ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাশ্চাত্যের ব্যালে নৃত্যকে নতুনভাবে গড়ে তুলছেন যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া নৃত্যশিল্পী ও শিক্ষক ইয়ানা লুইস। তাঁর দীর্ঘ যাত্রা, সংগ্রাম এবং সৃষ্টিশীলতার গল্প এখন নতুন করে উঠে এসেছে তাঁর আসন্ন প্রযোজনা ‘স্বপ্ন ও নিয়তির গল্প’-এর মাধ্যমে।
নতুন প্রযোজনার প্রস্তুতি
বেঙ্গালুরুর একটি নৃত্যকেন্দ্রে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রায় দুই শতাধিক নৃত্যশিল্পী। তাঁরা সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইয়ানা লুইসের নতুন ব্যালে প্রযোজনার জন্য। এটি তাঁর প্রতিষ্ঠানের সপ্তম নিজস্ব আয়োজন, যেখানে আরব্য রজনীর গল্প থেকে অনুপ্রাণিত কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।
এই নৃত্যনাট্যের শুরুতেই ‘বন্দে মাতরম’-এর সুরে শ্রদ্ধা জানানো হবে ভারতকে, যে দেশকে ইয়ানা গত প্রায় তিন দশক ধরে নিজের ঘর হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
গল্পের ভেতরে স্বপ্ন ও সংগ্রাম
নৃত্যনাট্যের কাহিনি ঘিরে রয়েছে এক চোর ও এক রাজকন্যাকে। একটি জাদুর প্রদীপ তাদের জীবনকে বদলে দেয়, আর তারা একসঙ্গে নানা বাধা পেরিয়ে নিজেদের নিয়তির দিকে এগিয়ে যায়।

ইয়ানার ভাষায়, এই গল্প আসলে স্বপ্ন দেখার শক্তি এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার সাহসের প্রতীক। চরিত্র যেই হোক না কেন—চোর, রাজকন্যা বা সাধারণ মানুষ—সবাইয়ের মধ্যেই সেই সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতে ব্যালের নতুন ভাষা
ভারতের নৃত্যধারায় যেখানে মাটির সংযোগ বেশি, সেখানে ব্যালে যেন এক ভিন্ন জগৎ—উচ্চতায় ওঠার, মাধ্যাকর্ষণকে অতিক্রম করার শিল্প। এই পাশ্চাত্য নৃত্যরীতিও এখন ধীরে ধীরে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে এক নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করছে।
ইয়ানা মনে করেন, ব্যালে শুধু একটি নাচ নয়, বরং এটি দুই সংস্কৃতির মধ্যে সংলাপ তৈরি করে।
চ্যালেঞ্জ ও শৃঙ্খলার গল্প
ভারতে নৃত্যশিক্ষা চালানো সহজ নয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও নাচ—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। অনেকেই পরীক্ষার কারণে মাঝপথে বিরতি নেয়। তবে কিছু শিক্ষার্থী দুটিই সমানভাবে সামলাতে পারে।
ইয়ানার মতে, শিক্ষা ও নৃত্য—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেও প্রতিদিন ভোরে উঠে শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন করেন।
শুরুটা যেভাবে

খুব ছোটবেলায় ইয়ানা মাকে বলেছিলেন, তিনি প্রজাপতি হতে চান। সেই ইচ্ছাকেই উড়তে চাওয়ার স্বপ্ন হিসেবে বুঝে তাঁর মা তাঁকে ব্যালে ক্লাসে ভর্তি করান। সেখান থেকেই শুরু তাঁর যাত্রা।
প্রখ্যাত ফরাসি নৃত্যশিল্পী সিলভি গিলেমের কাজ তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
ভারতীয় নৃত্যের সঙ্গে মেলবন্ধন
ইয়ানা ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের সঙ্গে ব্যালের মিল খুঁজে পেয়েছেন। শরীরের ভঙ্গি, পায়ের ব্যবহার, লাফ ও ভারসাম্য—সবকিছুই একে অপরকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
তিনি ভারতীয় নৃত্যশিল্পীদেরও ব্যালে শিখিয়েছেন, যা তাদের নিজস্ব নৃত্যশৈলীকেও আরও উন্নত করেছে।
খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক প্রস্তুতি
একজন ব্যালে নৃত্যশিল্পীর জন্য খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইয়ানার মতে, হালকা ও পুষ্টিকর খাবার শরীরকে শক্তি দেয়, কিন্তু ভারী খাবার পারফরম্যান্সে বাধা সৃষ্টি করে।
ফল, বাদাম ও হালকা খাবারই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
আন্তর্জাতিক যাত্রা ও প্রতিষ্ঠা

১৯৯৮ সালে যোগব্যায়ামের সূত্রে ভারতে আসেন ইয়ানা। এরপর মুম্বাই হয়ে বেঙ্গালুরুতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর ব্যালে স্কুল।
আজ তাঁর প্রতিষ্ঠানের একাধিক কেন্দ্র রয়েছে, এবং অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে।
স্বপ্নের নতুন দিগন্ত
ইয়ানা এখন ভারতে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যালে প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। তাঁর মতে, এই যাত্রা কঠিন হলেও অত্যন্ত অর্থবহ।
তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান বিশ্বের অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষের স্বপ্ন ও আবেগ অটুট থাকে। প্রযুক্তি অনেক কিছু করতে পারলেও সৃজনশীলতা ও কল্পনার জায়গা কখনও নিতে পারবে না।
নতুন প্রযোজনার মঞ্চায়ন
‘স্বপ্ন ও নিয়তির গল্প’ শিগগিরই বেঙ্গালুরুর একটি মঞ্চে প্রদর্শিত হবে। এই প্রযোজনার মাধ্যমে ইয়ানা আবারও প্রমাণ করতে চান—স্বপ্ন দেখার সাহসই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















