বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে ঘিরে। অনেকেই এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে সরে আসার লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি নিছক পিছু হটা নয়; বরং সীমিত সম্পদ, পরিবর্তিত ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যার ভিত্তি ছিল সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই অবস্থান আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে চীনের উত্থান, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রকে তার বৈশ্বিক দায়বদ্ধতার ধরন নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে।
এই পরিবর্তনের শিকড় অবশ্য ট্রাম্প যুগে নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, নিক্সন নীতি, চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ—সবই দেখিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র বহু আগেই বুঝতে শুরু করেছিল, প্রতিটি অঞ্চলে সমান মাত্রায় সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। ফলে মিত্রদের ওপর নিরাপত্তার দায়িত্ব বাড়ানো এবং নিজেদের সম্পদ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যবহার করার ধারণা ধীরে ধীরে মার্কিন কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প সেই ধারাকেই আরও দৃশ্যমান ও রাজনৈতিকভাবে উচ্চকণ্ঠ করে তোলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্র এমন বহু নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দায় বহন করছে যার প্রতিদান দেশটি যথেষ্ট পাচ্ছে না। তাই মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি, বিদেশি সহায়তা কমানো, কূটনৈতিক কাঠামো সংকুচিত করা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি কম আগ্রহ—এসব পদক্ষেপকে তিনি আমেরিকার স্বার্থ পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৌশলগত পুনর্বিন্যাসকে বিচ্ছিন্নতাবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। কোনো পরাশক্তি যদি কিছু অঞ্চলে ব্যয় কমায়, কিছু দায়িত্ব ভাগ করে দেয় বা অগ্রাধিকার পরিবর্তন করে, তার অর্থ এই নয় যে সে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে সরে যাচ্ছে। বরং লক্ষ্য থাকে সীমিত সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকে।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে ইউরোপের প্রতি কঠোর ভাষা ব্যবহার এবং ন্যাটো সদস্যদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ যেমন ছিল, তেমনি একই সময়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বও অক্ষুণ্ন ছিল। কারণ বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় চীনের উত্থানই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। সেই কারণে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারও ধীরে ধীরে সেদিকেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
একইভাবে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি ট্রাম্পের সংশয় কিংবা শুল্কনীতি নিয়ে তাঁর একতরফা অবস্থান অনেকের কাছে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার প্রতি অনাগ্রহ বলে মনে হলেও, সমর্থকদের মতে এগুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল। অর্থাৎ প্রচলিত বহুপাক্ষিক কাঠামোর বদলে সরাসরি জাতীয় স্বার্থকে সামনে এনে নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
তবে এই কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। আবার প্রতিপক্ষের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতার চেষ্টা সব সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। ফলে পুনর্বিন্যাস সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার জোট, অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হবে এটিকে শুধুই ‘প্রত্যাহার’ হিসেবে দেখা। বাস্তবে এটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে বিশ্বজুড়ে সমানভাবে উপস্থিত থাকার পরিবর্তে নির্বাচিত ক্ষেত্রগুলোতে শক্তি কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করা হয়েছে। লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব ত্যাগ করা নয়; বরং কম ব্যয়ে সেই নেতৃত্ব ধরে রাখার নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করা।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পর্যায়ে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একটি পরাশক্তি কি সর্বত্র সমানভাবে শক্তি প্রদর্শন করবে, নাকি সীমিত সম্পদকে হিসাব করে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখবে? ট্রাম্প যুগের মার্কিন নীতিকে সেই বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হিসেবেই দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।
চিন্তামণি মহাপাত্র 









