০৪:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
হঠাৎ কোটিপতি হওয়ার মানসিক চাপ, নতুন ধনী শ্রেণির অদৃশ্য সংকট কান মঞ্চে শাড়ির নতুন রূপ: আলিয়া ভাটের ইন্দো-ওয়েস্টার্ন লুকে ঝড় যখন আকাশ মেঘলা  হরমুজের লড়াই: জ্বালানি পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন ভূরাজনৈতিক সংঘাত চীনা গাড়ির সামনে আমেরিকার দেয়াল কতদিন টিকবে আল-কায়েদার ছায়া কি আবার বিশ্বকে তাড়া করছে? লেবার পার্টির পুরোনো জোট ভেঙে গেছে, স্টারমার একা এর সমাধান নন স্টারমারের নেতৃত্বে চাপে ব্রিটিশ লেবার পার্টি, ভাঙনের আশঙ্কায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ আফ্রিকার একাধিক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ PM তারেক রহমানের হুঁশিয়ারি: মুখস্থনির্ভর শিক্ষায় স্নাতক হয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ বেকার

আল-কায়েদার ছায়া কি আবার বিশ্বকে তাড়া করছে?

ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর বহু বছর ধরে একটি ধারণা শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল—আল-কায়েদা আর আগের মতো কার্যকর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধ এবং সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর মনে করা হয়েছিল, এই অধ্যায় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা বারবার দেখায়, কোনো উগ্র মতাদর্শ শুধু একজন নেতার মৃত্যুর মাধ্যমে বিলীন হয়ে যায় না। বরং দুর্বল রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে সেটি নতুন ভূগোল খুঁজে নেয়।

মালিতে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলাগুলো সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্য, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাহীনতার ভেতর আটকে আছে। হামলার পর আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর দায় স্বীকার শুধু একটি সামরিক ঘটনার খবর নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ এই হামলা প্রমাণ করে, সংগঠনটি হয়তো আগের রূপে নেই, কিন্তু তার আদর্শ এবং নেটওয়ার্ক এখনো কার্যকর।

আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নব্বইয়ের দশকে তালেবান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে ছিল। সেই পরিস্থিতিতে বিন লাদেন শুধু আশ্রয়ই পাননি, বরং আফগান ভূখণ্ডকে একটি কৌশলগত ঘাঁটিতে রূপান্তর করেছিলেন। পরে সেই মাটিতেই ২০০১ সালের হামলার পরিকল্পনা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানের একটিতে জড়িয়ে ফেলে।

Al Qaeda's shadow returns - Nikkei Asia

কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধের পরও মৌলিক সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। আফগান জনগণের জীবনযাত্রা উন্নত হয়নি, বরং বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার ওপর যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তা দেখায় সামরিক বিজয় সবসময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।

মালির ঘটনাও একই প্রশ্ন সামনে আনে। একটি রাষ্ট্র যখন তার ভেতরে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং ন্যূনতম অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন উগ্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পায়। সেখানে সামরিক নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিদেশি বাহিনীর নিরাপদ অঞ্চলে সরে যাওয়া শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার দুর্বলতার প্রতীক।

এ ধরনের সংকট এখন শুধু একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সিরিয়া, লিবিয়া, সুদান, ইয়েমেন কিংবা লেবাননের মতো রাষ্ট্রগুলো একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যেখানে রাষ্ট্র দুর্বল, দারিদ্র্য তীব্র এবং অস্ত্রের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণহীন, সেখানে উগ্রবাদ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এখন কোনো একটি অঞ্চলের উগ্র মতাদর্শ মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের অন্য প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে।

Islamic State vs al-Qaeda: a rivalry that dates back to old personality  clashes

বিশ্ব রাজনীতির বড় শক্তিগুলো প্রায়ই নিরাপত্তা প্রশ্নকে কেবল সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, শুধু অস্ত্র দিয়ে উগ্রবাদকে দীর্ঘমেয়াদে পরাজিত করা যায় না। যখন মানুষের জীবনে হতাশা, বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা বাড়তে থাকে, তখন চরমপন্থী সংগঠনগুলো সহজেই সমর্থন পায়। আফগানিস্তানে যেমন বহু তরুণ উগ্র সংগঠনের দিকে ঝুঁকেছিল, তেমনি আজও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একই বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনেক সময় এই সংকেতগুলোকে স্থানীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ ৯/১১–এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের সংকট খুব দ্রুত বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হতে পারে। মালি আজ হয়তো বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু নয়, কিন্তু সেখানে যে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে, তা ভবিষ্যতের আরও বড় বিপদের ইঙ্গিত বহন করছে।

আল-কায়েদা হয়তো আগের সংগঠন নয়, কিন্তু তার ছায়া এখনো রয়ে গেছে। সেই ছায়া টিকে আছে দুর্বল রাষ্ট্রের ভেতরে, দারিদ্র্যের গভীরে এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফাঁকে। আর যতদিন সেই বাস্তবতাগুলো অমীমাংসিত থাকবে, ততদিন উগ্রবাদের পুরোনো ভূত নতুন নামে ফিরে আসতেই থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হঠাৎ কোটিপতি হওয়ার মানসিক চাপ, নতুন ধনী শ্রেণির অদৃশ্য সংকট

আল-কায়েদার ছায়া কি আবার বিশ্বকে তাড়া করছে?

০৩:০৪:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর বহু বছর ধরে একটি ধারণা শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল—আল-কায়েদা আর আগের মতো কার্যকর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধ এবং সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর মনে করা হয়েছিল, এই অধ্যায় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা বারবার দেখায়, কোনো উগ্র মতাদর্শ শুধু একজন নেতার মৃত্যুর মাধ্যমে বিলীন হয়ে যায় না। বরং দুর্বল রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে সেটি নতুন ভূগোল খুঁজে নেয়।

মালিতে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলাগুলো সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্য, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাহীনতার ভেতর আটকে আছে। হামলার পর আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর দায় স্বীকার শুধু একটি সামরিক ঘটনার খবর নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ এই হামলা প্রমাণ করে, সংগঠনটি হয়তো আগের রূপে নেই, কিন্তু তার আদর্শ এবং নেটওয়ার্ক এখনো কার্যকর।

আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নব্বইয়ের দশকে তালেবান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে ছিল। সেই পরিস্থিতিতে বিন লাদেন শুধু আশ্রয়ই পাননি, বরং আফগান ভূখণ্ডকে একটি কৌশলগত ঘাঁটিতে রূপান্তর করেছিলেন। পরে সেই মাটিতেই ২০০১ সালের হামলার পরিকল্পনা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানের একটিতে জড়িয়ে ফেলে।

Al Qaeda's shadow returns - Nikkei Asia

কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধের পরও মৌলিক সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। আফগান জনগণের জীবনযাত্রা উন্নত হয়নি, বরং বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার ওপর যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তা দেখায় সামরিক বিজয় সবসময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।

মালির ঘটনাও একই প্রশ্ন সামনে আনে। একটি রাষ্ট্র যখন তার ভেতরে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং ন্যূনতম অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন উগ্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পায়। সেখানে সামরিক নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিদেশি বাহিনীর নিরাপদ অঞ্চলে সরে যাওয়া শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার দুর্বলতার প্রতীক।

এ ধরনের সংকট এখন শুধু একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সিরিয়া, লিবিয়া, সুদান, ইয়েমেন কিংবা লেবাননের মতো রাষ্ট্রগুলো একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যেখানে রাষ্ট্র দুর্বল, দারিদ্র্য তীব্র এবং অস্ত্রের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণহীন, সেখানে উগ্রবাদ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এখন কোনো একটি অঞ্চলের উগ্র মতাদর্শ মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের অন্য প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে।

Islamic State vs al-Qaeda: a rivalry that dates back to old personality  clashes

বিশ্ব রাজনীতির বড় শক্তিগুলো প্রায়ই নিরাপত্তা প্রশ্নকে কেবল সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, শুধু অস্ত্র দিয়ে উগ্রবাদকে দীর্ঘমেয়াদে পরাজিত করা যায় না। যখন মানুষের জীবনে হতাশা, বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা বাড়তে থাকে, তখন চরমপন্থী সংগঠনগুলো সহজেই সমর্থন পায়। আফগানিস্তানে যেমন বহু তরুণ উগ্র সংগঠনের দিকে ঝুঁকেছিল, তেমনি আজও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একই বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনেক সময় এই সংকেতগুলোকে স্থানীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ ৯/১১–এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের সংকট খুব দ্রুত বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হতে পারে। মালি আজ হয়তো বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু নয়, কিন্তু সেখানে যে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে, তা ভবিষ্যতের আরও বড় বিপদের ইঙ্গিত বহন করছে।

আল-কায়েদা হয়তো আগের সংগঠন নয়, কিন্তু তার ছায়া এখনো রয়ে গেছে। সেই ছায়া টিকে আছে দুর্বল রাষ্ট্রের ভেতরে, দারিদ্র্যের গভীরে এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফাঁকে। আর যতদিন সেই বাস্তবতাগুলো অমীমাংসিত থাকবে, ততদিন উগ্রবাদের পুরোনো ভূত নতুন নামে ফিরে আসতেই থাকবে।