বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি একসময় ভালো চাকরির নিশ্চয়তা হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু এখন সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের কারণে অনেক তরুণ মনে করছেন, তাদের প্রথম চাকরির সুযোগই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের নতুন গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির বাজার নিয়ে উদ্বেগ এখন তীব্র। বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করা শিক্ষার্থীদের পূর্ণকালীন চাকরি পাওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে যেসব বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত, সেসব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে।
চাকরির বাজারে হতাশা
সাম্প্রতিক একাধিক জরিপে দেখা গেছে, নতুন স্নাতকদের বড় অংশ মনে করছেন এটি ভালো চাকরি খোঁজার জন্য উপযুক্ত সময় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নিয়োগ কার্যক্রমও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহৃত চাকরি অনুসন্ধান প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়োগ বিজ্ঞাপন কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক তরুণের ধারণা, এআই এখন শুধু কাজ সহজ করছে না, বরং মানুষের চাকরিও কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই এন্ট্রি-লেভেলের কিছু কাজ প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার চিন্তা করছে। ফলে নতুন কর্মীদের জন্য সুযোগ কমছে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ প্রযুক্তিখাতে
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব বিষয়ে এআইয়ের প্রভাব বেশি, সেসব বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। কম্পিউটার সায়েন্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিভাগে পূর্ণকালীন চাকরির হার কয়েক বছরের মধ্যে বড় ধরনের পতন দেখেছে।
২০২২ সালের পর থেকে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। বড় ভাষাভিত্তিক এআই প্রযুক্তির বিস্তার শুরু হওয়ার পর প্রযুক্তিখাতে নতুনদের নিয়োগ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আগে যেখানে এসব বিভাগে চাকরির সুযোগ স্থিতিশীল ছিল, এখন সেখানে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং নিয়োগ কমেছে।
অন্যদিকে শিক্ষা, দর্শন বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিষয়ে তুলনামূলক কম প্রভাব দেখা গেছে। এসব ক্ষেত্রে চাকরির হার কিছুটা কমলেও তা প্রযুক্তিখাতের মতো বড় নয়।
শিক্ষার্থীদের পছন্দও বদলাচ্ছে
চাকরির অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রবণতার ওপরও। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, কম্পিউটার সায়েন্সে শিক্ষার্থী ভর্তি কমে গেছে। বিশেষ করে কোডিংভিত্তিক কোর্সগুলোর প্রতি আগ্রহ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
অনেক শিক্ষার্থী এখন এমন বিষয় বেছে নিতে চাইছেন, যেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুরুত্ব বেশি। কারণ তারা মনে করছেন, এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি পুরোপুরি মানুষের বিকল্প হতে পারবে না।
কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিখাতে কাজ পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে নতুন কর্মীদের বেশি সময় কোড লেখায় ব্যয় হতো, এখন সেখানে সফটওয়্যার পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও বড় কাঠামো তৈরির দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ বুঝতে পারছেন। তবে তাদের মতে, প্রযুক্তিখাত সবসময় পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে। তাই নতুন বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের দক্ষতা বদলাতে হবে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
এআই কি সত্যিই নতুন প্রজন্মের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে, নাকি এটি শুধু শ্রমবাজারের স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ—এ নিয়ে বিতর্ক এখনও চলছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চাকরির বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চাপ এখন পড়ছে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















