখ ফেরানোর জন্যে। এর থেকে মিডিয়া আর কত বড় বান্ধব হতে পারে সরকারের!
কিন্তু একবারও খোঁজ নেয়া হচ্ছে না কেন, ডাক্তাররা কোভিডের সময়ের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হামের রোগীদের বাঁচাতে পারছে না? কেন চিকিৎসকদের জন্যে এ চিকিৎসাকাজ কোভিড কালের মতো জরুরি ঘোষণা করা হলো না? কেন শিশুকে বাঁচাতে হামের চিকিৎসাকাজ কোভিডের মতো জরুরি ঘোষণা করা হচ্ছে না তা কেউ জানে না। অন্যদিকে, অন্য সকল পেশার মতো ডাক্তাররা এখনও সকলে কাজে যোগ দিতে পারেননি। কেন পারেননি? সে উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে ইউনূসের সেই ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট উক্তির মধ্যে, “শুধু কি সরকারের মধ্যে আছে, আপনার পাশে নেই—আপনি তাকে শেষ করবেন না”। সেই শেষ করার কাজ তো শেষ হয়নি।
ইউনূস শুধু হামের টিকা না কিনে শিশুদেরকে এই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়নি। সে এদেশের প্রতিটি পেশার মানুষের মধ্যে এক ভয়াবহ বিভেদ সৃষ্টি করে গেছে। অনেকে বলছেন, ডাবলিউ এইচ ও থেকে হুশিয়ারি করার পরেও ইউনূসের টিকা না কেনার মূল কারণ এটাকে এনজিও সেক্টরে নেয়া যায় কিনা—এবং সেখানে বড় ধরনের কোনো চুরি করা যায় কিনা এ লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলো, ফজলে হাসান আবেদ ছাড়া এ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো এনজিও করা মানুষ দেখেনি—যার ভেতর দেশপ্রেম বা দেশের মানুষের প্রতি কোনো মমতা আছে। সাধারণ মানুষ, এদের কাছে পয়সা ও খ্যাতি রোজগারের একটা উপাদান মাত্র। কারণ এনজিও করে আজ সমাজে যারা বড় বড়—এরা নিজেরা বা এদের লোকজন তো প্রেস রিলিজ ছাপানোর জন্যে আমাদের পিছে পিছে ঘুরত—তাই আমরা কম বেশি এদের আসল রূপ চিনি। অবশ্য নব্বইয়ের পরবর্তীতে সাংবাদিকতায় নতুন জাগরণ বলে একটি গোষ্ঠির এনজিওকরণ হয়েছে। যাক সে বিষয়। তবে ইউনূস বা এনজিও করা লোকদের কাছ থেকে দেশের মানুষের বা এদেশের শিশুদের জন্য এছাড়া অন্যকিছু আশা করা যায় না।
একদিকে হামে শিশু মারা যাচ্ছে, আরেক দিকে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল ভেসে যাচ্ছে—অথচ দীর্ঘ সময়ে সংসদ চললেও তা নিয়ে কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত হলো না। অনেকে বলছেন, আমেরিকার সঙ্গে কী চুক্তি হয়েছে সেটা নিয়েও সংসদে আলোচনা হয়নি।

আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি না হয় অনেক বড় বিষয়—কিন্তু হামে আক্রান্ত শিশুদের বাঁচানোর জন্যে তো একটা জরুরি সিদ্ধান্ত হতে পারত? ইউএনবি’র রিপোর্ট আর ছবিও তো বলে দিচ্ছে শিশুদের বাঁচানোর জন্যে প্রথম কী প্রয়োজন? হাসপাতালগুলোতে অনেক বেশি ইনটেনসিভ কেয়ার আর পর্যাপ্ত অক্সিজেন। অনেক রোগী অক্সিজেনের অভাবে ভুগছে বলে নানানভাবে জানা যাচ্ছে (সরকার বান্ধব মিডিয়াতে নয়)।
সাংবাদিক হিসেবে যতদূর জানি, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অসম রাজ্যে সব থেকে বেশি অক্সিজেন প্রোডাকশান হয় এ এলাকায়। অসম বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা রাজ্য। তাদের সঙ্গে ল্যান্ড বর্ডারও আছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ১২ মে ২০২৬ তারিখে সাংবাদিকদের বলেছেন, ভারত ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় বসায়নি। যে কোনো সাংবাদিক বা যে কোনো নাগরিককে অফিসিয়াল বক্তব্য মেনে নিতে হবে। তবে সাধারণ মানুষ যা দেখেছে ও জানে তাতে এটা বলা যায়—এই সরকার ভারতের কাছে যেমন ক্রুড অয়েল চাচ্ছে, তাদেরকে রিফাইন করে দিতে বলছে, ভারতও এই সরকারকে নিয়ে অনেক বিগলিত—তাহলে অক্সিজেন কেন চাইতে পারে না? কেন আরো বেশি হাসপাতালে হামের রোগী চিকিৎসার জন্য জরুরি ইউনিট খোলা হবে না?
অবশ্য দুর্মুখেরা বলতে পারে যে কোনো সরকারের কাছে মানুষের থেকে ভোটারের মূল্য বেশি। এই শিশুরা তো ভোটার হবে ১৮ বছর পরে। আর যাই হোক তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে ১৮ বছর কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ইন্দিরা গান্ধী বা শেখ হাসিনার মতো শক্তিশালী নেত্রীও পারেনি। তাই হামে আক্রান্ত শিশুদের থেকে বর্তমান ভোটারদের কথা চিন্তা করাই ভালো।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 


















