যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল প্রকাশের পর তা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এটি কার্যকর নিরাপত্তা নীতির চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। মাত্র ১৬ পাতার এই নথিতে বিস্তারিত পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা ও মতাদর্শিক অবস্থানই বেশি ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
নতুন কৌশলপত্রটি তৈরি করেছেন মার্কিন প্রশাসনের সন্ত্রাসবিরোধী প্রধান সেবাস্টিয়ান গোরকা। দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আলোচনায় থাকা এই কর্মকর্তা এবারও কঠোর ভাষা ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের মাধ্যমে নজর কাড়ছেন। তিনি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে চরম শক্তি প্রয়োগের পক্ষে এবং সেই অবস্থানই নতুন নীতিপত্রেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে প্রশ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, এই নথি নিরপেক্ষ নিরাপত্তা কৌশলের বদলে রাজনৈতিক প্রচারণামূলক ভাষায় ভরা। সেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সাধারণত এমন নথি দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার চেষ্টা করা হয়।
কৌশলপত্রে তিন ধরনের প্রধান হুমকির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাদকচক্রভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, ইসলামপন্থি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং সহিংস বামপন্থি উগ্রবাদ। তবে ডানপন্থি উগ্রবাদ বা ইরান যুদ্ধ-সংক্রান্ত ঝুঁকির বিষয়ে প্রায় কিছুই বলা হয়নি। এ কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে অসম্পূর্ণ ও একপেশে বলছেন।
মাদকচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান

নথিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মাদকচক্র দমনে। গত আট মাস ধরে ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। প্রশাসনের দাবি, এসব অভিযানে অন্তত ১৯২ জন নিহত হয়েছে এবং সমুদ্রপথে মাদক পাচার প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, সব ধরনের অপরাধী গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী হিসেবে দেখলে প্রকৃত সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে সীমিত সম্পদ ছড়িয়ে পড়বে এবং মূল হুমকি মোকাবিলা কঠিন হবে।
ইসলামপন্থি গোষ্ঠী ও আফ্রিকায় হামলা বৃদ্ধি
কৌশলপত্রে আল-কায়েদা ও আইএসের মতো পুরোনো ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখার কথাও বলা হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে বাহিনীর কার্যক্রম সহজ করতে কিছু নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে বিমান হামলার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

বিশেষ করে সোমালিয়ায় ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯০টি হামলা চালানো হয়েছে, যা আগের প্রশাসনের সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। প্রশাসনের দাবি, এতে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা এতে বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা করছেন।
ইউরোপকে লক্ষ্য করে কড়া মন্তব্য
নথিতে ইউরোপ নিয়েও তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত সীমান্তনীতির কারণে ইউরোপ এখন সন্ত্রাসবাদের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। ইউরোপকে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই ভাষা কূটনৈতিক মহলেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। অনেকের মতে, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বদলে এমন বক্তব্য সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব অনুপস্থিত
সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে ইরান যুদ্ধের প্রভাব পুরো নথিতে প্রায় অনুপস্থিত থাকার কারণে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার পেছনে এই সংঘাতের প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও কৌশলপত্রে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।
এদিকে হাজারো ফেডারেল এজেন্টকে অভিবাসন তদারকিতে সরিয়ে নেওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি ইরান-সংক্রান্ত হুমকি পর্যবেক্ষণকারী কয়েকজন এজেন্টকেও দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

ডানপন্থি সহিংসতা নিয়ে নীরবতা
নতুন কৌশলপত্রে বামপন্থি সহিংসতাকে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হলেও ডানপন্থি উগ্রবাদ প্রায় পুরোপুরি অনুপস্থিত। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডানপন্থি সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
তাদের আশঙ্কা, সন্ত্রাসবিরোধী নীতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে। এতে বাস্তব হুমকি চিহ্নিত করার বদলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















