ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত শুরু হওয়ায় দেশে হামের সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তারা। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদের আগে ও পরে গণপরিবহন, লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ভিড় বাড়বে। এতে হাম আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন। কারণ শরীরে র্যাশ বা গুটি ওঠার কয়েক দিন আগ থেকেই একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম হন।
সংক্রমণ ছড়ানোর উচ্চ ঝুঁকি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেছেন, ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ বাড়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা বা অসুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। তিনি অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অসুস্থ বা দুর্বল শিশুকে নিয়ে ভ্রমণ না করাই নিরাপদ।
একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিনও। তার মতে, জ্বর, সর্দি বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ থাকলেও ভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ এসব উপসর্গ থাকা অবস্থাতেই হাম অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় শুরুতে কেবল হালকা জ্বর দেখা দেয়, কিন্তু তখনই আক্রান্ত শিশু অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। ফলে ঈদযাত্রা ও জনসমাগম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
শিশুদের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা
চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ জানিয়েছেন, গ্রামে গিয়ে শিশুরা অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা করবে, যা সংক্রমণ বাড়ানোর বড় কারণ হতে পারে। কারণ কে আক্রান্ত বা কার শরীরে ভাইরাস আছে, তা সহজে বোঝা যায় না।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় বাতাসে সক্রিয় থাকতে পারে। সেই বাতাসে শ্বাস নিলেও সংক্রমণ হতে পারে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলমও জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশুদের নিয়ে দূরপাল্লার ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, ঈদের সময় মানুষের ব্যাপক সমাগম সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলবে।
চিকিৎসক-নার্সদের ছুটি বাতিল
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদের ছুটির মধ্যেও সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে এমন হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি হবে না। আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ভিড় এড়িয়ে চলারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
৭১ দিনে মৃত্যু ৫৪৫
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। গত ৭১ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪৫ জনে।
একই সময়ে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১২৭ জন রোগী। এখন পর্যন্ত দেশে মোট হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৯৪০ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৫৮৫ জন শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব এলাকায় এখনও প্রয়োজনীয় মাত্রায় টিকাদান নিশ্চিত না হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















