০৯:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শিথিলতা: বাণিজ্য অর্থায়নে বাড়ল ঋণসীমা কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন ভি ডি সতীশন, ১৮ মে শপথের সম্ভাবনা পাকিস্তানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাতাহ-৪’ সফল পরীক্ষা, পাল্লা ও নিখুঁত আঘাতের সক্ষমতার দাবি বেইজিং বৈঠকে ইরান ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে ব্রিকসের জোরালো অবস্থান চাইল তেহরান মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায় এল নিনোর শঙ্কায় ফের গম কেনায় ঝুঁকছে এশিয়া, বাড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা চীনের সস্তা চিপের চাপে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন, টাটার নতুন ফ্যাবের সামনে কঠিন লড়াই অভিনেত্রী নীনা ওয়াদিয়া: ‘আমাদের বাড়ির সব দেয়াল ছিল হলুদ, যেন একটা লেবু’

হার্ভার্ডে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উত্থান, পিট হেগসেথের দেখা উচিত কিউল্যাব

ট্রাম্প প্রশাসন যখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে তথাকথিত “অতি উদারপন্থী” সংস্কৃতির কেন্দ্র বলে আক্রমণ করছে, তখন সেখানে এক অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা “কিউল্যাব” নামে একটি প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি ইনকিউবেটরের মাধ্যমে নতুন উদ্যোগ গড়ে তুলতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

১৮ ফেব্রুয়ারির একটি ঘটনা এই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেদিন কিউল্যাবের শিক্ষার্থী উদ্যোক্তারা সাক্ষাৎ করেন টমাস “প্যাট” পেইনের সঙ্গে। তিনি সাবেক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট মেজর, যিনি ইরাকে অসাধারণ সাহসিকতার জন্য ২০২০ সালে ‘মেডেল অব অনার’ পান। বর্তমানে তিনি হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের শিক্ষার্থী। তাঁর লক্ষ্য, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নির্মাতাদের সামনে সেই সৈনিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করবে।

পেইন যখন তাঁর মেডেল অব অনার শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন, তখন পুরো কক্ষ যেন আবেগে স্তব্ধ হয়ে যায়। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের শিক্ষার্থী ও সাবেক আর্মি ক্যাপ্টেন নিক মেইনস বলেন, সেই মুহূর্তে সবাই যেন শিহরিত হয়ে পড়েছিল। পেইনের বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি শুধু আকর্ষণীয় কোনো উদ্ভাবন নয়; এটি জীবন বাঁচায়, আবার প্রয়োজনে জীবনও কেড়ে নেয়।

এই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা দেন, পেন্টাগন আর হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলে সামরিক ফেলো পাঠাবে না। তাঁর অভিযোগ ছিল, সেখানে গেলে সামরিক কর্মকর্তারা “বৈশ্বিকতাবাদী ও উগ্র মতাদর্শে” প্রভাবিত হয়ে ফিরে আসেন। হেগসেথ হার্ভার্ডকে “আমেরিকাবিরোধী সক্রিয়তার উত্তপ্ত কেন্দ্র” বলেও কটাক্ষ করেন।

কিন্তু “ওক” সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই রাজনৈতিক প্রচারণা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলমান এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে আড়াল করছে। বিল গেটস ও মার্ক জাকারবার্গের মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্ম দেওয়া হার্ভার্ড এখন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা খাতের প্রতিও নতুন আগ্রহ দেখাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী এখনও প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী, তবে একই সঙ্গে তারা এমন ব্যবসা গড়ে তুলতে চায় যা দেশকে আরও নিরাপদ করবে।

এই পরিবর্তন আসলে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতের বৃহত্তর বিপ্লবের অংশ। একসময় এই খাতের নিয়ন্ত্রণ ছিল লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান বা বোয়িংয়ের মতো বিশাল আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের হাতে। তারা যুদ্ধবিমান বা বিমানবাহী জাহাজের মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্র তৈরি করত, যেগুলোর অনেকগুলোই পরে অকার্যকারিতা ও ব্যয়ের সমালোচনায় পড়ে। এখন সেই খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্যালান্টিয়ারের অ্যালেক্স কার্প কিংবা অ্যান্ডুরিলের পামার লাকির মতো ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোক্তারা। তাঁদের হাত ধরে একসময়ের ধীরগতির শিল্পখাত এখন দ্রুত পরিবর্তনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

কিউল্যাব এই পরিবর্তনেরই একটি সূচক। চলতি শিক্ষাবর্ষে হার্ভার্ড ও এমআইটির ১২০টি শিক্ষার্থী দল এতে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছিল। জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ গড়ে তুলতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের পরামর্শ ও সহায়তা দেয় কিউল্যাব। কিন্তু আবেদনকারীদের মধ্যে মাত্র ২০টি দল নির্বাচিত হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ছিল প্রায় হার্ভার্ডে ভর্তি হওয়ার মতোই কঠিন।

এখানে কেবল তাত্ত্বিক প্রকল্প তৈরি হচ্ছে না, বরং বাস্তব কোম্পানি গড়ে উঠছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিউল্যাব শুরু হওয়ার পর ৩৪টি দলের মধ্যে ২০টি প্রাথমিক বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে এবং ১১টি দল সরকারি চুক্তি পেয়েছে। এ তথ্য দিয়েছেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের ইন্টেলিজেন্স প্রজেক্টের প্রধান ও সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা মার্ক পাসকালে। তিনি ও আরও কয়েকজন সাবেক গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের সরকারি সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলতে সহায়তা করছেন।

Hegseth takes military culture war to civilian universities

কিউল্যাবের ধারণা আসে দুই সাবেক সেনাসদস্যের উদ্যোগ থেকে। নিক মেইনস এবং বিমানবাহিনীর সাবেক সদস্য রায়ান হোল্টে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের রাগবি দলে পরিচিত হন। সামরিক জীবন শেষে তাঁরা মনে করেছিলেন, কাজের প্রতি তাঁদের আগের উদ্দীপনা হারিয়ে গেছে। তাই ২০২৪ সালের শরতে তাঁরা একটি বিজ্ঞপ্তি ছড়ান, যেখানে লেখা ছিল, “জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন কিছু করতে চান?” এরপর মার্ক পাসকালে তাঁদের কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারে জায়গা, পরামর্শ এবং নেটওয়ার্কিং সহায়তা দেন।

প্রথম আহ্বানেই ৭০টি দল আবেদন করে। নির্বাচিত ১৬টি দল নিয়মিত বৈঠক শুরু করে এবং নিজেদের ধারণা ও যোগাযোগ ভাগাভাগি করতে থাকে। প্রথম বক্তা ছিলেন সাবেক নেভি সিল ও হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ব্র্যান্ডন সেং, যিনি পরে ‘শিল্ড এআই’ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে কোম্পানিটির মূল্য ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

গত সেপ্টেম্বরে লেখক কিউল্যাবের নতুন সেশনে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে এপ্রিল মাসে তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করলে বেশ কিছু চমকপ্রদ সাফল্যের গল্প সামনে আসে।

হার্ভার্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী কুশান উইরাকুন জানান, তিনি ২০২৫ সালে “প্রোডেক্স ল্যাবস” নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। কিউল্যাবের সহায়তায় গড়া এই কোম্পানি এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা ও সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা আগেভাগে বিশ্লেষণ করতে পারে। এলথ্রিহ্যারিস নামে একটি বড় প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ছিল তাদের প্রথম দিকের গ্রাহকদের একটি। বর্তমানে তিনি কয়েকটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন, যারা দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

উইরাকুনের পরিবার শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে আসে। মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি ৭৫ লাখ ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হয়েছেন। তাঁর গল্প হার্ভার্ডের নতুন পরিবর্তনের প্রতীক, যেখানে একসময় জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়কে দূরে রাখা হলেও এখন উদ্ভাবনের মাধ্যমে তা গ্রহণ করা হচ্ছে।

আরেক উদ্যোক্তা স্টিফেন বুকানান, যিনি সাবেক আর্মি গ্রিন বেরেট সদস্য এবং মে মাসে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে স্নাতক হবেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান “ব্যান্ডেলিয়ার টেকনোলজিস” কোয়ান্টাম প্রযুক্তিভিত্তিক এমন একটি ট্র্যাকিং ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা জিপিএসের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। বুকানান বলেন, ইরাকে সামরিক অভিজ্ঞতা এবং হার্ভার্ডের শিক্ষা মিলিয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতির উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি করতে পেরেছেন।

তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ২৪ লাখ ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে, পাশাপাশি লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সহায়তাও অর্জন করেছে। এছাড়া পেন্টাগনের “গোল্ডেন ডোম” ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে কাজের জন্যও তারা প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছে। বুকানানের মতে, কিউল্যাব এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে ভিন্ন পটভূমির মানুষ একসঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতে পারছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন হার্ভার্ডকে দীর্ঘদিন ধরে সামরিকবিরোধী উদারপন্থী অভিজাতদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। সমালোচনার কিছু অংশ হয়তো সত্যও। কিন্তু লেখকের মতে, পিট হেগসেথের উচিত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের গণ্ডি ছেড়ে হার্ভার্ডে এসে বাস্তবতা দেখা। বিশেষ করে কিউল্যাবের একটি অধিবেশনে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তাগুলো শোনা উচিত, যারা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং

হার্ভার্ডে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উত্থান, পিট হেগসেথের দেখা উচিত কিউল্যাব

০৮:১৯:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

ট্রাম্প প্রশাসন যখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে তথাকথিত “অতি উদারপন্থী” সংস্কৃতির কেন্দ্র বলে আক্রমণ করছে, তখন সেখানে এক অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা “কিউল্যাব” নামে একটি প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি ইনকিউবেটরের মাধ্যমে নতুন উদ্যোগ গড়ে তুলতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

১৮ ফেব্রুয়ারির একটি ঘটনা এই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেদিন কিউল্যাবের শিক্ষার্থী উদ্যোক্তারা সাক্ষাৎ করেন টমাস “প্যাট” পেইনের সঙ্গে। তিনি সাবেক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট মেজর, যিনি ইরাকে অসাধারণ সাহসিকতার জন্য ২০২০ সালে ‘মেডেল অব অনার’ পান। বর্তমানে তিনি হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের শিক্ষার্থী। তাঁর লক্ষ্য, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নির্মাতাদের সামনে সেই সৈনিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করবে।

পেইন যখন তাঁর মেডেল অব অনার শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন, তখন পুরো কক্ষ যেন আবেগে স্তব্ধ হয়ে যায়। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের শিক্ষার্থী ও সাবেক আর্মি ক্যাপ্টেন নিক মেইনস বলেন, সেই মুহূর্তে সবাই যেন শিহরিত হয়ে পড়েছিল। পেইনের বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি শুধু আকর্ষণীয় কোনো উদ্ভাবন নয়; এটি জীবন বাঁচায়, আবার প্রয়োজনে জীবনও কেড়ে নেয়।

এই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা দেন, পেন্টাগন আর হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলে সামরিক ফেলো পাঠাবে না। তাঁর অভিযোগ ছিল, সেখানে গেলে সামরিক কর্মকর্তারা “বৈশ্বিকতাবাদী ও উগ্র মতাদর্শে” প্রভাবিত হয়ে ফিরে আসেন। হেগসেথ হার্ভার্ডকে “আমেরিকাবিরোধী সক্রিয়তার উত্তপ্ত কেন্দ্র” বলেও কটাক্ষ করেন।

কিন্তু “ওক” সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই রাজনৈতিক প্রচারণা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলমান এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে আড়াল করছে। বিল গেটস ও মার্ক জাকারবার্গের মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্ম দেওয়া হার্ভার্ড এখন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা খাতের প্রতিও নতুন আগ্রহ দেখাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী এখনও প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী, তবে একই সঙ্গে তারা এমন ব্যবসা গড়ে তুলতে চায় যা দেশকে আরও নিরাপদ করবে।

এই পরিবর্তন আসলে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতের বৃহত্তর বিপ্লবের অংশ। একসময় এই খাতের নিয়ন্ত্রণ ছিল লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান বা বোয়িংয়ের মতো বিশাল আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের হাতে। তারা যুদ্ধবিমান বা বিমানবাহী জাহাজের মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্র তৈরি করত, যেগুলোর অনেকগুলোই পরে অকার্যকারিতা ও ব্যয়ের সমালোচনায় পড়ে। এখন সেই খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্যালান্টিয়ারের অ্যালেক্স কার্প কিংবা অ্যান্ডুরিলের পামার লাকির মতো ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোক্তারা। তাঁদের হাত ধরে একসময়ের ধীরগতির শিল্পখাত এখন দ্রুত পরিবর্তনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

কিউল্যাব এই পরিবর্তনেরই একটি সূচক। চলতি শিক্ষাবর্ষে হার্ভার্ড ও এমআইটির ১২০টি শিক্ষার্থী দল এতে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছিল। জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ গড়ে তুলতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের পরামর্শ ও সহায়তা দেয় কিউল্যাব। কিন্তু আবেদনকারীদের মধ্যে মাত্র ২০টি দল নির্বাচিত হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ছিল প্রায় হার্ভার্ডে ভর্তি হওয়ার মতোই কঠিন।

এখানে কেবল তাত্ত্বিক প্রকল্প তৈরি হচ্ছে না, বরং বাস্তব কোম্পানি গড়ে উঠছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিউল্যাব শুরু হওয়ার পর ৩৪টি দলের মধ্যে ২০টি প্রাথমিক বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে এবং ১১টি দল সরকারি চুক্তি পেয়েছে। এ তথ্য দিয়েছেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের ইন্টেলিজেন্স প্রজেক্টের প্রধান ও সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা মার্ক পাসকালে। তিনি ও আরও কয়েকজন সাবেক গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের সরকারি সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলতে সহায়তা করছেন।

Hegseth takes military culture war to civilian universities

কিউল্যাবের ধারণা আসে দুই সাবেক সেনাসদস্যের উদ্যোগ থেকে। নিক মেইনস এবং বিমানবাহিনীর সাবেক সদস্য রায়ান হোল্টে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের রাগবি দলে পরিচিত হন। সামরিক জীবন শেষে তাঁরা মনে করেছিলেন, কাজের প্রতি তাঁদের আগের উদ্দীপনা হারিয়ে গেছে। তাই ২০২৪ সালের শরতে তাঁরা একটি বিজ্ঞপ্তি ছড়ান, যেখানে লেখা ছিল, “জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন কিছু করতে চান?” এরপর মার্ক পাসকালে তাঁদের কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারে জায়গা, পরামর্শ এবং নেটওয়ার্কিং সহায়তা দেন।

প্রথম আহ্বানেই ৭০টি দল আবেদন করে। নির্বাচিত ১৬টি দল নিয়মিত বৈঠক শুরু করে এবং নিজেদের ধারণা ও যোগাযোগ ভাগাভাগি করতে থাকে। প্রথম বক্তা ছিলেন সাবেক নেভি সিল ও হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ব্র্যান্ডন সেং, যিনি পরে ‘শিল্ড এআই’ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে কোম্পানিটির মূল্য ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

গত সেপ্টেম্বরে লেখক কিউল্যাবের নতুন সেশনে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে এপ্রিল মাসে তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করলে বেশ কিছু চমকপ্রদ সাফল্যের গল্প সামনে আসে।

হার্ভার্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী কুশান উইরাকুন জানান, তিনি ২০২৫ সালে “প্রোডেক্স ল্যাবস” নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। কিউল্যাবের সহায়তায় গড়া এই কোম্পানি এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা ও সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা আগেভাগে বিশ্লেষণ করতে পারে। এলথ্রিহ্যারিস নামে একটি বড় প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ছিল তাদের প্রথম দিকের গ্রাহকদের একটি। বর্তমানে তিনি কয়েকটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন, যারা দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

উইরাকুনের পরিবার শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে আসে। মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি ৭৫ লাখ ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হয়েছেন। তাঁর গল্প হার্ভার্ডের নতুন পরিবর্তনের প্রতীক, যেখানে একসময় জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়কে দূরে রাখা হলেও এখন উদ্ভাবনের মাধ্যমে তা গ্রহণ করা হচ্ছে।

আরেক উদ্যোক্তা স্টিফেন বুকানান, যিনি সাবেক আর্মি গ্রিন বেরেট সদস্য এবং মে মাসে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে স্নাতক হবেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান “ব্যান্ডেলিয়ার টেকনোলজিস” কোয়ান্টাম প্রযুক্তিভিত্তিক এমন একটি ট্র্যাকিং ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা জিপিএসের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। বুকানান বলেন, ইরাকে সামরিক অভিজ্ঞতা এবং হার্ভার্ডের শিক্ষা মিলিয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতির উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি করতে পেরেছেন।

তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ২৪ লাখ ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে, পাশাপাশি লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সহায়তাও অর্জন করেছে। এছাড়া পেন্টাগনের “গোল্ডেন ডোম” ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে কাজের জন্যও তারা প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছে। বুকানানের মতে, কিউল্যাব এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে ভিন্ন পটভূমির মানুষ একসঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতে পারছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন হার্ভার্ডকে দীর্ঘদিন ধরে সামরিকবিরোধী উদারপন্থী অভিজাতদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। সমালোচনার কিছু অংশ হয়তো সত্যও। কিন্তু লেখকের মতে, পিট হেগসেথের উচিত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের গণ্ডি ছেড়ে হার্ভার্ডে এসে বাস্তবতা দেখা। বিশেষ করে কিউল্যাবের একটি অধিবেশনে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তাগুলো শোনা উচিত, যারা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।