বাংলাদেশের অর্থনীতি গত প্রায় দেড় দশকে আকার বেশ বড় হয়েছে। ২০০৯ সালেও যে অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র ১০০ বিলিয়ণ ডলার, গত দেড় দশকে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে এই আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। বেড়েছে মাথাপিছু আয়। রাশিয়া-ইউক্রেন এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে সাময়িক সংকট দেখা দিলেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দেশের অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নীরবে বেড়ে উঠেছে আরেকটি বড় ঝুঁকি। আর সেটি হলো বৈদেশিক ঋণের চাপ। যে ঋণ একসময় মূলত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া হতো। সেই ঋণের একটি অংশ এখন সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় সামলাতেও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। এটি অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
মুল সংকট উন্নয়ন ব্যয়ে
একসময় বাংলাদেশে রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ উন্নয়ন ব্যয়ে ব্যবহার করা সম্ভব হতো। নব্বইয়ের দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। এমন সময়ও ছিল, যখন উন্নয়ন ব্যয়ের ৫০ শতাংশের বেশি অর্থ রাজস্ব উদ্বৃত্ত থেকে জোগান দেওয়া যেত।
কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। এখন রাজস্ব আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ ও অন্যান্য নিয়মিত ব্যয়ে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে অধিক হারে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন শুধু উন্নয়ন ব্যয় নয়, সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই অবনতির চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে। ওই বছর সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রকৃত রাজস্ব আয় ৪৬৩ কোটি টাকা কম পড়ে। পরে সেই ঘাটতি ঋণ নিয়ে পূরণ করা হয়।
পরের বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকায়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রধান মাধ্যম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পুরো ব্যয়ই ঋণ নিয়ে চালাতে হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকটের পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ। এরমধ্যে মুল কারণ হচ্ছে, সরকারের পরিচালন ব্যয় কমছে না। বরং প্রতি বছর লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি সরকার বড় বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এতে উন্নয়ন বাজেটের আকারও দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে রাজস্ব আদায় বাড়েনি। ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ক্রমেই বড় হয়েছে, আর সেই ঘাটতি পূরণে ধারাবাহিকভাবে ঋণ নিতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ‘আর্টিকেল ফোর কনসালটেশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে। এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪১ শতাংশের সমান। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফ তাদের ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ থেকে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় স্থান দিয়েছে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, জিডিপির তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ, রপ্তানি আয় ও রাজস্ব আদায়ের দুর্বল অবস্থার ভিত্তিতেই এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এখনও অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে ঋণ পরিশোধের চাপ নিয়ে। কারণ, এখন আগের মতো সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা জাইকার মতো উন্নয়ন সহযোগীদের স্বল্পসুদের ঋণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ঋণও বাড়ছে। এসব ঋণের সুদ তুলনামূলক বেশি এবং পরিশোধকালও কম।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এই ঋণ পরিশোধের চাপ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ২৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, অতীতে নেওয়া উচ্চ সুদের এবং স্বল্প গ্রেস পিরিয়ডের বিদেশি ঋণ এখন বড় চাপ তৈরি করছে। এছাড়া মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাজেট টিকিয়ে রাখতে নেওয়া বিপুল ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়ও এখন চলে এসেছে। এই বাড়তি ঋণ পরিশোধের চাপ সরকারের আর্থিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাজেট ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমাতে এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থায়নের জন্য সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভ্যন্তরীণ ঋণের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। কিন্তু এতে সুদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশই গেছে অভ্যন্তরীণ ঋণের পেছনে। সমপর্যায়ের অন্যান্য অর্থনীতির তুলনায় এই হার অনেক বেশি।
আইএমএফ আরও সতর্ক করেছে, ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। ইতোমধ্যে চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এ খাতের জন্য রেকর্ড সর্বনিম্ন। এ বছরের জাতীয় নির্বাচনের পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য নতুন সরকার গঠিত হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই নির্বাচনের পর বেসরকারি বিনিয়োগের খরা কেটে যাবে। অথচ তখনই বেসরকারি খাতে ঋণের এই নিম্নমুখী প্রবণতার তথ্য সামনে এলো। আর এই তথ্য যেন সেই প্রত্যাশাকে ম্লান করে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে ঋণের এই চাপ সামাল দেওয়া আরও কঠিন হবে। আইএমএফ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, রাজস্ব আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধ ও সুদ ব্যয়ের উচ্চ হার আগামী বছরগুলোতে রোলওভার বা পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি বাড়াবে।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে, যা এ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম কম। ফলে সরকারের পক্ষে বাড়তে থাকা ঋণের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ তার উত্তরসূরির জন্য রেখে যাওয়া এক নোটে বলেছেন, দেশের রপ্তানি আয় ও সরকারি রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ অনেক দ্রুত বাড়ছে। তিনি নতুন সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে চড়া সুদের কঠিন শর্তের বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
পরিচালন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি
সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি হলো পরিচালন ব্যয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, অফিস পরিচালনা, যানবাহন, জ্বালানি, ভ্রমণ ও প্রশাসনিক খরচ মিলিয়ে এই ব্যয় প্রতিবছরই বাড়ছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকরের পর সরকারি বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে বেতন প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
এখন আবার নতুন বেতন কাঠামো বা মহার্ঘ ভাতার আলোচনা চলছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, এটি সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি ব্যয়ের সমপরিমাণ দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কি বেড়েছে?
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া বরাদ্দ অনুসারে পরিচালন ব্যয়ের হারও বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম মাসে পরিচালন ব্যয় ছিল এ খাতে মোট বরাদ্দের ৬২ শতাংশ, যা এবার বেড়ে হয়েছে ৬৩ শতাংশ।
আবার দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয়ের ৫৭ হাজার কোটি টাকার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়েরও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা সরকারকে ঋণ নিয়ে মেটাতে হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল।
জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় যা প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিপরীতে আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন খাতের তুলনায় পরিচালন ব্যয়ই বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। এই বড় ব্যয় মেটাতে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
পরিচালন ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু উন্নয়ন ব্যয় নয়, বেতন-ভাতা, সুদ ও ভর্তুকির মতো পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশও সরকারকে ঋণ নিয়ে মেটাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়।
দেশের অর্থনীতি ক্রমেই সরকারি পরিচালন ব্যয়ের বৃত্তে আটকে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সামনে রেখে সম্প্রতি পরিচালন ব্যয়ে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে নতুন সরকার। বাস্তবে পরিচালন বাজেটের আওতায় ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচালন ব্যয়ের এই লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়ছে উন্নয়ন খাতের পরিধি। ফলে থমকে যাচ্ছে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও সরকারি বিনিয়োগের গতি। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য থাকা জরুরি। তারা বলছেন, এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি, সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং অনুৎপাদনশীল খাতের খরচ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যদিকে, রাজস্ব আয় বাড়ানো, ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার, এডিপি বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো খাত উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদের মতে, সাধারণত রাজস্ব আয় দিয়েই পরিচালন ব্যয় মেটানো হয় এবং সেখান থেকে কিছু অর্থ উন্নয়ন ব্যয়েও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ই ঠিকমতো মেটানো যাচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক। রাজস্ব আয় আশানুরূপ না বাড়িয়ে যদি পরিচালন ব্যয় কিংবা অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের ব্যয় বাড়তে থাকে, তবে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ার মতো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তাঁর মতে, সরকারের উচিত পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ঋণ করে ঘি খাওয়ার মতো কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, প্রশাসনিক কাঠামো এখনও বড় অংশে সনাতনী ধাঁচে পরিচালিত হচ্ছে। “ডিজিটাল বাংলাদেশ” থেকে “স্মার্ট বাংলাদেশ”-এর কথা বলা হলেও অধিকাংশ সরকারি অফিসে ফাইলনির্ভর কাজ, ধীরগতি এবং অতিরিক্ত জনবল নির্ভরতা এখনও বিদ্যমান। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার না বাড়ায় সরকারের আকার কমানো যাচ্ছে না; বরং নতুন নতুন দপ্তর, প্রকল্প ও নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে পরিচালন ব্যয়ও অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।

ডলার সংকট ও ঋণ পরিশোধের চাপ
গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে একই পরিমাণ ঋণ শোধ করতে এখন সরকারের বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কয়েক বছর আগে ১ ডলারের বিপরীতে যেখানে ৮৫ টাকা ব্যয় হতো, এখন সেখানে ১২০ টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে। অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণের প্রকৃত বোঝা শুধু ঋণের পরিমাণে নয়, বিনিময় হারেও বেড়ে গেছে।
একই সঙ্গে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প তথা মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, মাতারবাড়ী প্রকল্প বা বিদ্যুৎ খাতের নানা উদ্যোগ, এসবের ঋণ পরিশোধের সময়ও ধীরে ধীরে সামনে চলে আসছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বাবদ সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে।
রাজস্ব আয় কেন বাড়ছে না?
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না রাজস্ব আয়। বর্তমানে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয়ের অনুপাত প্রায় ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও অন্যতম নিম্ন। একসময় এই অনুপাত ৯ শতাংশের কাছাকাছি উঠেছিল।
এর প্রধান কারণগুলো হলো- করজালের সীমাবদ্ধতা, প্রকৃত আয়করদাতার স্বল্প সংখ্যা, ভ্যাট ব্যবস্থার দুর্বলতা,
কর ফাঁকি ও অব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব প্রশাসনে দুর্নীতি ও অদক্ষতা।
বাংলাদেশে এখনও বিপুল সংখ্যক সক্ষম ব্যক্তি করের বাইরে রয়েছেন। আবার অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রকৃত আয় গোপন করে। ডিজিটাল কর ব্যবস্থার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। এসব কারণে সরকারের রাজস্ব আয় জিডিপির আকারের তুলনায় সমানুপাতিক হারে বাড়ছে না। ফলে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয়ের অনুপাত আশংকাজনক পর্যায়ে নেমে গেছে।

ছোট সরকার, কার্যকর সরকার
মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল দর্শন হলো, সরকারের ভূমিকা হবে নীতিনির্ধারক ও সহায়ক। ব্যবসা ও উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হবে বেসরকারি খাত। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক বিস্তার অনেক বেশি। ফলে সরকারের ব্যয়ও লাগামছাড়া হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু কর বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সরকারের আকার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা। প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, ই-গভর্ন্যান্স, অপ্রয়োজনীয় পদ বিলুপ্তি, প্রকল্প ব্যয়ে স্বচ্ছতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান কমানো এবং অলাভজনক খাতে অযৌক্তিক ভর্তুকি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
সামনে কী করণীয়?
বাংলাদেশ এখনও ঋণ সংকটে পড়েনি, তবে ঝুঁকির সংকেত স্পষ্ট। এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। এজন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি। এগুলো হলো- ১. রাজস্ব আহরণে বড় সংস্কার; ২. কর প্রশাসনে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ; ৩. প্রযুক্তিনির্ভর সরকারি ব্যবস্থাপনা; ৪. অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো; ৫. বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে সতর্কতা; ৬. প্রকল্প গ্রহণে রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এবং ৭. বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো।
অর্থনীতির শক্তি শুধু বড় বাজেট বা বড় প্রকল্পে নয়; বরং টেকসই আর্থিক সক্ষমতায়। সরকার যদি ক্রমাগত ঋণ নিয়ে পরিচালন ব্যয় চালায়, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের সামনে এখনও সুযোগ রয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার, সরকারের আকার যৌক্তিক করা এবং দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা গেলে বৈদেশিক ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যথায় উন্নয়নের অর্জনই একসময় ঋণের বোঝায় ভারী হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।
আকিব রহমান 


















