আধুনিক গণতন্ত্রে ভোটারদের ক্ষোভ এখন সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক মুদ্রা। যে দল সেই ক্ষোভকে ভাষা দিতে পারে, সে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। বরং ইতিহাস বলছে, এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধানই অনেক সময় একটি রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
ব্রিটেনের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকি এড়ানোর সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। অনেকের কাছে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্র এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে যেখানে নিয়ম মেনে চলাই উদ্দেশ্য, সমস্যার সমাধান নয়।
এই পরিবেশে প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে থাকা শক্তিগুলো স্বাভাবিকভাবেই সুযোগ পাচ্ছে। তারা নিজেদের এমন একটি বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে, যারা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত। ভোটারদের একাংশও মনে করছেন, পুরোনো কাঠামো যদি কাজ না করে, তাহলে নতুন ও অপ্রচলিত নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

তবে এই জনপ্রিয়তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরেকটি বাস্তবতা। কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন যদি কেবল জনঅসন্তোষের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তার ভেতরে সুসংগঠিত নেতৃত্ব, নীতিগত সামঞ্জস্য এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা না থাকে, তাহলে ক্ষমতায় পৌঁছানোর আগেই তার দুর্বলতা প্রকাশ পেতে শুরু করে।
একটি সরকার পরিচালনা কেবল আকর্ষণীয় বক্তৃতা বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সমালোচনার ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজন দক্ষ মন্ত্রী, সমন্বিত নীতি, শৃঙ্খলাবদ্ধ দলীয় কাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি। এসবের কোনো একটি দুর্বল হলেও জনগণের আস্থা দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে।
ব্রিটেনে বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কে অর্থায়ন, প্রার্থীদের অতীত, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং দলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো মূলত একটি বৃহত্তর বিষয়কে সামনে আনছে। জনগণ হয়তো বিতর্কিত কোনো ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে উপেক্ষা করতে পারে, যদি তারা বিশ্বাস করে যে দলটি দেশের জন্য কার্যকর পরিবর্তন আনতে সক্ষম। কিন্তু সেই বিশ্বাস ধরে রাখতে হলে দলকে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতেই হবে।
এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক সিদ্ধান্ত এমনভাবে নেওয়া হয়েছে, যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল তাৎক্ষণিক ঝুঁকি এড়ানো বা প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করা। কিন্তু সেই সতর্কতার রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই নতুন ঝুঁকির জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতি, জ্বালানি, নিরাপত্তা, অভিবাসন কিংবা অবকাঠামো—বিভিন্ন ক্ষেত্রে জমে থাকা সমস্যাগুলো মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করেছে যে, বর্তমান ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে না।
ফলে ভোটাররা এখন এমন নেতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, যারা প্রচলিত নিয়ম ভাঙার কথা বলছে। কিন্তু নিয়ম ভাঙার সাহস থাকাই যথেষ্ট নয়; তার জায়গায় আরও ভালো একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতাও থাকতে হবে। অন্যথায় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি খুব দ্রুত অনিশ্চয়তায় পরিণত হতে পারে।
গণতন্ত্রে ক্ষোভ একটি শক্তিশালী চালিকা শক্তি। এটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে সফল রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, সুসংগঠিত নেতৃত্ব এবং বাস্তবসম্মত নীতির সমন্বয়। জনরোষ একটি রাজনৈতিক ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সেই ঢেউয়ের ওপর ভর করে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে শক্ত হাতে হাল ধরতে জানতে হয়। আর সেখানেই জনপ্রিয় আন্দোলন ও সফল সরকারের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জুলিয়েট স্যামুয়েল 


















