০৮:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এ-আই দিয়ে বুথে নজরদারি চালাবে নির্বাচন কমিশন মৃত্যুর পরেও সিনেমায় ফিরলেন ভ্যাল কিলমার — এআই দিয়ে পুনরুজ্জীবিত হলেন হলিউড তারকা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ২২ এপ্রিল শেষ হচ্ছে, দ্বিতীয় দফা আলোচনা ইসলামাবাদে — স্থায়ী শান্তি কতদূর? নাসার আর্টেমিস-২ চাঁদ মিশনের মহাকাশচারীরা সংবাদ সম্মেলনে, ৫০ বছর পর চাঁদ ঘুরে ফেরার অনুভূতি জানালেন পাকিস্তানের সোলার বিপ্লব তাকে বাঁচাল, ইরান যুদ্ধের জ্বালানি ধাক্কায় বাংলাদেশ হিমশিম — তুলনামূলক বিশ্লেষণ আইএমএফ সতর্কবার্তা: ইরান যুদ্ধের ছায়ায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি নামবে ৩.১ শতাংশে, বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিতে পোপ লিও বললেন “কয়েকজন স্বৈরাচার বিশ্বকে ধ্বংস করছে” — ট্রাম্পের সঙ্গে আমেরিকান পোপের সংঘাত তীব্র রাশিয়া ইউক্রেনে ২০২৬ সালের ভয়াবহতম হামলা চালাল — ১৮ জন নিহত, নিহতদের মধ্যে ১২ বছরের শিশু ট্রাম্প বললেন “ইরান সবকিছুতে রাজি হয়েছে” — পারমাণবিক অস্ত্র থেকে হরমুজ, সব দাবি মেনেছে তেহরান? ইসরায়েল-লেবানন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর, হিজবুল্লাহ হামলা বন্ধ করেছে — বাড়ি ফিরছেন বাস্তুচ্যুতরা

ইরান যুদ্ধ উপসাগর–এশিয়া বাণিজ্যের ভঙ্গুরতা উন্মোচন করল

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুই সামুদ্রিক পথ—হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মান্দেব—ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই দুই পথ দিয়েই এশিয়ার জ্বালানি আমদানি এবং শিল্পপণ্যের বড় অংশ পরিবহন হয়। ফলে উপসাগরীয় দেশ ও এশিয়ার অর্থনীতির জন্য এটি সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ঝুঁকি

গত মাসের শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দুটি কৌশলগত সামুদ্রিক পথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালী উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে, আর বাব আল-মান্দেব ভারত মহাসাগরকে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

এই দুই পথ দিয়ে এশিয়ার অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি ও উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি চলাচল করে। তাই যুদ্ধের কারণে সামুদ্রিক পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।

উপসাগরীয় দেশ ও এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সামনে এখন একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আর পুরোপুরি নির্ভর করা না যায়, তাহলে সরবরাহ শৃঙ্খলকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যাবে?

Iran war exposes fragility of Gulf-Asia supply chains | South China Morning  Post

বিশ্লেষকদের মতে, মজুত বাড়ানো, বিকল্প পরিবহন পথ তৈরি করা কিংবা নতুন নিরাপত্তা জোট গড়ার মতো প্রচলিত সমাধানগুলো বর্তমান ধরনের অস্থিরতার বিরুদ্ধে সীমিত সুরক্ষা দিতে পারে। এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও এই ঝুঁকি দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।

পুরনো ঝুঁকির নতুন বাস্তবতা

এই দুর্বলতা নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তথাকথিত ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ পারস্য উপসাগরকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মতো সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথে বৈশ্বিক বাণিজ্য অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

পরবর্তী চার দশকে উপসাগরীয় দেশ ও এশিয়ার অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পারস্পরিক নির্ভরতা গভীর হয়। মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক সংঘাত বারবার এই ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিলেও বাস্তবে বড় ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়েছিল।

বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা কাজ করেছে—মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক এমন কোনো দেশের পক্ষে বাণিজ্য পথ বন্ধ করা অসম্ভব করে তুলবে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান বাস্তবে এই পথগুলোতে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব

ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষক গাই বার্টনের মতে, এই পরিস্থিতি উপসাগর ও এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ করেছে।

Explained | How Houthi attacks in the Bab al-Mandab Strait have hit global  trade

তার মতে, পারস্পরিক নির্ভরতা অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করলেও একই সঙ্গে তা বিপদের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। স্থিতিশীল সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সমন্বয় দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, কিন্তু সংকটের সময় সেটিই দুর্বলতা বাড়িয়ে তোলে।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, বর্তমান সংঘাত শেষ হলেও ঝুঁকি থেকে যাবে। উদাহরণ হিসেবে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর তারা সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ করলেও ভবিষ্যতে আবারও বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করতে পারে।

নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ার চ্যালেঞ্জ

এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশ ও এশিয়ার বাণিজ্য অংশীদারদের ওপরই এখন চাপ পড়ছে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ধাক্কা থেকে অর্থনীতি রক্ষা করার মতো ব্যবস্থা গড়ে তোলার।

আবুধাবিভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টারের গবেষণা কর্মসূচির প্রধান আহমেদ আবুদুহ মনে করেন, কৌশলগত সামুদ্রিক পথে নিরাপত্তা ও অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত না করলে কার্যকর সুরক্ষা সম্ভব নয়।

তার মতে, যেহেতু বর্তমান যুদ্ধে কোনো পক্ষই এই পরিস্থিতির পূর্ণ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নয়, তাই মধ্যস্থতা—বিশেষ করে চীনের মতো শক্তির মাধ্যমে—হতে পারে সম্ভাব্য একমাত্র কার্যকর সমাধান।

DB Des Roches - AGSI

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের থেয়ার মার্শাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস মনে করেন, উপসাগর-এশিয়া বাণিজ্যের জন্য কার্যকর ‘ঝাঁকুনি প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ তৈরি করা কঠিন।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী দুই অঞ্চলের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো চাইলে এশিয়ার উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমাতে পারে, কিন্তু এশিয়ার অর্থনীতির জন্য উপসাগরের জ্বালানি প্রায় অপরিহার্য এবং সহজ বিকল্প নেই।

এই কারণে আন্তর্জাতিক যৌথ মজুত গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। বরং এশিয়ার দেশগুলো নিজস্ব জাতীয় তেল ও জ্বালানি মজুত বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে পারে।

বিকল্প করিডোরের সীমাবদ্ধতা

হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব এড়িয়ে নতুন বাণিজ্যপথ তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রকল্পও আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ করিডোর, ইরাক-তুরস্ক ডেভেলপমেন্ট রোড এবং ইরান হয়ে রাশিয়ায় পৌঁছানো আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর।

তবে বিশ্লেষকদের মতে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন সহজ নয়। ইরান সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বা যেগুলোকে ইরানের স্বার্থবিরোধী মনে করা হয়, সেগুলো স্বল্পমেয়াদে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম।

আবুদুহ বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি থাকলে এসব করিডোরও সহজে নিরাপদ থাকবে না।

China buys over 80% of Iran's oil but isn't alarmed by oil crisis: How it  prepared for a Hormuz shock over 20 years

এদিকে বার্টনের মতে, বর্তমান সংঘাতের আগেই এসব বড় অবকাঠামো প্রকল্প নানা কাঠামোগত সমস্যার মুখে ছিল। তাছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগও কিছুটা কমেছে এবং আফ্রিকার মতো অঞ্চলের দিকে ঝুঁকেছে।

ফলে বড় এশীয় তেল আমদানিকারক দেশগুলো নতুন পরিবহন করিডোর তৈরির বদলে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করার দিকে বেশি নজর দিতে পারে। এর অর্থ হতে পারে রাশিয়া, কানাডা, নাইজেরিয়া বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়া।

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা

এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি বড় মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত হতে পারে।

ডেস রোচেসের মতে, হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি বহু বছর ধরেই জানা ছিল। তবু উপসাগরীয় দেশগুলো এ বিষয়ে তুলনামূলক উদাসীন থেকেছে।

তার মতে, এত বড় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাদের নৌবাহিনীতে প্রতিরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।

What life is like for 20,000 seafarers trapped at Strait of Hormuz

অন্যদিকে আবুদুহ মনে করেন, এখন উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভবত তাদের নিরাপত্তা কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর কথা ভাববে। এর মধ্যে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের আওতায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তি পর্যালোচনা এবং নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজার বিষয়ও থাকতে পারে।

তবে ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ শেষ হলে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ কতটা স্থায়ী হবে।

বার্টনের মতে, ইতিহাস দেখায় যে বড় সংকট কেটে গেলে সরকার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আবার পুরোনো এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা ও কার্যকর পথেই ফিরে যেতে চায়।

বর্তমান সংকট সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্য ও বিকল্প অবকাঠামোর বিষয়ে আলোচনা বাড়ালেও তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এ-আই দিয়ে বুথে নজরদারি চালাবে নির্বাচন কমিশন

ইরান যুদ্ধ উপসাগর–এশিয়া বাণিজ্যের ভঙ্গুরতা উন্মোচন করল

০৩:১৫:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুই সামুদ্রিক পথ—হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মান্দেব—ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই দুই পথ দিয়েই এশিয়ার জ্বালানি আমদানি এবং শিল্পপণ্যের বড় অংশ পরিবহন হয়। ফলে উপসাগরীয় দেশ ও এশিয়ার অর্থনীতির জন্য এটি সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ঝুঁকি

গত মাসের শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দুটি কৌশলগত সামুদ্রিক পথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালী উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে, আর বাব আল-মান্দেব ভারত মহাসাগরকে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

এই দুই পথ দিয়ে এশিয়ার অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি ও উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি চলাচল করে। তাই যুদ্ধের কারণে সামুদ্রিক পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।

উপসাগরীয় দেশ ও এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সামনে এখন একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আর পুরোপুরি নির্ভর করা না যায়, তাহলে সরবরাহ শৃঙ্খলকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যাবে?

Iran war exposes fragility of Gulf-Asia supply chains | South China Morning  Post

বিশ্লেষকদের মতে, মজুত বাড়ানো, বিকল্প পরিবহন পথ তৈরি করা কিংবা নতুন নিরাপত্তা জোট গড়ার মতো প্রচলিত সমাধানগুলো বর্তমান ধরনের অস্থিরতার বিরুদ্ধে সীমিত সুরক্ষা দিতে পারে। এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও এই ঝুঁকি দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।

পুরনো ঝুঁকির নতুন বাস্তবতা

এই দুর্বলতা নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তথাকথিত ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ পারস্য উপসাগরকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মতো সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথে বৈশ্বিক বাণিজ্য অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

পরবর্তী চার দশকে উপসাগরীয় দেশ ও এশিয়ার অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পারস্পরিক নির্ভরতা গভীর হয়। মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক সংঘাত বারবার এই ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিলেও বাস্তবে বড় ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়েছিল।

বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা কাজ করেছে—মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক এমন কোনো দেশের পক্ষে বাণিজ্য পথ বন্ধ করা অসম্ভব করে তুলবে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান বাস্তবে এই পথগুলোতে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব

ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষক গাই বার্টনের মতে, এই পরিস্থিতি উপসাগর ও এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ করেছে।

Explained | How Houthi attacks in the Bab al-Mandab Strait have hit global  trade

তার মতে, পারস্পরিক নির্ভরতা অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করলেও একই সঙ্গে তা বিপদের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। স্থিতিশীল সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সমন্বয় দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, কিন্তু সংকটের সময় সেটিই দুর্বলতা বাড়িয়ে তোলে।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, বর্তমান সংঘাত শেষ হলেও ঝুঁকি থেকে যাবে। উদাহরণ হিসেবে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর তারা সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ করলেও ভবিষ্যতে আবারও বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করতে পারে।

নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ার চ্যালেঞ্জ

এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশ ও এশিয়ার বাণিজ্য অংশীদারদের ওপরই এখন চাপ পড়ছে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ধাক্কা থেকে অর্থনীতি রক্ষা করার মতো ব্যবস্থা গড়ে তোলার।

আবুধাবিভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টারের গবেষণা কর্মসূচির প্রধান আহমেদ আবুদুহ মনে করেন, কৌশলগত সামুদ্রিক পথে নিরাপত্তা ও অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত না করলে কার্যকর সুরক্ষা সম্ভব নয়।

তার মতে, যেহেতু বর্তমান যুদ্ধে কোনো পক্ষই এই পরিস্থিতির পূর্ণ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নয়, তাই মধ্যস্থতা—বিশেষ করে চীনের মতো শক্তির মাধ্যমে—হতে পারে সম্ভাব্য একমাত্র কার্যকর সমাধান।

DB Des Roches - AGSI

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের থেয়ার মার্শাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস মনে করেন, উপসাগর-এশিয়া বাণিজ্যের জন্য কার্যকর ‘ঝাঁকুনি প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ তৈরি করা কঠিন।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী দুই অঞ্চলের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো চাইলে এশিয়ার উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমাতে পারে, কিন্তু এশিয়ার অর্থনীতির জন্য উপসাগরের জ্বালানি প্রায় অপরিহার্য এবং সহজ বিকল্প নেই।

এই কারণে আন্তর্জাতিক যৌথ মজুত গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। বরং এশিয়ার দেশগুলো নিজস্ব জাতীয় তেল ও জ্বালানি মজুত বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে পারে।

বিকল্প করিডোরের সীমাবদ্ধতা

হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব এড়িয়ে নতুন বাণিজ্যপথ তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রকল্পও আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ করিডোর, ইরাক-তুরস্ক ডেভেলপমেন্ট রোড এবং ইরান হয়ে রাশিয়ায় পৌঁছানো আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর।

তবে বিশ্লেষকদের মতে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন সহজ নয়। ইরান সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বা যেগুলোকে ইরানের স্বার্থবিরোধী মনে করা হয়, সেগুলো স্বল্পমেয়াদে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম।

আবুদুহ বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি থাকলে এসব করিডোরও সহজে নিরাপদ থাকবে না।

China buys over 80% of Iran's oil but isn't alarmed by oil crisis: How it  prepared for a Hormuz shock over 20 years

এদিকে বার্টনের মতে, বর্তমান সংঘাতের আগেই এসব বড় অবকাঠামো প্রকল্প নানা কাঠামোগত সমস্যার মুখে ছিল। তাছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগও কিছুটা কমেছে এবং আফ্রিকার মতো অঞ্চলের দিকে ঝুঁকেছে।

ফলে বড় এশীয় তেল আমদানিকারক দেশগুলো নতুন পরিবহন করিডোর তৈরির বদলে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করার দিকে বেশি নজর দিতে পারে। এর অর্থ হতে পারে রাশিয়া, কানাডা, নাইজেরিয়া বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়া।

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা

এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি বড় মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত হতে পারে।

ডেস রোচেসের মতে, হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি বহু বছর ধরেই জানা ছিল। তবু উপসাগরীয় দেশগুলো এ বিষয়ে তুলনামূলক উদাসীন থেকেছে।

তার মতে, এত বড় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাদের নৌবাহিনীতে প্রতিরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।

What life is like for 20,000 seafarers trapped at Strait of Hormuz

অন্যদিকে আবুদুহ মনে করেন, এখন উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভবত তাদের নিরাপত্তা কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর কথা ভাববে। এর মধ্যে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের আওতায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তি পর্যালোচনা এবং নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজার বিষয়ও থাকতে পারে।

তবে ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ শেষ হলে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ কতটা স্থায়ী হবে।

বার্টনের মতে, ইতিহাস দেখায় যে বড় সংকট কেটে গেলে সরকার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আবার পুরোনো এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা ও কার্যকর পথেই ফিরে যেতে চায়।

বর্তমান সংকট সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্য ও বিকল্প অবকাঠামোর বিষয়ে আলোচনা বাড়ালেও তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।