শিশুর জন্মের পর মায়ের বুকের দুধ কম হওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—এটি খুবই বিরল সমস্যা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়মিত দুধ খাওয়ানো বা পাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক নারীর ক্ষেত্রে দুধ কম হওয়ার পেছনে রয়েছে জৈবিক ও শারীরিক কারণ, যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোতে সন্তান জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা মায়েদের একটি বড় অংশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা বন্ধ করে দেন। কারণ তারা পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদন করতে পারেন না বলে আশঙ্কা করেন। আগে ধারণা করা হতো, প্রকৃত অর্থে কম দুধ উৎপাদনের ঘটনা পাঁচ শতাংশেরও কম। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই হার ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে উঠে এসেছে।

দুধ উৎপাদনের পেছনে কী ঘটছে
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মায়ের স্তনে থাকা বিশেষ কোষ ‘ল্যাক্টোসাইট’ দুধ উৎপাদনের মূল কাজ করে। গর্ভাবস্থায় এই কোষ দ্রুত বাড়ে এবং সন্তান জন্মের কয়েকদিন পর দুধ তৈরি শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নারীর শরীরে এই কোষের সংখ্যা কম থাকে অথবা কোষগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ফলে পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদন হয় না।
গবেষকরা আরও বলছেন, এই সমস্যার পেছনে ডিএনএ ত্রুটি, কোষ মেরামতের ব্যর্থতা এবং কিছু হরমোনজনিত জটিলতা কাজ করতে পারে। বিশেষ করে গর্ভকালীন প্লাসেন্টার সমস্যার সঙ্গে দুধ কম হওয়ার সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও এখন পরীক্ষা করা হচ্ছে।
প্রদাহ ও শারীরিক অসুস্থতার প্রভাব

স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং অটোইমিউন রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত সমস্যাও দুধ উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এসব অবস্থায় শরীরের ফ্যাটি অ্যাসিড স্তনে সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। ফলে দুধ তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
এছাড়া কিছু নারীর শরীরে জিংক পরিবহনের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তনও পাওয়া গেছে, যা দুধ উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। গবেষকদের মতে, এ ধরনের কারণ খুব বেশি সাধারণ না হলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কলঙ্ক ভাঙছে নতুন গবেষণা
দীর্ঘদিন ধরে অনেক নারীকে বলা হতো, তারা যথেষ্ট চেষ্টা করছেন না বলেই দুধ কম হচ্ছে। কিন্তু নতুন গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। গবেষকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই এটি মায়ের ইচ্ছা বা প্রচেষ্টার বিষয় নয়, বরং শারীরিক জটিলতার ফল। ফলে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক চাপ ও অপরাধবোধ কমানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে আগে থেকেই বোঝা যাবে কোন মায়ের দুধ কম হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে দ্রুত চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে কিছু গবেষণায় বুকের দুধে সোডিয়ামের মাত্রা মাপার প্রযুক্তি নিয়েও কাজ চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















