০৩:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
নীতিনির্ধারকদের জন্য বাজারের সতর্কবার্তা: ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে আস্থার সংকট কতটা গভীর? পেটের মেদ বাড়লে বাড়ে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি, জানুন নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায় ধর্ষণ মামলার পর আত্মগোপন, অপহরণের দাবিও ভুয়া: শিবির নেতার বিরুদ্ধে নতুন বিতর্ক সিঙ্গুরে টাটাদের ফেরানোর আশ্বাস, বিনিয়োগ টানতে নতুন রোডম্যাপের ইঙ্গিত ইরানঘেঁষা তেলবাহী জাহাজে হামলা ঘিরে উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া প্রতিবাদ ভারতের ব্রিটেনে রাষ্ট্রীয় মালিকানা বিতর্ক নতুন করে জোরালো, কিন্তু সমাধান কি সত্যিই সেখানে?  ভারতে  খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৩.৯ শতাংশে, ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ন্যাটোর দিকে ঝুঁকছে তুরস্ক, বদলে যাচ্ছে আঙ্কারার কৌশল বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিতর্কের ছায়া, কেলেঙ্কারি পেরিয়েই ফুটবলের মহোৎসব বিশ্বকাপ জিততে কী লাগে: অর্থ আর উচ্চতার চেয়েও বড় শক্তি অভিবাসন ও উন্মুক্ত সমাজ

‘দ্য জাপানিজ ওয়ে অব প্যারেন্টিং’ বইয়ে জাপানি মাতৃত্বের অদৃশ্য শ্রম ও আধুনিক পরিবারের নতুন প্রশ্ন

মাতৃত্বকে আমরা প্রায়ই ভালোবাসা, ত্যাগ আর দায়িত্বের এক নরম আবেগময় ফ্রেমে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন, জটিল এবং কাঠামোগত। শিশুর খাবার তৈরি থেকে তার সামাজিক আচরণ গড়ে তোলা, পরিবারের আবেগিক ভারসাম্য ধরে রাখা থেকে প্রতিদিনের অদৃশ্য সংগঠন—এই বিশাল শ্রমের বড় অংশটিই পৃথিবীর বহু সমাজে এখনো মায়েদের কাঁধে। জাপানি সমাজের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে সামনে আনে। কারণ সেখানে মাতৃত্ব শুধু একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

লিসা কাটায়ামার সাম্প্রতিক বই ‘দ্য জাপানিজ ওয়ে অব প্যারেন্টিং’ জাপানি মাতৃত্ব ও শিশুপালনের এই গভীর সংস্কৃতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, কীভাবে জাপানি পরিবার ও বিদ্যালয় শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এমন এক সামাজিক চেতনার মধ্যে বড় করে, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের প্রতি দায়বদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিশুরা নিজের কাজ নিজে করা শেখে, সমষ্টিগত পরিচ্ছন্নতায় অংশ নেয়, সহপাঠীদের জন্য খাবার পরিবেশন করে, এমনকি দৈনন্দিন আচরণের মধ্যেও অন্যের কথা ভাবার অভ্যাস গড়ে তোলে।

এই শিক্ষার ফল যে দৃশ্যমান, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আত্মনির্ভর, নিয়মানুবর্তী এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল শিশু তৈরি করতে জাপানি পদ্ধতির কার্যকারিতা বহুদিন ধরেই আলোচিত। কিন্তু এই সফলতার পেছনে যে বিপুল অদৃশ্য শ্রম কাজ করে, সেটি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। আর সেই শ্রমের কেন্দ্রে থাকে মা।

জাপানে সন্তান জন্মের আগেই একজন নারীকে যে বিশদ মাতৃত্ব নির্দেশিকা দেওয়া হয়, তা একদিকে রাষ্ট্রের যত্নশীল মনোভাবের প্রতীক, অন্যদিকে মাতৃত্বকে অত্যন্ত উচ্চ মানদণ্ডে বেঁধে ফেলারও একটি সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। শিশুর খাবার কেমন হবে, আচরণ কেমন হওয়া উচিত, কোন বয়সে কী শেখাতে হবে—সবকিছুর উপর এক ধরনের নীরব সামাজিক প্রত্যাশা কাজ করে। ফলে অনেক মা মনে করেন, সন্তানের প্রতিটি ছোট ব্যর্থতাও যেন তাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা।

এই চাপ কেবল মানসিক নয়, সাংস্কৃতিকও। জাপানি সমাজে যত্নকে প্রায়ই সেবামূলক কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। একটি নিখুঁত বেন্টো বক্স, ঘরের নিখুঁত সংগঠন, সন্তানের প্রতিটি প্রয়োজন আগে থেকে বুঝে নেওয়া—এসবকে ভালো মায়ের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই “নিখুঁত যত্ন” ধারণা কি নারীদের উপর অসম ও অস্বাস্থ্যকর চাপ তৈরি করছে না?

সমস্যাটি এখানেই যে, সমাজ প্রায়ই এই শ্রমকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করা হয়, কিন্তু সেই মহিমান্বিত অবস্থানের ভেতরে থাকা ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মত্যাগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একজন মা যদি নিজের জন্য সময় চান, যদি তিনি কিছু দায়িত্ব ভাগ করতে চান, তবে বহু সমাজেই সেটিকে এখনো অপরাধবোধের সঙ্গে দেখা হয়।

তবে পরিবর্তনের লক্ষণও স্পষ্ট। জাপানে এখন আগের তুলনায় বেশি বাবা সন্তান পালনে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। পিতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার হার বাড়ছে। একই সঙ্গে বহু নারী প্রশ্ন তুলছেন—মাতৃত্ব কি অবশ্যই নারীর একমাত্র বা প্রধান পরিচয় হবে? কেউ কেউ সন্তানকে কিছুটা স্বাধীনভাবে বড় করার পথ বেছে নিচ্ছেন, কেউ নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে সামনে আনছেন।

এই পরিবর্তন কেবল জাপানের নয়; এটি বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ। আধুনিক পরিবার ক্রমেই বুঝতে শিখছে যে, সমষ্টিগত যত্নের ধারণা তখনই কার্যকর হয়, যখন সেই যত্নের বোঝা এক ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। শিশু বড় করা একটি সামাজিক কাজ, কিন্তু সেই সমাজ যদি মায়েদের একাই সবকিছু বহন করতে বাধ্য করে, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত যত্নের নয়, বৈষম্যের সংস্কৃতি তৈরি করে।

জাপানি মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা তাই দ্বৈত শিক্ষা দেয়। একদিকে এটি দেখায়, পরিবার ও সমাজ মিলে কীভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে এটি সতর্কও করে—যদি সেই প্রক্রিয়ায় নারীর ব্যক্তিসত্তা, বিশ্রাম ও স্বাধীনতা হারিয়ে যায়, তবে যত্নের সংস্কৃতিই একসময় নিঃশব্দ শোষণে পরিণত হয়।

আজকের পৃথিবীতে মাতৃত্ব নিয়ে সবচেয়ে জরুরি আলোচনা সম্ভবত এটিই: একজন ভালো মা হওয়ার আগে একজন নারীকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দেওয়া হচ্ছে কি না।

জনপ্রিয় সংবাদ

নীতিনির্ধারকদের জন্য বাজারের সতর্কবার্তা: ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে আস্থার সংকট কতটা গভীর?

‘দ্য জাপানিজ ওয়ে অব প্যারেন্টিং’ বইয়ে জাপানি মাতৃত্বের অদৃশ্য শ্রম ও আধুনিক পরিবারের নতুন প্রশ্ন

০৯:৩০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

মাতৃত্বকে আমরা প্রায়ই ভালোবাসা, ত্যাগ আর দায়িত্বের এক নরম আবেগময় ফ্রেমে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন, জটিল এবং কাঠামোগত। শিশুর খাবার তৈরি থেকে তার সামাজিক আচরণ গড়ে তোলা, পরিবারের আবেগিক ভারসাম্য ধরে রাখা থেকে প্রতিদিনের অদৃশ্য সংগঠন—এই বিশাল শ্রমের বড় অংশটিই পৃথিবীর বহু সমাজে এখনো মায়েদের কাঁধে। জাপানি সমাজের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে সামনে আনে। কারণ সেখানে মাতৃত্ব শুধু একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

লিসা কাটায়ামার সাম্প্রতিক বই ‘দ্য জাপানিজ ওয়ে অব প্যারেন্টিং’ জাপানি মাতৃত্ব ও শিশুপালনের এই গভীর সংস্কৃতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, কীভাবে জাপানি পরিবার ও বিদ্যালয় শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এমন এক সামাজিক চেতনার মধ্যে বড় করে, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের প্রতি দায়বদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিশুরা নিজের কাজ নিজে করা শেখে, সমষ্টিগত পরিচ্ছন্নতায় অংশ নেয়, সহপাঠীদের জন্য খাবার পরিবেশন করে, এমনকি দৈনন্দিন আচরণের মধ্যেও অন্যের কথা ভাবার অভ্যাস গড়ে তোলে।

এই শিক্ষার ফল যে দৃশ্যমান, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আত্মনির্ভর, নিয়মানুবর্তী এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল শিশু তৈরি করতে জাপানি পদ্ধতির কার্যকারিতা বহুদিন ধরেই আলোচিত। কিন্তু এই সফলতার পেছনে যে বিপুল অদৃশ্য শ্রম কাজ করে, সেটি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। আর সেই শ্রমের কেন্দ্রে থাকে মা।

জাপানে সন্তান জন্মের আগেই একজন নারীকে যে বিশদ মাতৃত্ব নির্দেশিকা দেওয়া হয়, তা একদিকে রাষ্ট্রের যত্নশীল মনোভাবের প্রতীক, অন্যদিকে মাতৃত্বকে অত্যন্ত উচ্চ মানদণ্ডে বেঁধে ফেলারও একটি সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। শিশুর খাবার কেমন হবে, আচরণ কেমন হওয়া উচিত, কোন বয়সে কী শেখাতে হবে—সবকিছুর উপর এক ধরনের নীরব সামাজিক প্রত্যাশা কাজ করে। ফলে অনেক মা মনে করেন, সন্তানের প্রতিটি ছোট ব্যর্থতাও যেন তাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা।

এই চাপ কেবল মানসিক নয়, সাংস্কৃতিকও। জাপানি সমাজে যত্নকে প্রায়ই সেবামূলক কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। একটি নিখুঁত বেন্টো বক্স, ঘরের নিখুঁত সংগঠন, সন্তানের প্রতিটি প্রয়োজন আগে থেকে বুঝে নেওয়া—এসবকে ভালো মায়ের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই “নিখুঁত যত্ন” ধারণা কি নারীদের উপর অসম ও অস্বাস্থ্যকর চাপ তৈরি করছে না?

সমস্যাটি এখানেই যে, সমাজ প্রায়ই এই শ্রমকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করা হয়, কিন্তু সেই মহিমান্বিত অবস্থানের ভেতরে থাকা ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মত্যাগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একজন মা যদি নিজের জন্য সময় চান, যদি তিনি কিছু দায়িত্ব ভাগ করতে চান, তবে বহু সমাজেই সেটিকে এখনো অপরাধবোধের সঙ্গে দেখা হয়।

তবে পরিবর্তনের লক্ষণও স্পষ্ট। জাপানে এখন আগের তুলনায় বেশি বাবা সন্তান পালনে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। পিতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার হার বাড়ছে। একই সঙ্গে বহু নারী প্রশ্ন তুলছেন—মাতৃত্ব কি অবশ্যই নারীর একমাত্র বা প্রধান পরিচয় হবে? কেউ কেউ সন্তানকে কিছুটা স্বাধীনভাবে বড় করার পথ বেছে নিচ্ছেন, কেউ নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে সামনে আনছেন।

এই পরিবর্তন কেবল জাপানের নয়; এটি বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ। আধুনিক পরিবার ক্রমেই বুঝতে শিখছে যে, সমষ্টিগত যত্নের ধারণা তখনই কার্যকর হয়, যখন সেই যত্নের বোঝা এক ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। শিশু বড় করা একটি সামাজিক কাজ, কিন্তু সেই সমাজ যদি মায়েদের একাই সবকিছু বহন করতে বাধ্য করে, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত যত্নের নয়, বৈষম্যের সংস্কৃতি তৈরি করে।

জাপানি মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা তাই দ্বৈত শিক্ষা দেয়। একদিকে এটি দেখায়, পরিবার ও সমাজ মিলে কীভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে এটি সতর্কও করে—যদি সেই প্রক্রিয়ায় নারীর ব্যক্তিসত্তা, বিশ্রাম ও স্বাধীনতা হারিয়ে যায়, তবে যত্নের সংস্কৃতিই একসময় নিঃশব্দ শোষণে পরিণত হয়।

আজকের পৃথিবীতে মাতৃত্ব নিয়ে সবচেয়ে জরুরি আলোচনা সম্ভবত এটিই: একজন ভালো মা হওয়ার আগে একজন নারীকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দেওয়া হচ্ছে কি না।