দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আইনি অনিশ্চয়তা, গ্রেপ্তারের ভয় এবং সামাজিক কুসংস্কারের মধ্যে কাজ করে আসা দক্ষিণ কোরিয়ার ট্যাটুশিল্পীরা অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফলে ট্যাটু করাকে আর চিকিৎসা কার্যক্রম হিসেবে গণ্য করা হবে না। এর মাধ্যমে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বিতর্ক ও আইনি বাধার অবসান ঘটল।
ছায়া থেকে মূলধারায়
দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৯৯২ সাল থেকে কেবল লাইসেন্সধারী চিকিৎসকদের ট্যাটু করার অনুমতি ছিল। ফলে পেশাদার ট্যাটুশিল্পীদের বড় অংশকেই গোপনে কাজ করতে হতো। আইন ভঙ্গের অভিযোগে জরিমানা কিংবা কারাদণ্ডের ঝুঁকিও ছিল সব সময়। তবু এই শিল্প থেমে থাকেনি। বছরের পর বছর ধরে শিল্পীরা নিজেদের কাজ চালিয়ে গেছেন এবং ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী শিল্পসমাজ গড়ে তুলেছেন।
সম্প্রতি রাজধানী সিউলের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শতাধিক শিল্পী ও শিল্পপ্রেমী একত্রিত হয়ে এই পরিবর্তন উদযাপন করেন। তাদের কাছে এটি শুধু আইনি স্বীকৃতি নয়, বরং দীর্ঘ সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক অর্জন।
ভয়, হয়রানি ও অনিশ্চয়তার দিন
আইনগত নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু ট্যাটুশিল্পী নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, অসন্তুষ্ট গ্রাহকদের ব্ল্যাকমেইল, হয়রানি কিংবা হুমকির শিকার হতে হয়েছে। বিশেষ করে নারী শিল্পীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। কারণ পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে গেলেও নিজেরাই আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকত।
শিল্পীদের সংগঠনগুলোর মতে, এই পরিস্থিতি বহু মানুষের মানসিক চাপ বাড়িয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা চরম ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কারণও হয়েছে।
বদলেছে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি
এক সময় দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্যাটুকে অপরাধী চক্র বা নেতিবাচক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার, নতুন ধরনের সূক্ষ্ম নকশার ট্যাটুর জনপ্রিয়তা এবং তারকাদের প্রকাশ্যে ট্যাটু প্রদর্শনের কারণে এই শিল্প আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
কোরিয়ান ট্যাটুশিল্পীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুনাম অর্জন করেছেন। তাদের সূক্ষ্ম রেখার নকশা এবং শিল্পনির্ভর কাজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

এখনও রয়ে গেছে কিছু চ্যালেঞ্জ
যদিও আইনি বাধা অনেকটাই দূর হয়েছে, তবুও সামাজিকভাবে ট্যাটু নিয়ে কিছু নেতিবাচক ধারণা এখনও টিকে আছে। চাকরির সাক্ষাৎকার, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান কিংবা কিছু জনসমাগমস্থলে ট্যাটুকে এখনও ভালো চোখে দেখা হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান ট্যাটুযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ বিধিনিষেধও বজায় রেখেছে।
এদিকে সরকার ট্যাটুশিল্পীদের জন্য নতুন লাইসেন্স ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। ফলে পেশাটিকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগও শুরু হয়েছে।
তবে শিল্পীদের মতে, সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এখন তারা আর অপরাধীর মতো নয়, শিল্পী হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দিতে পারবেন। বহু বছরের সংগ্রামের পর দক্ষিণ কোরিয়ার ট্যাটুশিল্পীরা অবশেষে বৈধতা ও স্বীকৃতির নতুন যুগে প্রবেশ করলেন।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে ট্যাটুশিল্প বৈধতা পেল। তিন দশকের নিষেধাজ্ঞা শেষে স্বস্তি ফিরেছে শিল্পীদের মধ্যে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















