হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি আরও তীব্র হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিমড)-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি মৌসুমি বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিল।
আইসিমড জানিয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আটটি দেশের মধ্যে চারটি দেশে ২০২৫ সালে ১০টির বেশি বড় ধরনের দুর্যোগের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে থাকা এই অঞ্চল ক্রমেই প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে
জরুরি ঘটনাবলির আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডার ‘ইএম-ডাটা’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোতে দুর্যোগজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ছিল। এসব ক্ষতির বেশিরভাগই বন্যা, ভূমিধস ও ঝড়ের মতো পানিসংশ্লিষ্ট দুর্যোগ থেকে এসেছে। ২০২৫ সালেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
এই অঞ্চলে চলতি বছরে প্রায় ১২ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত বা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কিছু এলাকায় হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণজনিত বন্যার ঘটনাও ঘটেছে, যা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্বব্যাপী ২০২৫ সালে দুর্যোগজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তুলনামূলকভাবে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি দেখাচ্ছে, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কারণে এই অঞ্চলে দুর্যোগের প্রভাব অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠছে।
একসঙ্গে বাড়ছে একাধিক ঝুঁকি
গবেষকেরা বলছেন, বর্তমানে এই অঞ্চলে ‘মাল্টি-হ্যাজার্ড’ বা বহুমাত্রিক দুর্যোগের প্রবণতা বাড়ছে। অর্থাৎ একই সময়ে একাধিক দুর্যোগ ঘটছে, অথবা একটি দুর্যোগ অন্যটির জন্ম দিচ্ছে।
এর উদাহরণ হিসেবে ভারতের উত্তরাখণ্ডে ২০১৩ সালের কেদারনাথ বন্যা, ২০২৩ সালে সিকিমে সাউথ লোনাক হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা এবং ২০২১ সালে নেপালের মেলামচি বন্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
আইসিমডের মহাপরিচালক পেমা গ্যমতশো বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাহাড়ি এলাকায় বন্যা, ভূমিধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগ একসঙ্গে ঘটছে। এতে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও জরুরি সেবাখাতের ক্ষতি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে এবং দুর্যোগের ধরনও জটিল হয়ে উঠছে।

প্রস্তুতি বাড়লেও উদ্বেগ রয়ে গেছে
১৯৭৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের পর থেকে এই অঞ্চলে দুর্যোগে মৃত্যুর হার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তথ্যসংগ্রহের সীমাবদ্ধতা এ প্রবণতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও দুর্যোগ প্রস্তুতির উন্নতিও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
আইসিমডের জলবিদ্যাবিদ মনীশ শ্রেষ্ঠা বলেন, পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক হলেও ২০১৩ সালের পর প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি উন্নত জলবায়ু সেবা ও প্রস্তুতির ফল হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ঝুঁকি যেভাবে বাড়ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও পরিকল্পনায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আগাম সতর্কতায় কমছে ক্ষয়ক্ষতি
কিছু বন্যাপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। পূর্ব নেপালের খাণ্ডো নদীর তীরবর্তী এলাকায় ২০২৪ সালে বন্যার আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে দুর্যোগজনিত ক্ষতি কমাতে উন্নয়ন ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় বহুমাত্রিক ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়লে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















