যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে শনিবার একসঙ্গে অনুষ্ঠিত দুই বড় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গেছে। ডানপন্থী কর্মী টমি রবিনসনের নেতৃত্বে ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ মিছিল এবং ফিলিস্তিনপন্থী ‘নাকবা ডে’ বিক্ষোভে অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় প্রায় চার হাজার পুলিশ সদস্য।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দিনভর বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় দুই পক্ষের সমর্থকদের মুখোমুখি অবস্থান, উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান এবং বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে।
রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রবিনসন
টমি রবিনসন, যার প্রকৃত নাম স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন, তার সমর্থকদের নিয়ে লন্ডনের কেন্দ্রে মিছিল করেন। মিছিলটি হোলবর্ন এলাকা থেকে শুরু হয়ে ট্রাফালগার স্কয়ার ও হোয়াইটহল পেরিয়ে পার্লামেন্ট স্কয়ারে গিয়ে শেষ হয়।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে রবিনসন সমর্থকদের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত হওয়া এখন জরুরি। মিছিলে অংশ নেওয়া অনেকে ইউনিয়ন জ্যাক, ইসরায়েলি পতাকা এবং প্রাক-বিপ্লবী ইরানি পতাকা বহন করেন। কোথাও কোথাও ‘স্টার্ট ডিপোর্টিং’ ধরনের স্লোগানও দেখা যায়।
তবে এই সমাবেশ ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী কয়েকটি গোষ্ঠীর সদস্যদেরও সেখানে দেখা গেছে। কিছু ব্যানারে অভিবাসীবিরোধী ও উগ্র স্লোগান লেখা ছিল।

ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে নাকবা স্মরণ
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে আয়োজিত নাকবা দিবসের বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের স্মরণে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।
বিক্ষোভকারীরা ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘ইসরায়েল একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। অনেকের হাতে ফিলিস্তিনি পতাকা ও প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনামূলক প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। কিছু অংশগ্রহণকারী মুখ ঢেকে মিছিলে যোগ দিলেও পুলিশ আগে থেকেই মুখোশ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে পল মল এলাকায় বক্তৃতা দেন ব্রিটিশ লেবার পার্টির বামঘরানার কয়েকজন নেতা। দুই বিক্ষোভস্থলের দূরত্ব খুব কম হলেও পুলিশ ব্যারিকেড ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ বাহিনী দিয়ে দুই পক্ষকে আলাদা রাখে।
কড়া অবস্থানে সরকার ও পুলিশ
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার আগেই সতর্ক করে বলেন, ঘৃণা ও বিভাজন ছড়ানোর চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। তিনি বিশেষভাবে ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও সহিংসতা বা বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ এই কর্মসূচিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় জননিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ড্রোন, হেলিকপ্টার, কুকুর ইউনিট এবং লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কিংস ক্রস এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানো হয়, যাতে পূর্বে সহিংস ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা যায়।
ইহুদি উপাসনালয় ঘিরেও উদ্বেগ
ওয়েস্টমিনস্টার সিনাগগের কাছ দিয়ে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল যাওয়ায় ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। উপাসনালয়ের পক্ষ থেকে মিছিলের রুট পরিবর্তনের অনুরোধ করা হলেও পুলিশ তা পরিবর্তন করেনি। এ নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
লন্ডনের এই দুই সমাবেশ আবারও দেখিয়ে দিল, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু এবং অভিবাসন প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন কতটা গভীর হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















