ব্রিটিশ রাজনীতিতে কিয়ার স্টারমারকে ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে কেবল একজন নেতার ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। সমস্যাটি আরও গভীরে। লেবার পার্টি বহুদিন ধরে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার পুরোনো সামাজিক জোট আর কার্যকর নেই। নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়তো সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা দলটির মৌলিক সংকট দূর করবে না।
রাজনীতিতে একটি কঠিন সত্য আছে—মানুষ সহজে বদলায় না। কোনো নেতা ক্ষমতায় এসে হঠাৎ ভিন্ন ব্যক্তিত্বে রূপ নেন না। ফলে স্টারমারের সমালোচকেরা যদি মনে করেন, নতুন কোনো কৌশল বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ অন্যরকম নেতা হয়ে উঠবেন, তবে সেটি বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা নয়। লেবার এমপিরা তাকে সরিয়ে দিতে চাইতে পারেন, কারণ তারা নির্বাচনী বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, স্টারমারকে সরিয়ে দিলেই কি দলটি আবার আগের শক্তি ফিরে পাবে?
সমস্যার শিকড় লুকিয়ে আছে লেবারের ঐতিহাসিক কাঠামোয়। বিংশ শতকের শুরুতে দলটি গড়ে উঠেছিল দুই ভিন্ন ধারার সমন্বয়ে। একদিকে ছিল শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্বের দাবি, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক শক্তি। সময়ের সঙ্গে এর সঙ্গে যুক্ত হয় মধ্যবিত্ত উদারপন্থীরাও। দীর্ঘদিন এই বৈচিত্র্যময় জোট কোনোভাবে টিকে ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বদলেছে। এখন এই তিন ধারার রাজনৈতিক অগ্রাধিকার আর এক জায়গায় মেলে না।

শ্রমজীবী ভোটারের একটি বড় অংশ সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তাবাদী প্রশ্নে ক্রমশ রক্ষণশীল হয়ে উঠেছে। অপরদিকে শহুরে উদারপন্থীরা সামাজিক স্বাধীনতা, অভিবাসন ও বহুসাংস্কৃতিকতার প্রশ্নে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে। আর বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠী মনে করে, মূলধারার সামাজিক গণতন্ত্র যথেষ্ট সাহসী নয়। ফলে একই দলে থেকেও তারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলে।
স্টারমারের উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা “লেবার টুগেদার” প্রকল্পের মূল ধারণা ছিল—এই ভাঙা জোটকে আবার একত্র করা সম্ভব। করবিন যুগের বিভক্তি কাটিয়ে দলকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা তখন সফল বলেই মনে হয়েছিল। কারণ তখন দল ভেঙে নতুন কোনো কেন্দ্রপন্থী শক্তি গড়ার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, লেবারের ভেতর থেকেই পরিবর্তন আনা সম্ভব।
কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা যাচ্ছে, সেই ঐক্যের ধারণাটিই হয়তো বাস্তবতার সঙ্গে আর খাপ খায় না। স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে, সমাজতান্ত্রিক ভোটারদের একাংশ এখন গ্রিন পার্টির দিকে ঝুঁকছে। শ্রমজীবী ও জাতীয়তাবাদী ভোটারদের একটি অংশ যাচ্ছে রিফর্ম ইউকের দিকে। যে এলাকাগুলো একসময় “লেবার হার্টল্যান্ড” নামে পরিচিত ছিল, সেগুলোও আর নিরাপদ নয়।
ফলে লেবারের সামনে এখন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—দলটি আসলে কাদের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়?
দীর্ঘদিন ধরে লেবার নিজেকে এমন এক সর্বজনীন জোট হিসেবে কল্পনা করেছে, যেখানে শ্রমিক, উদারপন্থী ও সমাজতান্ত্রিকরা একই ছাতার নিচে থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা যদি বলে এই জোট আর কার্যকর নয়, তাহলে পুরোনো কাঠামো আঁকড়ে ধরে থাকার অর্থ হতে পারে ধীরে ধীরে আরও দুর্বল হয়ে পড়া।

সম্ভবত এখন ব্রিটিশ বাম-উদার রাজনীতির সামনে নতুন হিসাব প্রয়োজন। শ্রমজীবী জাতীয়তাবাদী ভোটারদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় যদি উদারপন্থীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আর উদারপন্থী অবস্থান শক্ত করলে যদি পুরোনো শ্রমজীবী ভিত্তি আরও দূরে সরে যায়, তাহলে মাঝামাঝি অবস্থান শেষ পর্যন্ত কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে লেবারের সামনে বিকল্প হতে পারে নতুন বাস্তবতা মেনে নেওয়া। হয়তো দলটিকে স্বীকার করতে হবে যে তার সামাজিক ভিত্তি বদলে গেছে। পুরোনো শিল্পাঞ্চল আর তার স্বাভাবিক ঘাঁটি নয়। বরং শহুরে, শিক্ষিত, উদারপন্থী ভোটারদের কেন্দ্র করেই নতুন রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে হবে।
এটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, কিন্তু বর্তমান অবস্থাও খুব নিরাপদ নয়। রিফর্ম ইউকে যে ভোট পাচ্ছে, তা অপ্রতিরোধ্য কোনো জনসমর্থন নয়। বরং বিভক্ত বিরোধী রাজনীতির সুযোগ তারা কাজে লাগাচ্ছে। উদারপন্থী ভোট যদি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, তবে কম ভোট পেয়েও ডানপন্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
স্টারমারকে সরানো বা রেখে দেওয়া—এই বিতর্ক তাই মূল প্রশ্ন নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, লেবার কি এখনো নিজেকে সেই পুরোনো দল হিসেবে কল্পনা করছে, যা বাস্তবে আর অস্তিত্বে নেই? যদি তাই হয়, তাহলে নেতৃত্ব পরিবর্তন কেবল উপসর্গ বদলাবে, রোগ নয়।
ব্রিটিশ রাজনীতির মানচিত্র বদলে গেছে। সেই পরিবর্তন মেনে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট গড়তে না পারলে, লেবারের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
ড্যানিয়েল ফিঙ্কেলস্টেইন 


















