বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট শুধু ডলার, মূল্যস্ফীতি বা ব্যাংক খাত নয়। ভেতরে ভেতরে আরও বড় একটি কাঠামোগত দুর্বলতা অর্থনীতিকে আটকে দিচ্ছে—উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অক্ষমতা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের গতি কমে যাওয়ায় শুধু সরকারি উন্নয়ন থমকে যাচ্ছে না, একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ ছাড়, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ৪১.৪১ শতাংশে। জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ৮৬ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত এডিপির আকার দুই লাখ আট হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ শেষ দুই মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ না করলে লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই ধীরগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য বলছে, একই সময়ে বিদেশি ঋণ ছাড় কমেছে প্রায় ৯৩ কোটি ডলার। বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতিও কমে গেছে প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কেন অর্থনীতির কেন্দ্রীয় সমস্যা
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়ননির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেলে এগিয়েছে। কিন্তু প্রকল্প নেওয়ার চেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক, বিদ্যুৎ, বন্দর, রেল, শিল্পাঞ্চল—সবখানেই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে, সময় বাড়ছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে ধীরে।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয়ের বড় সমস্যা হচ্ছে দুর্বল পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোতে এখন একটি “ইমপ্লিমেন্টেশন ক্রাইসিস” তৈরি হয়েছে। অর্থ আছে, প্রকল্প আছে, বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতিও আছে—কিন্তু কাজ এগোয় না। ফলে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরাও ধীরে ধীরে সতর্ক হয়ে উঠছে।
আইএমএফ তাদের ২০২৫ সালের আর্টিকেল ফোর পর্যালোচনায় স্পষ্টভাবে বলেছে, বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের জন্য শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর সংস্কার জরুরি। দুর্বল রাজস্ব কাঠামো, ব্যাংক খাতের সমস্যা এবং নীতিগত ধীরগতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এফডিআই আসছে না
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বৈপরীত্য দেখা যায়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ভালো হলেও এফডিআই প্রবাহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম।
আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এফডিআই প্রবাহ সমমানের উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় অত্যন্ত কম। এর ফলে প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্প বৈচিত্র্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধির তথ্য দিলেও সামগ্রিক চিত্র এখনো দুর্বল। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে নিট এফডিআই কমেছে টানা চতুর্থ বছরের মতো।
এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে—
নীতিগত অনিশ্চয়তা
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল নীতি চায়। কিন্তু বাংলাদেশে করনীতি, আমদানি নীতি, ডলার ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং খাতে প্রায়ই আকস্মিক পরিবর্তন আসে। এতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি বেশি দেখেন।
ডলার ও মুনাফা প্রত্যাবাসনের সমস্যা
অনেক বিদেশি কোম্পানি সময়মতো লভ্যাংশ বা মুনাফা দেশে পাঠাতে পারছে না। ডলার সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় আঘাত দিয়েছে।
অবকাঠামো আছে, কিন্তু কার্যকারিতা কম
মেগা প্রকল্প হয়েছে, কিন্তু শিল্প উৎপাদন ও লজিস্টিকস খরচ কমেনি প্রত্যাশামতো। বন্দর জট, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, গ্যাস সংকট এবং ধীর কাস্টমস ব্যবস্থা এখনো বড় সমস্যা।
এডিবির বিনিয়োগ সংস্কারবিষয়ক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের দুর্বলতা।
দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক অদক্ষতা
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু কর ছাড় দেখে না, তারা দেখে আদালতের কার্যকারিতা, চুক্তি বাস্তবায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং সরকারি দপ্তরের সক্ষমতা। বাংলাদেশে এখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
এডিপি ধীর হলে কেন বিদেশি ঋণও কমে
বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগই বৈদেশিক ঋণনির্ভর। কিন্তু প্রকল্পের কাজ না এগোলে উন্নয়ন সহযোগীরাও অর্থ ছাড় করে না। অর্থাৎ বাস্তবায়ন ধীর হলে ঋণের অর্থও আটকে যায়।
ইআরডির কর্মকর্তারাও বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের সক্ষমতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ব্যস্ততা ঋণ ছাড় কমার বড় কারণ। এর ফলে একদিকে নতুন অর্থ আসছে কম, অন্যদিকে পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ বাড়ছে।
এখন বাংলাদেশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নতুন প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে পুরোনো প্রকল্প শেষ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামনে কী ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি সতর্ক করেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং কমে যাওয়া বেসরকারি বিনিয়োগের চাপের মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে আইএমএফ বলছে, স্থায়ী প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশকে রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে—দেশ কি শুধু বড় প্রকল্প ঘোষণা করবে, নাকি বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়াবে? কারণ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে বিদেশি ঋণ কমবে, বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান কমবে এবং প্রবৃদ্ধির গতি আরও দুর্বল হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















